নানা ঋতুর নানা রঙে
ক’দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর ভোরের আকাশটা যখন ক্ষণিকের জন্য সোনালি রোদ্দুরে ভরে উঠল, এক লহমায় পৌঁছে গেলাম দশ হাজার কিলোমিটার দূরের বৈচিত্র্যে ভরা সেই শহরটায়, যার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে অজস্র অনুভূতি— যে অনুভূতি কখনও পুরনো হয় না, বরং প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন সাজে সেজে ওঠে। সেই শহরের নাম কলকাতা। অগুণতি মানুষের কোলাহলের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়া, অথবা বাস-ট্রামের ভিড়ে গলদঘর্ম হয়ে ট্র্যাফিক জ্যামে অপেক্ষা করা— হতে পারে এই অনুভূতিগুলো তখন খুব সুখের ছিল না, কিন্তু এখন যখন চারপাশের নৈঃশব্দ্যের মধ্যে নিজের সত্তাকে খুঁজে ফিরি, তখন বড় বেশি অভাব বোধ করি সেই জনারণ্যের পরিবেশকে।

মনে পড়ে শীতকালে বার্ষিক পরীক্ষার পর দল বেঁধে চিড়িয়াখানা যাওয়ার কথা। ভোর থেকে চলত তার প্রস্তুতি। লুচি–আলুরদম-নলেন গুড়ের সন্দেশ টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে নিয়ে সঙ্গে জলের বোতল কাঁধে বেরিয়ে পড়া। মনে হত যেন কলকাতা থেকে অনেক দূরে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি! আবার বড়দিনের কলকাতার সাজই অন্যরকম। পার্ক স্ট্রিট-ধর্মতলা চত্বর তখন রঙিন হয়ে উঠত সান্তা ক্লজ আর ক্রিসমাস ট্রি-তে। হগ মার্কেটের মাঝখানের গোল জায়গাটা তখন যেন এক মেলা। বার বার ঘুরে দেখেও যেন আশ মিটত না। ‘ফ্লুরিস’, ‘নাহুম’-এর দোকান ভিড়ে ভিড়াক্কার। বেড়ানোর শেষে পছন্দের কেক সঙ্গে করে বাড়ি ফেরার মজাই আলাদা।

অন্য দিকে শীতের দুপুরের মিঠে রোদ্দুরে একের পর এক মেলায় ঘুরে বেড়ানো। সব মেলা সাঙ্গ করে যখন বইমেলার প্রাঙ্গণে ঢুকতাম, মনে হত এ যেন অন্য এক জগত্। সে জগত্ শুধুমাত্র বইয়ের নয়, তার সঙ্গে মিশে আছে নিজের মননকে সমৃদ্ধ করার চাবিকাঠিও। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যেও নিজের পছন্দের বইটাকে খুঁজে নিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখা, কিংবা দীর্ঘ দিনের না দেখা কোনও পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়া— এ শুধু কলকাতা বইমেলাতেই সম্ভব।

ধীরে ধীরে যখন শীতের খোলস ছেড়ে কালবৈশাখী আছড়ে পড়ত শহরের বুকে, বাগানের আমগাছটার সদ্য জাগা আমগুলো ঝড়ে পড়ত, আর কাঁচা আমের গন্ধে ম... ম করে উঠত চারিদিক, তখনই যেন শহরটা সেজে উঠত বসন্তের সাজে।
প্রখর রোদ্দুরেও বাংলা বর্ষবরণের আয়োজন হত সম্পূর্ণ। দিকে দিকে গানবাজনা, আবৃত্তি, আড্ডা চলত সারাদিন। আবার পঁচিশে বৈশাখে যখন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি আর রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গন ভরে উঠত কানায় কানায়, মাইকে ভেসে আসত রবীন্দ্রসঙ্গীত— মনে হত সত্যি এ শহরের প্রতিটি ইটের পাঁজরে সুপ্ত রয়েছে সংস্কৃতির বীজ। অ্যাকাডেমি-রবীন্দ্রসদন চত্বর যেন এখনও তারই সাক্ষী বহন করে চলেছে। অন্য দিকে, গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যখন কানে ভেসে আসত বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁকে যাওয়া কোনও ফেরিওয়ালার ডাক, নিজের নিশ্চিন্ত আশ্রয় সেই মুহূর্তে বিচলিত হয়ে উঠত। চোখের সামনে ভেসে উঠত ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত এক করুণ মুখ— প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামে যা বিধ্বস্ত। এও কলকাতারই আর এক ছবি।

আবার দেখেছি বর্ষায় কলকাতার এক অন্য রূপ। কখনও বা গঙ্গার থেকে সদ্য তোলা ইলিশ মাছ সুতোয় ঝুলিয়ে বিক্রি করার ছবি। অথবা কোনও এক হঠাত্ ছুটির দুপুরে অবিরাম বৃষ্টির ছন্দবদ্ধ শব্দ শুনতে শুনতে খিচুড়ি খাওয়ার আনন্দ। আবার একটানা বৃষ্টিতে বানভাসি কলকাতার সে আরও এক অচেনা ছবি।

বর্ষার শেষে যখন শরতের নীল আকাশে টুকরো মেঘের আনাগোনা, শহরের আশেপাশে কিছু কাশফুল ইতি উতি উঁকি দিচ্ছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্যান্ডেলের বাঁশ ফেলে রাস্তা প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগাড়, শ্যামবাজার-হাতিবাগান-নিউ মার্কেট-গড়িয়াহাট চত্বরে যখন আর এক পা এগোনোই দায়— তা জানান দিত এ বার উত্সবের দিন আসন্ন। উত্সবের কলকাতা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিনকার ভিড়, ছোটাছুটি, মিছিল, মিটিং, ধর্মঘট— সব কিছুকে ছাপিয়ে আকাশে-বাতাসে যেন তখন শুধুই আনন্দের রেশ। উত্সবের মিলনমেলায় হয়ত বা কেউ খুঁজে ফিরত তার হারিয়ে যাওয়া অতীতকে, আবার কেউ বা বপন করত আগামী সম্পর্কের বীজ। পুজোর চারটে দিন যে সকলের সঙ্গে কী ভাবে কেটে যেত! সকাল সাতটাই হোক বা রাত্রি দু’টো, রাস্তায় এত মানুষের ঢল, লাউড স্পিকারে উচ্চরবে বাংলা-হিন্দি গান, সকলের খুশি খুশি মন— এ শুধু দুর্গাপুজোর মতো উত্সবেই সম্ভব। বিজয়ার সন্ধ্যায় মিষ্টিমুখ করে যখন বাগবাজার স্ট্রিটের মুখে গিয়ে দাঁড়াতাম, তখন বিষাদের সঙ্গে মিশে থাকত বিস্ময়। গঙ্গার ঘাটের দিকে এগিয়ে চলা ঠাকুরের সারি দেখতে দেখতে কখন যে মাঝরাত গড়িয়ে যেত, টেরও পেতাম না।

এ শহর শিখিয়েছে লক্ষ মানুষের মিছিলেও কী ভাবে পায়ে পা মিলিয়ে চলা যায়। এ শহরের মানবিক মুখ দেখিয়েছে, সম্পূর্ণ অচেনা কোনও মানুষের বিপদে কী ভাবে নিজের জীবন উপেক্ষা করেও দু’হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়। কলকাতার প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি অলিগলি যেন একটা আস্ত গল্প।
আমার শৈশব-কৈশোর-যৌবনের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী এই কলকাতা। এখনও মাঝে মাঝে যেন কল্পনায় হেঁটে চলি শ্যামবাজার থেকে বিধান সরণি ধরে কলেজ স্ট্রিটের দিকে। এ যেন এক ভার্চুয়াল ট্যুর, দু’পাশের দোকানগুলো যেন হাত বাড়িয়ে ডাকে। গোল বাড়ির কষা মাংস, সেন মহাশয়-অমৃত-যোগমায়া’র মিষ্টি, রূপবাণীর উল্টোদিকের সেই বিখ্যাত দোকানের তেলেভাজার গন্ধ, দু’পাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিনেমা-থিয়েটার হল, একটু এগিয়ে হেদুয়ার দু’পাশে স্কটিশ, বেথুন, হোলি চাইল্ড, সেন্ট মার্গারেট— সব স্কুল-কলেজকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা বই পাড়ার দিকে। পাতিরাম-এর বইয়ের দোকান পেরোতেই আবার যেন অন্য জগত— হিন্দু, হেয়ার, সংস্কৃত কলেজ, প্রেসিডেন্সি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অজস্র পুরনো বইয়ের দোকান আর তার সঙ্গে কলেজ স্ট্রিট-কফি হাউস।

শৈশবে বা কৈশোরে দেখা কলকাতার সঙ্গে এখনকার কলকাতাকে যেন ঠিক মেলাতে পারি না। শহরের বুক চিরে গড়ে ওঠা একাধিক ফ্লাইওভার, ঝাঁ চকচকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মল-এর রমরমা, সপ্রতিভ যুবক-যুবতীদের আই ফোন কানে সদর্প বিচরণ— সবকিছুই যেন বড় অচেনা ঠেকে। আবার মল-এর বাইরে পা দিয়েই যখন চোখ চলে যায় পথশিশুটির দিকে, তখনই মনে হয়, বাইরের আঙ্গিকে পরিবর্তন এলেও, কলকাতার অন্দরমহল একই আছে। সেখানে এখনও বিচরণ করে ‘কলকাতার যিশু’রা।

কলকাতা শুধুই একটা নাম নয়, সম্পূর্ণ একটা অস্তিত্ব, যা জুড়ে আছে কলকাতার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষের মননে। এ শুধুই শহর নয়, প্রতিদিনকার ভাল লাগা-মন্দ লাগার দোসর। সুখ-দুঃখের সঙ্গী, ভালবাসা-বিরহের আধার। শুধুমাত্র সেই কারণেই, আজ কলকাতার এত দূরে থেকেও কলকাতা আমাদের বেঁধে রেখেছে আষ্টে-পৃষ্ঠে। পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোর সঙ্গে কোনও না কোনও সূত্রে মিল খুঁজে পাই কলকাতার, নিজের মনের ক্যানভাসে এঁকে ফেলি এক অন্য কলকাতার ছবি, যা পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরের ছবি দিয়ে তৈরি এক কোলাজ। নিজের কল্পনায় সাজিয়ে তুলি কলকাতাকে— আমার কলকাতা, আমাদের কলকাতা... ভাল থেকো কলকাতা।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। ইউরোপের অন্য শহর ঘুরে বর্তমানে বেশ কিছু বছর ধরে নেদারল্যান্ডসের বাসিন্দা ও এখানেই কর্মরত। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসার। বই পড়া, গান, আবৃত্তি, নাটক— এ সবই ভাল লাগার উপাদান। আর ভাল লাগে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মিশতে।
 
 

 
 

Content on this page requires a newer version of Adobe Flash Player.

Get Adobe Flash player

 
অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.