গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে। রীতিমতো ঢোল বাজাইয়া বার্তা বিতরণ। তথ্যটি যথাবিহিত পৌঁছাইলেই হইল, প্রযুক্তি যাহাই হউক! নূতন বৎসরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অনগ্রসর গ্রামে নানাবিধ সরকারি প্রকল্পের প্রচারের জন্য ঢ্যাঁড়া পিটাইবার প্রাচীন পদ্ধতিটির পুনর্ব্যবহার শুরু হইবে। আপাত শ্রবণে বিস্ময় জাগিতে পারে, এই থ্রি-জির যুগে আসিয়া সহসা আদিম একটি তথ্য সম্প্রচার রীতির প্রয়োগ কেন? সঙ্গত প্রশ্ন। মোবাইল ফোন এক্ষণে ঘরে ঘরে পৌঁছাইয়াছে। এস এম এস এক্ষণে জনপ্রিয়তম বার্তা বিনিময় মাধ্যমের অন্যতম। এই জনপ্রিয়তার ভিতর নগর ও গ্রাম এই জাতীয় কোনও ভেদ নাই। একই সঙ্গে, ‘ইন্টারনেট’ শব্দটিও আর নিছকই নগরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নহে। ই মেল ডানা মেলিয়াছে দূরে দূরান্তরে। তাহা হইলে এই সময়ে আর ঢোল-ডগর ফিরাইয়া লাভ কী? বাস্তব বলিতেছে, লাভ একটি আছে। দেখিতে হইবে, প্রচার চলিতে থাকিলেও প্রচারের লক্ষ্য কাহারা? প্রচারস্থলটিই বা কী রূপ? সেই স্থানে বসিয়া প্রচারের অভিলক্ষ্য সেই জনগোষ্ঠী প্রচারের কোন পদ্ধতিটির সহিত সমধিক পরিচিত? কোন পদ্ধতির প্রচারে তাঁহাদের সাড়া দিবার সম্ভাবনা বেশি? বৃহৎ গণমাধ্যমে প্রচার থাকিতেই পারে, কিন্তু পাশাপাশি সেই সব মাধ্যমের যথাযথ প্রয়োগ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে এবং সংশ্লিষ্ট জনতার ভিতর উপলব্ধ তো? অন্যথায় প্রচার চলিবে ঠিকই, কিন্তু যাঁহাদের জন্য প্রচার, তাঁহাদের অধিকাংশের পক্ষে হিতকর ফল না-ও মিলিতে পারে। অনেকে হয়তো খেয়ালই করিবেন না, প্রকল্পের সংবাদ অজানাই থাকিয়া যাইবে। পরিভাষায় যাহাকে ‘মাইক্রো’ স্তর বলা হয়, ঢ্যাঁড়ার আওয়াজ সেই সকল স্থানে জনচিত্ত আকর্ষণ করিতে পারে। তাহাতে ফল মিলিবার সম্ভাবনা সমধিক।
গভীরে গিয়া ভাবিলে এই বিষয়টি অন্যতর একটি বাস্তবতার প্রতি নির্দেশ করে। বাজারের বাস্তবতা। অন্য ভাবে, কোন বাজারটি কাহার নিকট কী রূপে বাস্তব! সরকারি প্রচারকর্মে প্রায়শই একটি সংকট দেখা যায়। উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক চালচিত্রের কথা না ভাবিয়াই কোনও প্রচারের উদ্যোগ গৃহীত হয়। প্রচার-মাধ্যমটি যথাযথ রূপে নির্বাচন করা যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ, সেই জরুরি কথাটি প্রায়শই স্মরণে থাকে না। ফলে, যে মাধ্যমে প্রচারটি হইলে তাহা সর্বাধিক সংখ্যক মানুষের নিকট পৌঁছাইতে পারিত, সর্বদা সেই বস্তুটি ঘটে বলিলে সত্যের অপলাপ হইবে। প্রকল্প চলিতে থাকে। উদ্দিষ্ট মানুষের অনেকেই তাহার সন্ধান পান না। অর্থাৎ, সেই বিশেষ প্রচারপদ্ধতির বাজার সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীটিকে এড়াইয়া যায়। ইহাতে অন্যায়ের কিছু নাই। সমাজ-বাস্তবতার নিরিখে এমন হইতেই পারে। ভ্রান্তি তখনই ঘটে যখন সেই নিরিখের কথা না ভাবিয়াই নিছকই প্রচারের স্বার্থে প্রচার চলে। মাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সহিত তাহার আন্তর্সম্পর্কের বিষয়টি হারাইয়া যায়। আশা করা চলে, ঢক্কা নিনাদ সহযোগে নূতন এই প্রচারকর্মে সেই সংকট দেখা দিবে না। তৎসহ, ব্যয়সংকোচও ঘটিবে। নূতন করিয়া কিছু কর্মসংস্থানও দেখা দিবে। সুতরাং,‘বনাম’ নহে, হাল আমলের আধুনিক বিবিধ প্রচার-পদ্ধতির পার্শ্বেই থাক এই আদিম প্রচার মাধ্যম। নূতন ও পুরাতন, দুই হাতে বাজিয়া উঠুক কালের মন্দিরা। পশ্চিমবঙ্গ প্রস্তুত? |