গরম-পোশাকে নয়, গরম কালের পোশাকে। রংচঙে সোয়েটার-মাফলারের বদলে টি-শার্ট আর হাল্কা পাঞ্জাবি গায়েই বছরের প্রথম দিন রাস্তায় বেরোলেন সাধারণ মানুষ।
গত কয়েক দিন ধরে ঘূর্ণিঝড় ‘থানে’ এবং বঙ্গোপসাগরের উচ্চচাপ বলয়ের জন্য তাপমাত্রা বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। তার জেরেই বছরের প্রথম সকালের জবুথবু দৃশ্যটা অনেকটাই বদলে গেল এই রবিবার। রাস্তায় প্রায় কারও গায়েই সোয়েটার-চাদর নেই। যানজটে আটকে থাকা গাড়ির ভিতরে কিঞ্চিৎ হাসফাঁসও।
আবহবিদেরা বলছেন, গত দশ বছরে এমন গরম পড়েনি বছর শুরুর দিনটায়। অথচ, গত রবিবারই ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে শীতলতম বড়দিন। সেই ঠান্ডার আমেজ উধাও হয়ে গিয়েছে ‘থানে’ এবং বঙ্গোপসাগরের উচ্চচাপ বলয়ের জোড়া ফলায়। এমনকী, পৌষের ঝকঝকে আকাশের মুখ ভার করে ছিল মেঘ।
এ দিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। স্বাভাবিকের তুলনায় যা চার ডিগ্রি বেশি। গত দশ বছরে এর কাছাকাছি একমাত্র ২০০৯ সাল। সেই বছর বর্ষবরণের দিনে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
চেনা আবহাওয়া না মিললেও বছরের প্রথম দিনে রাস্তাঘাট আর চিড়িয়াখানা-ভিক্টোরিয়ার অতি-পরিচিত ছবিটা বজায় রাখল শহর। কনকনে শীত নেই বলে রবিবার আরও সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিলেন অনেকেই। ন’টা বাজতে না-বাজতেই ভিড় জমতে থাকে চিড়িয়াখানা, জাদুঘর-সহ কলকাতার বিভিন্ন দ্রষ্টব্য জায়গায়। হাওড়া, শিয়ালদহে ট্রেনগুলি এসে ভিড় উগরে দিয়েছে। আর সেখান থেকে জনস্রোত ছড়িয়েছে শহরের আনাচ-কানাচে। মেট্রো-কর্তৃপক্ষ এ দিন সকাল ন’টা থেকেই ট্রেন চালিয়েছেন। ফলে দমদম এবং কবি সুভাষ থেকেও ভিড় ঢুকেছে শহরে। বাস-গাড়ি চেপেও এ দিন শহরতলি থেকে লোকজন এসেছেন। সেই গাড়ির ভিড়ে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছে বি টি রোড-সহ শহরে ঢোকার রাস্তাঘাটও।
সকাল দশটা। ডায়মন্ড হারবার রোড থেকে চিড়িয়াখানামুখী রাস্তায় যেতে আটকাল পুলিশ। আলিপুরে চিড়িয়াখানার লাগোয়া রাস্তায় তখন মানুষের ঢল। ফুটপাথ ছাপিয়ে ভিড় রাজপথেও। বর্ষবরণের ওই ভিড়ে তারাতলা থেকে খিদিরপুর ডায়মন্ড হারবার রোডে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিপর্যস্ত রইল যান-চলাচল। ওইটুকু দূরত্ব পেরোতেই সময় লেগেছে ঘণ্টা দেড়েক। সময় বাঁচাতে খিদিরপুর, ওয়াটগঞ্জের অলিগলি ধরে ধর্মতলার দিকে রওনা দিয়েছে কিছু গাড়ি, মোটরবাইক। ঘুরপথে যাওয়ায় দ্বিগুণ ভাড়া গুণতে হয়েছে যাত্রীদের।
বছর শুরুর হুল্লোড়ের পাশাপাশি এ দিন কল্পতরু উৎসবেও সামিল হয়েছিলেন বহু মানুষ। পুলিশের হিসেব বলছে, কাশীপুর উদ্যানবাটীতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদও হাজার বিশেক মানুষের ভিড় ছিল। প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে দক্ষিণেশ্বর, আদ্যাপীঠ, বেলুড়েও।
দুপুর একটায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের টিকিটের লাইন চলে এসেছিল বিড়লা তারামণ্ডলের কাছে। আর তারামণ্ডলের লাইন চলে গিয়েছে জওহরলাল নেহরু রোডের মুখ পর্যন্ত। সকালে যাঁরা জাদুঘরে এসেছিলেন, বেলা বাড়তেই ছেলেমেয়েকে নিয়ে তাঁদের গন্তব্য বিড়লা তারামণ্ডল। পার্ক স্ট্রিট মোড়ে দাঁড়ানো এক ট্রাফিককর্তার মন্তব্য, “এ দিক-ও দিক ঘোরার পরে সন্ধ্যা গড়ালেই ভিড় জমবে পার্ক স্ট্রিটে।” কথাটা যে মিথ্যা নয়, তার প্রমাণ রাত আটটার পার্ক স্ট্রিট। ভিড়ের দাপটে রাস্তার দু’দিকের ফুটপাথই তখন থমকে। রেস্তোরাঁগুলি গমগম করছে। আলো ঝলমলে পার্ক স্ট্রিটের ছবিটা বদলাল না পরপর আগুনের ঘটনাতেও। ‘অপরিচিত’ গরম উপেক্ষা করে রাস্তায় নামা সাধারণ মানুষের মুখে এ দিন ঘুরেফিরে এসেছে একটাই প্রশ্ন। শীত কি আর ফিরবে না?
উত্তরটা নিশ্চিত করে দিতে পারছে না আবহাওয়া দফতর। আবহবিদেরা জানান, যে ভাবে শীতের সামনে পাঁচিল তুলে দাঁড়িয়েছে উচ্চচাপ বলয়, তাতে আপাতত কয়েক দিন শীত ফেরার সম্ভাবনা নেই। আর দিল্লির মৌসম ভবন জানাচ্ছে, এই উচ্চচাপ বলয় চলে গেলেও নিস্তার মিলবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কারণ, কাশ্মীরের কাছে আরও একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা অপেক্ষা করে রয়েছে। সেটি উত্তর ভারত হয়ে পূর্ব ভারতের দিকে চলে এলে ফের বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ বলয়ের সৃষ্টি হতে পারে। |