স্মরণ...
চির আনন্দ
দেব আনন্দ নিজে সকালের চা খেতেন এক চামচ মধু মিশিয়ে। বিকেলে প্রায় নয়ই। তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল বেশি চা পেটের ক্ষতি করে। খার-এ ফিফটিন্থ রোডে তাঁর অফিস ঘরে সান্ধ্য সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে যে চা-টা খেয়ে বেরিয়েছিলাম তা অতিথির সঙ্গে দেব সে জন্যই শেয়ার করেননি।
শেষ হতে হতে রাত হয়ে যায়। কার পার্কে আনন্দবাজারের গাড়িটা যে খুঁজে পাচ্ছিলাম না তার কারণ অবশ্য রাতের অন্ধকার নয়। কারণ -- হ্যাংওভারে টলমল করা মাথা। মনে হচ্ছিল ভেতরে দুধ চা নয় চার পেগ ব্ল্যাক লেবেল কেউ র’ খাইয়ে দিয়েছে। সন্দেহ হচ্ছিল সত্যি দেব আনন্দকে মিট করে বার হচ্ছি? নাকি কুয়াশায় ভুলভাল কিছু দেখলাম? নব্বই ছুঁইছুঁই একটা লোক এমন হতে পারে? না কি পুরোটাই আমার কল্পনা? অন্য বেশির ভাগ ইন্টারভিউতে সঙ্গে টেপ থাকে। এখানে টেপের কোনও কাহিনিই ছিল না। অফিস-সফরটা স্রেফ সচিন তেন্ডুলকরের ওপর লেখা একটা বই ওঁকে উপহার দেওয়ার জন্য। যে বইতে টেলিফোনে ওঁর নেওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার রয়েছে। ‘গাতা রহে মেরা দিল’। তেন্ডুলকর সম্পর্কে খুল্লমখুল্লা দেব আনন্দ।
পাঁচ মাসের আগের সেই রাত পেছন ফিরে দেখলে এখন বারবারই মনে হয় কুয়াশাটা আরও বেশি হয়েছিল ঘণ্টাখানেক আগে দিলীপকুমারের বাড়ি থেকে বার হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে। একই উদ্দেশ্যদিলীপ কুমারকে দেখা করে বইটা দেওয়া। তাঁরও যে সাক্ষাৎকার আছে। বিকেল বিকেল দিলীপ কুমারের অফিস কাম বাড়িতে পৌঁছে সায়রা বানুর সাক্ষাৎ পাওয়া গেল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলেন। কলকাতা ইন্ডাস্ট্রিতে কার কী খবর জানতে চাইলেন। আর জানিয়ে দিলেন দিলীপ কুমার অসুস্থ। অসুস্থ বলে শুধু নয় তাঁর সঙ্গে এমনিতেও দেখা করার উপায় নেই। জরাগ্রস্ত তিনি সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে চির নির্বাসন নিয়েছেন। এমনকী খুউব খুউব পরিচিত ছাড়া ফোনেও আসেন না। বিশাল বাংলোর গাড়িবারান্দা থেকে যখন বিফল মনোরথ হয়ে বার হয়ে আসছি বাড়ির দারোয়ান বলল ‘‘আপনি খুব ভাগ্যবান। বাড়িতে দু’ মিনিট ঢুকেই সায়রা ম্যাডামকে দেখতে পেলেন। ওঁরা কারও সামনে বেরোন না।”
অভি না যাও ছোড় কর কে দিল অভি ভরা নহি...
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যদি এঁদের সমবয়সী এবং একই রকম খ্যাতনামা কোনও মানুষ বলতে থাকেন, “আমার সব ফোন নিজে ধরি...লিফট না চললে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাই...গাড়ি হাতের কাছে মজুত না থাকলে ট্যাক্সি ধরি...দুপুরে ঘুমোই না...দিনে পাঁচ ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট তখন কেমন একটা অশরীরী ব্যাপার স্যাপার এসে যায় না!
আসলে দেব-অভিজ্ঞতার জন্য আজ মনে হয় একেবারে অপ্রস্তুত ছিলাম। ওই বয়সী একটা লোকের কাছে এক মিনিট বসলেও কমন ডায়লগ হল, “আর কত দিনই বা আছি!” দেব কী বললেন? না, “এই যে অফিসটা দেখছ এটা আমার নিজের অফিসটার রেনোভেশন হচ্ছে বলে। সাত মাসের মধ্যে নতুন অফিস রেডি হয়ে যাবে। তখন এসো। আমার পেন্ট হাউসটাও কিছু রদবদল করছি। ওটা রেডি হয়ে যাবে আগামী বছরে। এই ‘চার্জশিট’ ছবিটা শেষ হয়ে গেলেই ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ সিকোয়েল করছি। দু’ বছরের মধ্যে হয়ে যাবে। তখন হয়তো প্রচারের কাজে আমার ম্যানেজার তোমাদের অফিসের সঙ্গে টাই আপ করবে।”
অবাক হয়ে ভাবছিলাম। নব্বই বছর পরবর্তী প্ল্যানিং চলছে। লোকটা কি তা হলে মৃত্যুতে বিশ্বাস করে না? মৃত্যু নিয়ে ভাবেনি? দেব জাস্ট উড়িয়ে দিলেন। “ভেবে কী হবে! মৃত্যু যদি হওয়ারই হয় হোক। যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ কাজ করে যাই। তারপর আমার কাজের শেষ বিচার তো পড়ে রইলই। ভাবুক না বিশ্ব তখন আমাকে নিয়ে। আমার কাজ নিয়ে কথা বলুক। ছোটখাটো টুকরোয় ভাঙুক। চূড়ান্ত সমালোচনা করুক। প্রশংসা করুক।” উত্তরটায় বিস্ফারিত হয়ে তখনও ভাবছি, এত বয়স হয়েছে তো মানুষটা সিওর পরজন্মের স্কিমে চলে গেছে। পরজন্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে নির্ঘাত দার্শনিক কিছু বলবে।
দেব বললেন, “পরজন্ম আছে কি না নিশ্চিত নই। পরজন্ম সাবজেক্টটা নিয়ে কখনও নাড়াচাড়া করিনি। এ সব নিয়ে না ভেবেও আমি দিব্যি একটা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। আমার সব সময় মনে হয় কাল যা করেছি তার থেকে যেন বেটার করার ক্ষমতা রাখি। বেশি সামনে না ভেবে আমার যাবতীয় মনোযোগ যেন বর্তমানে থাকে।” টেবিলে পড়ে থাকা তেন্ডুলকরের বইটার দিকে তাকিয়ে এ বার দেব বললেন, “প্রতিবার সেঞ্চুরির পর সচিন আকাশে প্রণাম করে দেখেছেন। ওটা আসলে এনার্জিকে কৃতজ্ঞতা জানানো। মানুষের জীবনে এনার্জিই সব। তবে একটা কথা বলি সচিনের ছক্কা মারা একদিন থেমে যাবে কেন না ওটা শারীরিক। দেব আনন্দের ছক্কা চলতেই থাকবে কেন না ওটা ক্রিয়েটিভিটি। চলবে মোর মোর মোর মোর।” বলতে বলতে দেব প্রায় চেয়ার থেকে অর্ধেক উঠেই পড়লেন। এই সময়ে নিজেকে অভিসম্পাত দিতে শুরু করেছি একটা ভিডিও ক্যামেরা কেন আনিনি সঙ্গে!
কী প্রশ্ন করব তাই গুলিয়ে যাচ্ছে। এই লোকটার পজিটিভিটি দেখলে কে বলবে গত চল্লিশ বছরে লোকটার কোনও বড় হিট নেই। ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ শেষ। এর পর টিমটিম করে ‘দেশ পরদেশ’ জ্বলেছে। কিন্তু সেটা নিতান্তই হ্যাজাকের আলো। এই বয়সী এবং এত ভদ্র একজন মানুষকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা যায় না চল্লিশ বছরের ব্যর্থতা বুকে নিয়েও আপনি কী করে এত পজিটিভ? ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, টিভি-তে যখন আপনার সেরা ছবিগুলো দেখায় নিশ্চয়ই ফিরে ফিরে দেখেন? একটা মানুষ যদি ‘হাম দোনো’, ‘গাইড’, ‘জুয়েল থিফ’, আর ‘হরে রাম...’
এই চারটে ছবি করে থাকে তা হলে বাকি জীবন আর খাটার দরকার কী? দেব আগন্তুককে এই প্রথম একটা বিরক্তিসূচক লুক দিলেন। তখনও তিনি জানেন না আনন্দবাজারে প্রকাশিত তাঁর ইন্টারভিউয়ের ঠিক এই জায়গাটা পড়ে টালিগঞ্জের নামী নায়ক এবং নায়িকা অভিভূত বোধ করবেন।
“হোয়াট ডু ইউ মিন? বসে বসে আমার পুরনো ছবি টিভি-তে দেখব? চারটে ছবি মানে বারো ঘণ্টা চলে যাবে জীবন থেকে। স্রেফ সময় নষ্ট। ওই সময়টা কাজে দিলে কত উপকার। তা ছাড়া পেশাদার হিসেবে আমি তো সব সময় আমার পুরনো কাজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। পুরনোকে ফিরে দেখা মানে সেগুলো রিপিট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রেখে দেওয়া।”
শুনেছিলাম ব্যক্তিগত মহলে দেব নাকি বলেছেন তিনি তাড়াতাড়ি হাঁটেন। তাড়াতাড়ি কথা বলেন। এ জন্যই যে জীবন খুব সংক্ষিপ্ত। সব কিছু তাড়াতাড়ি করে ফেলতে হবে। ইন্টারভিউয়ের এই পর্যায়ে এসে মনে হল কথাটা বোধহয় সত্যি। মৃত্যুর কয়েক দিন বাদে তাঁর নর্মসহচর মোহন চুড়িওয়ালা বলছিলেন, “এই যে শেষ ছবি ‘চার্জশিট’ ফ্লপ হয়ে গেল এক মিনিটও অনুতাপ করতে দেখিনি। বলেছিলেন, “ধুর! পকেটে তিরিশ টাকা নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম। ফ্লপ হয়েও পকেটে তিরিশ টাকার চেয়ে তো বেশি আছে।” আজ মনে হয় চুড়িওয়ালার ইন্টারভিউটা আগেই নেওয়া থাকলে। বা জানা থাকলে যে ওয়াহিদা রহমান দেবকে বলতেন ‘এভারেডি ব্যাটারি। সব সময় ফুল চার্জ রয়েছে। বা ভাইপো শেখর কপূরের মৃত্যু পরবর্তী ব্লগের বিষয় আগেই জানার সুযোগ থাকলে সে দিন রাতে বোধহয় এত হ্যাংওভার হত না।
দেব ইউনিট নিয়ে গেছেন ‘ইশক ইশক’-এর শু্যটিং করতে। হিমালয়ের পাশেই। বিশাল তোড়জোড়। উন্মাদের মতো প্রাণশক্তি। আর ব্যাপক ঝুঁকি নিয়ে নেমেছেন। হিমালয়ের পাশের খাদগুলোর মতোই মারাত্মক দেখাচ্ছে সেই ঝুঁকিকে। কারণ জীবনে উপার্জিত সমস্ত কপর্দক ঢেলে দিয়েছেন ছবির পেছনে। ছবি রিলিজ হওয়ার দিন অভিনেতাদের মধ্যেও টেনশন, ‘দেব সাবের ক্ষতি হবে না তো?’ সন্ধেবেলা বোঝা গেল ক্ষতি হবে না। ব্লগে শেখর লিখছেন, ‘দারুণ উত্তেজিত সব অভিনন্দন আসা শুরু হল। তার সঙ্গে মিনি উৎসবও। লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি। দেবের মুখ তখন ক্রমশ আনন্দে বিভোর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ছবিটা বদলে গেল পরের দু’ঘণ্টায়। শ’খানেক ফোন কল এল। ও দিক থেকে ডিস্ট্রিবিউটাররা কী বলছে জানার সুযোগ নেই। কিন্তু চোখের সামনে দেব আনন্দকে দেখেই
বুঝছি তাঁর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। বক্স অফিসে চরম ব্যর্থ বিচার পেয়ে গেছে এই ছবি। এ বার ফোন আসাও বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে একটা অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা। চোখের সামনে দেখছি অসমসাহসী একটা লোক কী ভাবে ডুবছে। কী অসম্ভব নাটকীয়ভাবে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলছে। পাঁচ মিনিট দেবকেও বিভ্রান্ত দেখাল। এর পর হেসে বললেন, ‘আমি একটু আমার স্যুইটের বেডরুমে যাচ্ছি।’
‘পাঁচ মিনিটে বেরোলেন না। দশ মিনিট লাগল। এ বার দেখলাম লোকটা পুরো বদলে গেছে। চোখ চকচক করছে। মুখে উৎসাহ। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, শেখর পরের ছবির জন্য একটা দুর্ধর্ষ প্লট ভেবে ফেললাম। বলে খাতা বার করে লিখতে শুরু করে দিলেন। কী না নতুন ছবির চিত্রনাট্য। আমার মনে হচ্ছিল নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই লোকটা এক্ষুনি জীবনের সর্বস্ব হারিয়ে আবার পরের ছবির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল? আর মানুষটা ‘ইশক ইশক’ নিয়ে কখনও কথা বলেনি।’
শেখরের লেখাটা না পড়া থাকলেও সেদিন অজান্তেই একটা প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কি কখনও অতীত নিয়ে ভাবেন না? বিশেষ করে সেটা যখন এত মধুর? দেব বলেছিলেন, “না। অতীতকে একবারই খোঁচানোর দরকার হয়েছিল। যখন আমি লংহ্যান্ডে নিজেই নিজের আত্মজীবনী লিখছিলাম। ওই একটা ট্রিপ বাধ্য হয়ে পেছনের দিকে করতে হয়েছিল। আর দরকার পড়েনি।”
মৃত্যু পরবর্তী আপামর ভারতবর্ষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে নিছক মহাতারকা পতনে সমাজের দীর্ঘশ্বাস নয়। তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। চল্লিশ বছর ধরে বাণিজ্যিক বক্স অফিসে হিট পাননি দেব আনন্দ। কিন্তু জীবনের বক্স অফিসে এক অপ্রতিরোধ্য প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। “ম্যায় জিন্দেগি কা সাথ নিভাতা চলা গয়া’এটা যেন তাঁর রিংটোনই হয়ে গিয়েছিল। জীবনের যে কোনও ক্ষেত্রের মানুষ তাঁকে দেখে উৎসাহিত হত। যে বুড়ো হয়েও মানুষ বুড়ো হয় না। আর বুড়ো হয়েও মৃত্যু ভয় পায় না। কারণ তার বিনাশই নেই। ট্যুইটারে বেদনাবিহ্বল সব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে অমিতাভ বচ্চন যেমন লিখেছেন, “মৃত্যুর সঙ্গে দেব সাহেবকে কিছুতেই যেন এক করা যায় না।” তেমনি বড় কর্পোরেট সংস্থার ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর লিখছেন, “দেব আনন্দ চলে যাওয়ার পর এ বার বুঝতে পারছি আমাকেও একদিন যেতে হবে। বুঝতে পারছি মৃত্যু যে অনিবার্য।”
স্বপ্নের দুই নারী, এবং বাস্তবের: সুরাইয়া, জিনাত, ওয়াহিদা
বলা হয়ে থাকে নায়কেরা কারও স্বপ্নের স্বামী। কারও প্রিয় সন্তান। কারও প্রিয় ভাইপো। কারও প্রিয় দাদা। কারও ম্যাটিনি আইডল। কারও আকণ্ঠ প্রেমিক। মৃত্যুর পর আরও বেশি মনে হচ্ছে দেব এই সব কিছুর সঙ্গে মানুষের মনে একাধারে গেঁথে ছিলেন অদম্য জীবন পথিক হিসেবে। প্রতিভার অফুরান স্ফূরণ ঘটানো উদ্ভাবনী কল হিসেবে। সম্ভ্রান্ত এক তারা হিসেবে। সমাজ সচেতন মনুষ্য হিসেবে। এবং অবশ্যই চির রোম্যান্টিক দেব আনন্দ হিসেবে।
গায়ক শান সম্প্রতি গভীর দুঃখে ট্যুইট করেছেন, প্লে-ব্যাক সিংগিং এখন এক মৃত শিল্প। তাঁর আত্মা শান্তি পাক। গত রবিবারযাকে ‘কালো রবিবার’ আখ্যা দিচ্ছে ভারতের মানুষ তার পর থেকে আজ পর্যন্ত টানা যেমন প্রবাদ পুরুষের কালজয়ী সব গানগুলো বাজছে এফ-এম-এ। টি ভি তে। দোকানে। ইউ টিউব থেকে যে পরিমাণ ঊর্ধ্বশ্বাসে লোকে ডাউনলোড করছে তাতে মনে হচ্ছে মারা গিয়ে কি প্লে-ব্যাক সিংগিং-কে নতুন জন্ম দিয়ে গেলেন দেব? ভারতবর্ষে কত শতাংশ মানুষ আছে যারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারে গত ছ’দিনে একবারও শোনেনি‘আভি না যাও ছোড় কর কে দিল আভি ভরা নহি’।
জীবনের মাত্র ওই একদিন দেড় ঘণ্টা দেব আনন্দের মুখোমুখি কাটিয়ে মনে হয়েছিল মানুষটার কোথাও যদি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অতীতবিলাস থেকে থাকে তা ছিল নিজের ‘দিল’ নিয়ে। নিজের প্রিয় দুই নায়িকাকে নিয়ে। মধুবালা? না। ওয়াহিদা? না। সাধনা? না। সুরাইয়া? হ্যা।ঁ মুমতাজ? না। জিনাত আমন? হ্যা।ঁ
মৃত্যু পরবর্তী কেউ কেউ বলছিলেন দেব-সুরাইয়ার এ বার বোধহয় মিলন হবে। সেই আমলে তাঁদের প্রেম। ধর্মঘটিত কারণে ফিল্মোচিত বিচ্ছেদ। সুরাইয়ার এনগেজমেন্টের আংটি সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দেওয়া। পুরো ব্যাপারটাকে দেব আনন্দের আত্মজীবনী অনুযায়ী বর্ণনা রোমিও-জুলিয়েটোচিত এক শেকসপিয়ার মহা ট্র্যাজেডির পর্যায়ে নিয়ে যায়। অথচ ২০১১-র জুনে সুরাইয়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়েছিল সময়ের দীর্ঘ অবসর বোধহয় প্রবাদপ্রতিম সেই প্রেমক্ষতকে জুড়িয়ে দিয়েছিল। আর যে ক্ষতটা সম্ভবত টাটকা নিয়ে লন্ডনের বৈদ্যুতিক চুল্লিতে উঠবেন দেব, সেটা জিনাত আমন সম্পর্কিত। আত্মজীবনীতে জিনাত কী ভাবে তাঁকে ফাঁকি দিয়ে রাজ কপূরের কাছে চলে গিয়েছিলেন সবিস্তারে লিখেছেন দেব। ঠিক যে দিনটায় তিনি মোমবাতির আলো ঢাকা ডিনারে প্রপোজ করবেন ঠিক করেছিলেন সেই দিনই রাজ কপূরের সঙ্গে জিনাতের ঢলাঢলিতে বিরক্ত হয়ে প্রিয় নায়িকার জীবন থেকে চির নির্বাসন নেন।
জিনাতকে বছর খানেক আগে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “প্রত্যেকটা ঘটনার একটা প্রেক্ষিত থাকে। এক এক জন এক এক ভাবে সেটা দেখে। হোটেলের এই ঘরে আমি আপনি আর যে ভদ্রলোক আমায় কলকাতায় এনেছেন তিন জন বসে আছি। হঠাৎ করে যদি টেবিল থেকে একটা প্লেট পড়ে ভেঙে যায় তিন জন তার তিন রকম ব্যাখ্যা দেবে। দেব সাহেব আর আমার ব্যাপারটাও তাই। তবুও উনি সম্মাননীয় ব্যক্তি। আমায় ব্রেক দিয়েছিলেন। এখানেই আমি থেমে যেতে চাই।” দেব লিখেছেন, বিচ্ছেদের সময়টা হল যখন, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ তৈরি হতে কয়েক মাস বাকি। অর্থাৎ ‘ইশক ইশক’ হয়ে গিয়েছে। অথচ ইন্ডাস্ট্রির খবর অনুযায়ী তার অনেক আগেই দু’জনের গভীর প্রেম চলছিল। এমনকী শেখর কপূর বাড়ির লোক হয়ে লিখেছেন, “জিনাতের ওঁকে ডাকার একটা বিশেষ ধরন ছিল। দু’টো চোখ নাচিয়ে যে ভাবে বলত ‘দেব সাহিব’ ওটা দেখলেই যে কেউ বুঝবে তলে তলে কী চলছে। দেব পাল্টা যে ভাবে আবার সুরে উত্তর দিতেন, ‘জিনি’ তাতে গল্পটা তখনই
কনফার্মড হয়ে যেত।” এটাই যদি সত্যি হয় তা হলে আবার নতুন করে প্রেম নিবেদন কোথা থেকে এল? না কি অনেকে যেটা মনে করে সেটাই সত্যি? সে দিন দেব বিয়ের জন্য জিনাতকে প্রপোজ করতে চেয়েছিলেন। কোথাও একটা এই দু’জনের পাশ্চাত্যপ্রিয় দর্শনের একটা সংযোগ ছিল। শাড়ি পরা ভারতীয় নায়িকাদের জগতে যে ‘দম মারো দম’ মার্কা মানসিক উদারীকরণ করেছিলেন জিনাত তার প্রযোজক ছিলেন দেব। সুরাইয়াকে তিনি সৃষ্টি করেননি। বরঞ্চ সুরাইয়া সেই সময়ে ছিলেন তাঁর চেয়ে বড় স্টার। জিনাতের বেলায় যে অধিকারবোধ কাজ করে গোটা জীবন তার রেশ থেকে গেল সেটা সুরাইয়ার বেলায় হওয়ার উপায় ছিল না। অদম্য দেব আনন্দকে ওই একবারই হাল্কা করে পাশের বাড়ির অভিমানক্ষত প্রেমিক মনে হয়েছিল। যখন বলেছিলেন, “জিনাতের সঙ্গে যে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে দেখা করার বা যোগাযোগের চেষ্টা করি এমন নয়। আর মুম্বই এত বড় শহর যে দু’জনে কথা বলে না নিলে চট করে দেখা হওয়াও সম্ভব নয়।”
তথাকথিত ‘কালো রবিবার’য়েই টালিগঞ্জের প্রযোজক-পরিচালক-টিভি কর্তাদের নিয়ে গড়া এক ব্ল্যাকবেরি গ্রুপ সন্দেহ নিরসনের চেষ্টা করছিল যে ঠিক এক্ষুনি স্বর্গে দেব কী করছেন? দেব রেস্ট নিচ্ছেন এটা কারও দূরতম কল্পনাতেও নেই। কেউ মনে করছেন সুরাইয়াকে নিয়ে নতুন ছবির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। কেউ মনে করছেন স্বর্গে তৎপরতার অভাব ঘটেছে বলে তাঁকে তাড়াতাড়ি ডেকে নেওয়া হল। কেউ মনে করছেন এক্ষুনি তো নায়ক হতে পারবেন না, কিশোর শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করলেন। পোস্টগুলো দেখতে দেখতে দেব আনন্দের কথাটা মনে পড়ছিল, “মুম্বই এত বড় শহর যে দু’জনে কথা না বলে নিলে চট করে দেখা হওয়াও সম্ভব নয়।”
মনে হচ্ছিল দেব হয়তো এখন অপেক্ষায় থাকবেন। স্বর্গের সাইজ নিশ্চয়ই মুম্বইয়ের মতো বড় হবে না!


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.