সুব্রত কাপ খেলা ফুটবলারের সঙ্গী এখন ক্রাচ। তাঁর যে বাঁ পায়ের জাদুতে মাঠ মুগ্ধ হয়ে থাকত, খেলার মাঠে এক দুর্ঘটনায় সেই পা কাটা গিয়েছে। বছর দেড়েক আগের সেই দুর্ঘটনায় স্মৃতি মুছে পুরুলিয়ার বরাবাজার থানার ফাগুডি গ্রামের তপন মুর্মু এখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চাইছেন।
মাঠে তপনের পায়ে বল থাকলে বিপক্ষ শিবিরে আতঙ্ক তৈরি হত। এই বুঝি তাঁর পা থেকে বল গোলের মধ্যে ঢুকে গেল। সেই তপন এখন সাতাশ বছরের যুবক। বছরভর জেলার বিভিন্ন মাঠে খেলে বেড়ানো সেই তপন এখন ঘরের মধ্যে স্বেচ্ছাবন্দি অবস্থায় দিন কাটান। ক্রাচ ছাড়া হাঁটতে পারেন না। খড়ের ছাউনির মাটির দুটি ঘর। এই ঘরে বসেই এখন তাঁর দিন কাটে। তিনি জানান, বরাবাজার হাইস্কুলে পড়ার সময় সুব্রত কাপে জেলার হয়ে খেলেছিলেন। স্কুল ছাড়াও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকেই খেলার ডাক আসত। সেখানে খেলার বিনিময়ে যা টাকা পেতেন, বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে তুলে দিতেন। কিন্তু ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর জীবন ওলটপালট হয়ে যায়। তাঁর কথায়, “আমি স্ট্রাইকার ছিলাম। বরাবাজারের হুচুকডি গ্রামে একটি ফুটবল ম্যাচ খেলতে গিয়েছিলাম। বিপক্ষের দু’জনকে কাটিয়ে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে বলে পা ঠেকাতে যাওয়ার সময় কেউ একজন পিছন থেকে সজোরে আমার বাঁ পায়ে লাথি মারে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মাঠের উপর পড়ে যাই।” |
তিনি জানান, প্রথমে স্থানীয় ভাবে চিকিৎসা করানো হয়। কয়েকদিন পরে বাঁ পায়ের হাঁটুর নীচ থেকে পূঁজ বের হতে থাকে। সেই সঙ্গে প্রবল যন্ত্রণা শুরু হয়। বরাবাজার ব্লক স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, দেরি হয়ে গিয়েছে। এখানে নয়, বড় কোনও হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হবে। তপনের বাবা কৃষ্ণপদবাবু বলেন, “টাটার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তপনকে নিয়ে যাই। চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন ওর বাঁ পা কেটে বাদ না দিলে জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই চিকিৎসকদের কথাই মেনে নিতে হয়।” চোখের জল ঝরে পড়ে প্রৌঢ়ের। ক্রাচটা কাছে টেনে নেন তপন। বলেন, “সামান্য জমিতে বেশি ফলন হয় না। ছোট ভাই সুবোধ নবম শ্রেণিতে পড়ার ফাঁকে লোকের জমিতে খাটতে যায়। বাড়ির এই অভাব আর সহ্য হয় না। গ্রামে ছোটাখাটো ব্যবসা করার জন্য ব্যাঙ্কে ঋ
ণ চাইতে গিয়েছিলাম। ফিরিয়ে দিয়েছে।” তপনের মা সনকি মুর্মুর চোখে এখনও সেইসব দিনের স্মৃতি ভাসে। তিনি বলেন, “তখন বাড়িতে কত লোকজন আসতেন ওকে খেলাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এখন তাঁরা কেউ খবর নিতেও আসেন না। ওঁর চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়েছি।”
তপন বরাবাজার হাইস্কুলে পড়ার সময় প্রধান শিক্ষক ছিলেন শম্ভুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন তিনি মানবাজার রাধামাধব হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, “তপনের মধ্যে ভাল ফুটবলার হওয়ার সব গুণ ছিল। কিন্তু তাঁর দুর্ঘটনার খবর জানতাম না।” বরাবাজারের বাসিন্দা ব্লক যুব দফতরের কর্মী অনিল পরামানিক বলেন, “স্টাইকার হিসেবে তপন এক সময় বেশ নাম করেছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনায় ওর জীবন থমকে গিয়েছে। আমরাও চাই তিনি স্বাবলম্বী হয়ে উঠুন।” বরাবাজারের বিডিও দেবজিৎ বসু বলেন, “আমি তপনবাবুর সঙ্গে কথা বলব। তিনি কী ধরনের কাজ চাইছেন খোঁজ নিয়ে তাঁকে সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করব।” |