আপনার কলমে


সফরনামায় ইস্তানবুল
শ্রাবণী বন্দ্যোপাধ্যায়
শিয়া ও ইউরোপের মিলনস্থল— ইস্তানবুলে আসার ইচ্ছে ছিল বহু দিন ধরেই। ইতিহাস পড়তে পড়তে খালি মনে হত সেই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য থেকে রোমানদের হাত ঘুরে কী করে এই দেশ রাতারাতি 'ইসলাম' হয়ে গেল!

জানি না কেন, এখানে আসার আগে মনে হয়েছিল— কায়রোর মতো কোনও পর্যটক-ঠকানো জায়গা হবে এটি। অবশ্য শহরে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে ভুল ভেঙে গেল। বিমানবন্দর থেকে বাসে যখন শহরের দিকে এগোচ্ছি, খেয়াল করলাম শহরটা বেশ পাহাড়ি আর রাস্তার দু’ধারে গিজগিজ করছে বহুতল বাড়ি। পরিষ্কার শহর। রাস্তাঘাটে বোরখা পরা মহিলা প্রায় নেই বললেই চলে। এ শহর যে 'গোঁড়া'দের নয় তা বোঝাই গেল।

ট্যাক্সিম স্কোয়্যার
প্রবল যানজট কাটিয়ে অবশেষে আমাদের বাস পৌঁছল ট্যাক্সিম স্কোয়্যারে। জায়গাটা অনেকটা কলকাতার ধর্মতলার মতো। রাস্তার দু’ধারে প্রচুর দোকান— সেখানে আসল, নকল সব রকম জিনিসই বিক্রি হচ্ছে। বড় দোকানে আসল 'গুচি'র ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফুটপাথে নকল 'গুচি'র ব্যাগ— কোনওটারই অভাব নেই। রাস্তার ধারে ছোট বড় রেস্তোরাঁয় কাবাব, পিত্জা, বার্গার— সবই পাওয়া যায়। অনেক ভেবেচিন্তে এক ধরনের ডালের স্যুপ আর মিক্সড কাবাবের অর্ডার দিলাম। টক দই দেওয়া ডালের স্যুপটা মুখে দিয়েই মেজাজটা গেল খিঁচড়ে। যাই হোক, শিক কাবাব দিয়েই রাতের খাবার সারতে হল। এর পর একটি ট্যাক্সি নিয়ে সুলতান আহমেদের দিকে রওনা দিলাম। আমাদের হোটেল ওখানেই। ওই তল্লাটের আশেপাশে বহু দর্শনীয় জায়গা আছে যেমন, হাজিয়া সোফিয়া, ব্ল্যু মস্ক ইত্যাদি। অত রাতে জায়গাটা এতটাই জমজমাট যে মনে হচ্ছিল সবে সন্ধে হয়েছে। চারিদিকে দোকান আর সেই সব দোকানে বিক্রি হচ্ছে সুন্দর পোর্সেলিনের প্লেট, হুকো, লন্ঠন, নাগরাই জুতো, খেলনা। যা দেখি সবই প্রায় কিনতে ইচ্ছে করে। রাস্তার দু’ধারে প্রচুর লোক বসে খাওয়াদাওয়া করছে। কেউ কেউ ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দ করে গড়গড়ায় টান দিচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে বসফরাসের ধারে গেলাম আর সেই সঙ্গে প্রচুর 'ক্রুজ শিপ' চোখে পড়ল। ফিরে এলাম যখন, রাত প্রায় বারোটা তখন। কিন্তু তখনও জায়গাটা অসম্ভব জমজমাট। পানীয়ের গ্লাস নিয়ে হোটেলের সামনে একটি টেবল দখল করে বসে পড়লাম আমরাও।

ইস্তানবুলের ইতিহাস বলে রাজা বাইজাস এই শহরটি তৈরি করেন খ্রিস্টপূর্ব ছ’শো শতাব্দীতে। রাজার নাম থেকেই শহরের নাম হয় বাইজান্টিয়ান। তার পর পারস্য ও গ্রিসের হাত ঘুরে ৭৩ খ্রিস্টাব্দে রোম সাম্রাজ্যের অধীনস্ত হয় এই শহর। কনস্তান্তিন ছিলেন প্রথম রোমান সম্রাট যিনি এই দেশটিকে লিখিত ভাবে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য বলে ঘোষণা করেন। এবং কনস্তান্তিনের নামানুসারে এই শহরের নাম হয় কনস্তান্তিনোপল। রোম সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও এই পূর্ব রোম সাম্রাজ্য প্রায় এক হাজার বছর টিকে ছিল। কনস্তান্তিই প্রথম রোমান সম্রাট যিনি খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন এবং হায়া সোফিয়ার মতো এক অপূর্ব সুন্দর চার্চ নির্মাণ করেন।

প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি বসফরাস প্রণালী যার এক দিকে সি অফ মারমারা, অন্য দিকে কৃষ্ণসাগর। আর এই তিনের মাঝেই ইস্তানবুল। প্রাকৃতিক এই সুরক্ষা ছাড়াও রোমান সম্রাটরা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল এই শহর। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দে অটোমন টার্করা কনস্তান্তিনোপলে ঢুকে পড়ে এবং শহরে খাবার ও জল সরবরাহের সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়। বাধ্য হয়ে তখন সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের কাছে হার স্বীকার করে রোমানরা। মেহমেদ শহরে ঢুকে প্রথমেই তখনকার রাজাকে খুন করেন। এবং রাতারাতি হায়া সোফিয়াকে পরিণত করেন মসজিদে। মেহমেদ নিজের বাসস্থান হিসেবে তোপকাপি প্যালেস তৈরি করেন এবং তার সময়েই জন্ম হয় ‘গ্র্যান্ড বাজার’-এর যেটি নাকি কিছু দিন আগে পর্যন্তও পৃথিবীর সবথেকে বড় মাথা-ঢাকা বাজার ছিল। চারশো বছর ধরে তোপকাপি প্যালেসই অটোমান সুলতানদের বাসস্থান ছিল। এই সুলতানদের মধ্যে সব থেকে নামকরা ছিলেন সুলেমান, যিনি লোকের কাছে ‘সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট’ বলে পরিচিত। তাঁর সময়েই জন্ম হয় পৃথিবীখ্যাত স্থপতি সিনানের, যিনি তৈরি করেন ব্লু-মস্ক। অটোমান সুলতানদের সর্বশেষ সম্রাট ছিলেন ষষ্ঠ মেহমেদ। তার পর ১৯২২ সালে কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে জন্ম হয় টার্কি রিপাবলিকের। বলা যায় কামাল আতাতুর্কই আধুনিক তুরস্কের জনক। শহরের চতুর্দিকেই চোখে পড়ে তাঁর প্রস্তর মূর্তি। এই দেশে পৃথিবীর সব ধর্মের মানুষেরাই তাঁদের নিজস্ব ধর্ম পালন করতে পারেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন, রবিবার।
হায়া সোফিয়া
পর দিন প্রথমেই গেলাম হায়া সোফিয়া মস্ক দেখতে। মসজিদটি যে আসলে একটা গির্জা, ভিতরে ঢুকলেই তা বোঝা যায়। গ্রিক ভাষায় হায়া মানে পবিত্র আর সোফিয়া মানে জ্ঞান। কনস্তান্তিন যে গির্জাটি তৈরি করেন তা আকারে খুব একটা বড় ছিল না। আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আমলে সেটি বিরাট আকারে পুনর্নির্মিত করা হয়।

প্রথমেই চোখে পড়ল কাচের গায়ে আঁকা মেরির কোলে বসা যিশুর ছবি। মাটি থেকে একশো আশি ফুট উঁচু একটি ডোম আর মেঝেটি যদিও চৌকোণা কিন্তু হঠাত্ করে দেখলে আয়তক্ষেত্র বলে মনে হয়, কারণ মেঝের দু'দিকে দু'টো অর্ধ বৃত্তাকার ডোম করে মেঝেটাকে দু’পাশেই আরও খানিকটা করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিতরে বাইজান্টাইন রাজাদের শপথ নেওয়ার জায়গাটা ঘিরে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মেঝের মোজাইকগুলো এত বছর বাদেও খুব পরিষ্কার ভাবে দেখা যায়। বেশ কিছু যিশুর ছবিকে মুছে দিয়ে অটোমান সুলতানরা সেখানে আরবি ভাষায় অনেক কিছু লিখেছে— সম্ভবত ধর্মীয় বাণী। ভেতরে বিশাল আকারের প্রায় গোটা চল্লিশেক ঝাড়বাতি। এ ছাড়া দু'দিকেই প্রকাণ্ড জালার মতো মার্বেলের তৈরি একটি করে ভেস রাখা। পাশ দিয়ে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো একটি রাস্তা দোতলায় চলে গিয়েছে। সেখান থেকে নাকি রানি পালকি নিয়ে ওঠানামা করতেন। তাঁর পোশাক হিরে জহরতের জন্য এতই ভারী ছিল যে লোকজনের সাহায্য বা পালকি ছাড়া উনি নড়তেই পারতেন না! দোতলা থেকে তাঁর সহচরীদের সঙ্গে বসে নীচে কী হচ্ছে সব লক্ষ করতেন রানি। হাজিয়া সোফিয়ার মেঝেটা এক সময় পুরোটাই দামি মার্বেল দিয়ে ঢাকা ছিল। এখন অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। অটোমান সুলতানরা যিশু ও অন্যান্য প্রফেটদের ছবি মুছে দিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল, যে লোকে যেন দেখে এটাকে মসজিদ বলে মনে করে। চারিদিকে মিনারেটও বসিয়েছিল তারা। তবে ভাল করে লক্ষ করলে মোজাইকের ফাঁকফোঁকড় দিয়ে দেবদূত, যিশু, মা মেরির ছবি চোখে পড়েই যায়!
ব্লু মস্ক
হায়া সোফিয়ার খুব কাছেই 'ব্লু মস্ক' যেটা 'সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট'-এর সময়ে বিখ্যাত স্থপতি সিনানের তৈরি। বাইরে থেকে কোথাও নীলের ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ল না, তবে দৃষ্টি কাড়ল বিরাট বিরাট ছ'টি মিনার। ভিতরে ঢুকেই বুঝতে পারলাম এর নামের মাহাত্ম্য। ভেতরের দেওয়ালটা প্রায় কুড়ি হাজার নীল সেরামিক টাইলস দিয়ে তৈরি আর ডোমের ভেতরের অংশ প্রায় পুরোটাই নীল। মসজিদে রয়েছে প্রায় দু'শোটি জানালা। ভেতরে অজস্র ঝাড়বাতি। এই আলো নীল রঙের টাইলে পড়ে এক অপূর্ব সুন্দর মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।

পর দিন ঠিক করলাম হপ-অন-হপ-অফ বাসে চেপে ইস্তানবুল শহর ঘুরব।

গোল্ডেন হর্ন— বসফরাস প্রণালী থেকে এই খাঁড়িটি শহরের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। সাত কিলোমিটার লম্বা আর সাতশো মিটার চওড়া খাঁড়িটি হঠাত্ করে দেখলে নদীর মতো মনে হয়। গোটা তিনেক ব্রিজ আছে এর উপর, আর পাশেই ঐতিহাসিক গালাটা টাওয়ার। ন'তলা গোল টাওয়ার এক সময় এই শহরের সব থেকে উঁচু স্থাপত্য ছিল আর সম্রাটের সৈন্যরা এর উপর থেকে লক্ষ্য রাখত সি অফ মারমারা দিয়ে কোনও শত্রু জাহাজ ঢুকছে কি না! ইস্তানবুল শহরটা ছোট ছোট পাহাড় বা টিলা দিয়ে ঘেরা। এই টিলাগুলোর মাথায় অজস্র সুন্দর সুন্দর বাড়ি। চোখে পড়ল হাল্কা হলুদ রঙের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও।

বসফরাস থেকে গালাটা টাওয়ার

তিন কিলোমিটার লম্বা ইস্তিকলাল
এখান থেকে ট্যাক্সিম স্কোয়্যার যেতে হলে ইস্তিকলাল বলে একটি রাস্তা নিতে হবে। এই রাস্তা ইস্তানবুলের সবথেকে বিখ্যাত, শুধুমাত্র পথচারীদের চলার রাস্তা, যা শেষ হয়েছে ট্যাক্সিম স্কোয়্যারে গিয়ে। কিছু দূর গিয়ে ভুল রাস্তা নিয়েছি মনে করে এক ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞাসা করায়, তিনি সঙ্গে সঙ্গে হেসে সামনের দিকে পুরো হাতটা উঁচিয়ে বললেন, গো-গো ইস্তিকলাল অর্থাত্ নাক বরাবর চলতে থাকুন, তা হলেই ইস্তিকলাল পেয়ে যাবেন। যদিও এখানকার বাসিন্দারা ভাল ইংরেজি বলতে পারেন না, তবুও ট্যুরিস্ট দেখলে সাধ্যের বাইরে গিয়েও সাহায্য করেন। এই তিন কিলোমিটার লম্বা রাস্তাটার দু’ধারে সুন্দর সুন্দর পুরনো ইউরোপীয় নিওক্লাসিক্যাল বাড়ি, ব্যুটিকের দোকান, আর্ট গ্যালারি, থিয়েটার, লাইব্রেরি, কফিহাউস— কী নেই! প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনেই ইয়া মোটা কাবাব খাওয়া বেড়ালরা বসে আছে বাঘের মতো। এরা কাউকেই ভয় পায় না আর দোকানে ঢুকতে গেলেও তাদেরকে টপকে ঢুকতে হয়! ওরা কিন্তু এক বিন্দুও সরবে না!

এক সময় মনে হল বিখ্যাত ইসকিন্দার কাবাব খেলে মন্দ হয় না— বড় প্লেটের উপর একটা মোটা গোল পরোটা, তার উপরে প্রচুর পরিমাণে সরু সরু করে কাটা গ্রিল করা ভেড়ার মাংস। টপিং হিসেবে রয়েছে টোম্যাটো সস্, দই আর গলানো মাখন। এখানকার বেড়ালগুলোর যে কেন এত ভাল স্বাস্থ্য সেটা বুঝতে আর অসুবিধে হল না!

এ বার একটু মিষ্টিমুখ করা যাক। গুড় আর বাদাম দেওয়া কালচে রঙের হালুয়া— আমার খুব একটা ভাল লাগল না। চারপাশে প্রচুর শুকনো মিষ্টির দোকান। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে পৌঁছলাম ট্যাক্সিম স্কোয়্যার। সেখান থেকে বিখ্যাত গ্র্যান্ড বাজার। পৌঁছনোর আগে পর্যন্ত কোনও ধারণাই ছিল না ভেতরে কত কী অপেক্ষা করছে! এটি সুলতান মেহমেদ দ্য কনকরার তৈরি করেন ১৪৬১ সালে। কলকাতার হগ মার্কেটের সঙ্গে তুলনা করা যেতেই পারে, যদিও আয়তনে তার দশ গুণ। এখানে কী পাওয়া যায়, আর যায় না, তা নিয়ে বোধ হয় মাথা না ঘামানোই ভাল!

এই মাথা-ঢাকা গ্র্যান্ড বাজারের ভেতরে প্রায় ষাটটি গলি এ দিক ও দিক ঘুরে গিয়েছে। এক বার না এক বার এখানে রাস্তা হারানো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রতিদিন প্রায় লাখ চারেক মানুষ এখানে আসেন— মূলত পর্যটক, আর স্থানীয়রা তো আছেনই! কার্পেট, চামড়ার কোট, পোর্সেলিনের থালা-বাটি, ভেলভেটের টুপি, জুতো, রং বেরঙের লন্ঠন, সোনা, মুক্তোর দোকান— কী নেই! সব কিছুই কিনতে হয় দরদাম করে।
গ্র্যান্ড বাজার
গ্র্যান্ড বাজারের খুব কাছে ‘সেমবারলিটাস’ হামাম— ১৫৮৪ সালে বিখ্যাত স্থপতি সিনান তৈরি করেন এটি। সুলতান তৃতীয় মুরাটের মা সিনানকে অনুরোধ করেন এই হামাম নির্মাণ করতে। এগুলি শুধু স্নান করার জায়গাই নয়, স্নানের সঙ্গে একে অন্যের সঙ্গে গল্পগুজবও করত এখানে— অনেকটা এখনকার ক্লাব হাউসের মতো। সব হামামের বিশেষত্ব হল ভেতরে বিশাল বড় বড় আলো ঝলমলে ডোম, তার নীচে উত্তপ্ত মার্বেলের মেঝে। প্রথমেই সেখানে একটি তোয়ালে জড়িয়ে শুয়ে পড়তে হয়। ঘরটা এতটাই গরম যে কিছু ক্ষণের মধ্যে লোকজন ঘামতে আরম্ভ করে, আর আস্তে আস্তে চামড়াগুলি নরম হতে থাকে। তখন আরম্ভ হয় তাকে ছোবড়া আর সাবান দিয়ে ঘষার পালা। এই ঘষার জোর এতটাই যে শুধু ময়লা কেন শরীরের ছাল-চামড়াও অনেকটা উঠে যায়। তার পর পুরো শরীরটাকে পর্যায়ক্রমে এক বার ঠান্ডা আর এক বার গরম জলে চোবানো হয়। এর পর ম্যাসাজের নামে দমাদম পেটাতে থাকে। আমার স্বামী বলেছিলেন, ও প্রচুর টাকা বকশিস দেবে তাকে যেন মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভাষা না বুঝে ম্যাসাজের প্রশংসা করেছে মনে করে আরও জোরে মারতে থাকে হামামের লোক!

তোপকাপি প্যালেস
পর দিন তোপকাপি প্যালেসের দিকে রওনা হলাম। যদিও এই প্রাসাদটি তৈরি হয় অটোমান সুলতানদের সময়ে, কিন্তু এই জায়গার ইতিহাস চলে আসছে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সময় থেকেই। তার প্রধান কারণ এর ভৌগলিক অবস্থান। প্রাসাদটি তৈরি হয় ইস্তানবুলের সব থেকে উঁচু জায়গায়, যার সামনেই সি অফ মারমারা ও গোল্ডেন হর্ন। বসফরাস প্রণালীও দেখা যায় এখান থেকে। তোপকাপিকে প্রাসাদ না বলে একটা ছোটখাটো শহর বলাই ভাল। পৃথিবীর অন্যান্য বিখ্যাত প্রাসাদের মতো কোনও বিশেষ নকশা নেই এই স্থাপত্যের। সুলতানরা যে যার নিজের পছন্দ মতো ভেঙে-গড়ে-বাড়িয়ে নিয়েছিল। সুলতান সুলেমানের সময় এটি বিশাল আকার ধারণ করে। সাত হাজার স্কোয়্যার মিটার রাজপ্রাসাদে অজস্র কোর্টইয়ার্ড বা চত্বর আর তার চতুর্দিকে বাড়ি— একটা বড় শহরের ভেতরে পাঁচিল ঘেরা আর একটা শহর। প্রথম দু’টো বিশাল চত্বরে বাইরের লোক যেতে পারত আর সুলতান সেখানে সোনার চেয়ারে বসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখতেন। তৃতীয় কোর্টইয়ার্ড থেকে সুলতানের ঘনিষ্ঠ লোক ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারত না। এক সময় এখানে একটা বিরাট স্কুল ছিল এবং খ্রিস্টান বাচ্চাদের এখানে এনে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হত। সুলতানরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে সব সম্পত্তি এনেছিলেন এখানে তার একটি প্রদর্শনীও রয়েছে। চতুর্দিকে সোনা, হিরে, মুক্তো, চুনী ও পান্নার জিনিসের ছড়াছড়ি। তার মধ্যে বেশির ভাগই হয় লুট নয় তো পৃথিবীর বিভিন্ন রাজা রানিদের কাছ থেকে পাওয়া উপহার।

তোপকাপি প্রাসাদের প্রদর্শনশালা

সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট-এর খাট
সুলতানদের পরা কিছু কাফতান সাজানো আছে— সোনা, মুক্তো, হিরে, পান্না দিয়ে কাজ করা। কাফতানের সাইজ দেখলে হাঁ হয়ে যেতে হয়! কোনও মাঝারি মাপের মানুষ তিন বার ওর মধ্যে ঢুকে যাবে। সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এতটাই মোটা ছিলেন যে তাঁর খাট ছিল প্রায় মাটির সঙ্গে লাগোয়া, যাতে উনি গড়িয়ে উঠতে পারেন। দেওয়ালে বড় বড় তলোয়ার ঝোলানো, হাতলে হিরে-পান্না বসানো। তার মধ্যে একটি নাদির শাহ ভারতবর্ষ থেকে লুট করে সুলতানকে উপহার দিয়েছিলেন। প্রত্যেক অটোমান সুলতানদের আলাদা আলাদা পাগড়ি ছিল, মণিমাণিক্যখচিত। ঘরের এক পাশে রাখা একটা বিশাল জেডের গামলা— রাশিয়ার জার নিকোলাসের দেওয়া উপহার। তৃতীয় ঘরের বিশেষ আকর্ষণ— পৃথিবীর চতুর্থ বড় হিরে। এর 'কাট' এতটাই সুন্দর যে রীতিমতো চোখ ঝলসে যায়! অনেকে বলেন, এটা নাকি নেপোলিয়ন দ্য বোনাপার্টের মায়ের হিরে ছিল। দু'টো বড় বড় মোমদানি— এক একটি আটচল্লিশ কিলোগ্রাম সোনা দিয়ে তৈরি, আর গায়ে অজস্র ছোট ছোট হিরে বসানো। মোমদানিগুলি বহু দিন হজরত মহম্মদের সমাধিতে বসানো ছিল। চতুর্থ ঘরে সুলতান মামুদের রাজসিংহাসন রাখা এবং এটিও সোনা, মুক্তো ও পান্না দিয়ে সাজানো। এটিও নাদির শাহ ভারতবর্ষ থেকে লুট করে উপহার দেয় অটোমান সুলতানদের।

এর পরে যে ঘরে ঢুকলাম তার নাম ‘পবিত্র ঘর’। এখানে প্রফেট মহম্মদের তীর-ধনুক, দাঁত ও দাড়ির একটি চুল রাখা আছে। দাড়ির চুলটা অবশ্য ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে দেখতে হয়। এখানে মোজেসের লাঠি, প্রফেট মহম্মদের জামাতা আলির জামা, কারবালা যুদ্ধের মাটি, কাবার চাবি রাখা আছে। এই ঘরে নাকি অটোমান সুলতানরাও বছরে এক বারের বেশি ঢুকতে পারতেন না! এখন অবশ্য আমার মতো রাম, শ্যাম, যদু, মধুও যখন খুশি ঢুকতে পারে।

একদম ভেতরে হল সুলতানদের হারেম। গাইডের মুখে শুনলাম এই সব মেয়েদের জীবন তেরো চোদ্দ বছর থেকেই আরম্ভ হত। চতুর্দিকেই দেখলাম প্রচুর ছোট ছোট ঘর অর্থাত্ এক একটি ঘরে এক এক জন বেগম থাকতেন। পাছে তাঁরা কোনও চক্রান্ত করেন তাই একে অপরের সঙ্গে কথা বলার অধিকার ছিল না। হারেমে মোট তিনশো'টি ঘর ও ন'টা টার্কিস হামাম। হারেমের এক পাশে অপূর্ব পোর্সেলিনের টাইল দিয়ে সাজানো সুলতানের মায়ের বিশাল বাড়ি। এর কাছেই তোপকাপি প্যালেসের সব থেকে বড় প্রাসাদ— যেখানে সুলতান তাঁর প্রথম বউ এবং প্রথম সন্তানকে নিয়ে থাকতেন। এই প্রাসাদে একটা ঘড়ি দেখে দৃষ্টি আটকে গেল— গাইড বললেন, মহারানি ভিক্টোরিয়া উপহার দিয়েছিলেন সুলতানকে। প্রাসাদের বাইরে চতুর্দিকে বারান্দা আর তার সামনেই সি অফ মারমারা। জায়গাটি এতটাই সুন্দর যে মনে হচ্ছিল, ওখানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকি!

তোপকাপি প্রাসাদ থেকে সি অফ মারমারা
পরের দিন ঠিক করলাম, বসফরাসের উপর একটি মিনি ক্রুজ নেব। দু'ধারে ছোট ছোট পাহাড়, তার উপর দুর্গ, নীচে সবুজ মাঠ— এ সব পেরিয়ে আস্তে আস্তে আমাদের জাহাজটা এগোতে লাগল। ভাবছিলাম এই পূর্ব রোম সাম্রাজ্য এক হাজার বছর ধরে রোমান ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রেখেছিল। কনস্তান্তিন থেকে অটোমান সুলতান হয়ে আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্কে এসে শেষ। ইস্তানবুলের পেরাপালাস হোটেলে বসেই আগাথা ক্রিস্টি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ লিখেছিলেন। সেই সময় ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস লন্ডন থেকে সারা ইউরোপ ঘুরে এখানে এসে শেষ হত। বসফরাসের উপরে এই হোটেলটিতে গ্রেটা গার্বো, হিচকক এমনকী কামাল আতাতুর্কও কত্ত সময় কাটিয়ে গিয়েছেন।

ক্রুজ শেষে হোটেলে ফিরে এলাম। পরের দিন সকাল ছ'টায় হোটেলেরই একটি মিনিবাস সরাসরি বিমানবন্দরে পৌঁছে দেবে আমাদের। ইস্তানবুল ছাড়ার সময় এল। ক'দিনে শহরটাকে এতটাই ভাল লেগে গিয়েছিল যে ছেড়ে যেতে সত্যি খারাপ লাগছিল। ভোরবেলা যখন স্যুটকেস নামাচ্ছি, হোটেলের ম্যানেজার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললেন, আমাদের জন্য কেক আর কফি বানানো আছে। না খেয়ে গেলে ওঁর নাকি খুব খারাপ লাগবে! সেই আন্তরিকতা মনে থাকবে চিরকাল।

এক কথায়: রোমান ও অটোমান সুলতানদের ইতিহাসে ভরপুর
পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনস্থল ইস্তানবুল এক চমত্কার শহর।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায়। বর্তমানে নিউ জার্সির বাসিন্দা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি সঙ্গীত ও ইতিহাস পাঠে অমোঘ ভালবাসা জড়িয়ে আছে। কৌতূহল এবং আনন্দের টানেই গত কুড়ি বছর ধরে সারা বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করে বেড়াচ্ছেন।

রোজের আনন্দবাজার এ বারের সংখ্যা সংবাদের হাওয়াবদল আপনার রান্নাঘর স্বাদবদল চিঠি পুরনো সংস্করণ