২৮ কার্তিক ১৪১৮ মঙ্গলবার ১৫ নভেম্বর ২০১১


    কোস্টা রিকায় কিছু দিন
নেক দিন ধরে জল্পনা চলছিল। অবশেষে এ বছরের এপ্রিল মাসে রওনা দিলাম মধ্য আমেরিকার এক ছোট্ট দেশ, কোস্টা রিকার উদ্দেশে। প্রথমে লস এঞ্জেলস বিমানবন্দর থেকে হিউস্টন, তার পর সেখান থেকে সোজা কোস্টা রিকার রাজধানী স্যান হোজে। সব মিলিয়ে ছ’ঘন্টার সফর।

সর্বসাকুল্যে যে দেশটার জনসংখ্যা মাত্র ৪৫-৪৬ লাখ সেই দেশে যে স্থানীয় খাবারের এমন অভূতপূর্ব সম্ভার পাব এমনটা আশা করিনি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সেখানকার মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি ভেজা অরণ্যরাজির মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু পৌঁছানোর পর যা দেখলাম এবং অবশ্যই যা খেলাম তার তুলনীয় সত্যিই কিছু নেই।
কাসাডো
খুবই সাধারণ অথচ অতি উপাদেয় শাকসব্জি, মাছ-মাংস দিয়ে তৈরি এখানকার খাবার। আমাদের বাঙালিদের যেমন রোজকার পাতে ভাত-মাছ না হলে মনটা উদাস হয়ে যায়, তেমনি কোস্টা রিকার মানুষদের কাসাডো না হলে পেটটা যেন ঠিক ভরে না! কাসাডো শব্দটির অর্থ ‘বিবাহিত’। সাদা ভাত, রাজমার মতো দেখতে ডাল, কলা ভাজা, বাঁধাকপি, গাজোর, টোম্যাটোর স্যালাড আর মাছ, মাংস কিম্বা সব্জির কোনও একটা পদের অনাবিল ‘বিবাহের’ পরিণাম স্বরূপ ‘কাসাডো’ নামের উৎপত্তি। এইকেই আবার মাছ-মাংস ছাড়া যদি সকালে পরিবেশন করা হয় তাহলে সেটা বেশ একটা স্বাস্থ্যকর প্রাতরাশ। অবশ্য এ ছাড়াও এখানকার রেস্তোরাঁগুলিতে মাখন টোস্ট, ডিম, ফল, কর্নফ্লেক্স এবং দুধ কন্টিনেন্টাল প্রাতরাশেরও ব্যবস্থাও থাকে পর্যটকদের জন্য। তবে যদি কেউ সত্যিই কোস্টা রিকার খাবারের আসল স্বাদ পেতে চায় তা হলে বড় রেস্তোরাঁর হাতছানি এড়িয়ে যেতে হবে টিকোদের সোডায়। কোস্টা রিকার স্থানীয় লোকেদের বলা হয় ‘টিকো’ আর এখানকার রাস্তার ধারের ছোট ছোট খাবার দোকানগুলোকে বলে ‘সোডা’। এই সব সোডায় পাওয়া যায় একেবারে বিসুদ্ধ স্থানীয় খাবার, যেখানে কোনও বাহ্যিক চাকচিক্য না থাকলেও, জিভে জল আনা স্বাদের রসদ থাকবেই। এবং দামের দিক দিয়ে অবশ্যই মানানসই।
আরোজ কন কামারোনেস ফিলে দে পেসকাডো আরোজ কন মারিসকোস
লস এঞ্জেলসে থাকার দরুণ টুকটাক স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে পারায় কোস্টা রিকায় গিয়ে ওখানকার কিছু কিছু খাবারের নাম দেখে অনুমান করতে পারছিলাম যে সেটা কী হতে পারে! যেমন ‘পেসকাডো’ মানে যে মাছ কিম্বা ‘আরোজ কন পোয়ো’ মানে যে ভাতের সঙ্গে মাংসের কোনও একটা পদ সেটা সহজেই বুঝতে পারছিলাম। এ ছাড়াও ‘আরোজ কন মারিসকোস’ আর ‘আরোজ কন কামারোনেস’-এর মতো অতি সুস্বাদু ব্যঞ্জন প্রায় প্রতি দিনই আমরা খাওয়ার সুযোগ পেতাম। ‘ফিলে দে পেসকাডো’ নামের পদটি হল গ্রিল করা কিম্বা ভাজা মাছের ফিলে, সঙ্গে স্যালাড। ‘আরোজ কন মারিসকোস’ হল চিংড়ি আর বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক ঝিনুকের সঙ্গে হলুদ ভাত। এই পদটি আমার স্বামীর তো বটেই, আমার নিজেরও খুবই প্রিয়। আর ‘আরোজ কন কামারোনেস’ হল চিংড়ি দিয়ে হলুদ ভাত, সঙ্গে স্যালাড।

ভাবছেন, মাছেরই তো দেখছি বেশি রমরমা! আজ্ঞে হ্যাঁ, ধরেছেন ঠিক। একটা বিশাল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের জন্যে কোস্টা রিকায় মাছের প্রচুর আধিক্য। দেশটার এক দিকে প্রশান্ত মহাসাগর আর অন্য দিকে ক্যারিবিয়ান সাগর এবং এ জন্যেই দেশটার নামের মানে হল ‘সম্পদশালী উপকূল’। এখানকার আবহাওয়াও পুরোপুরি উপকূলবর্তী জায়গার মতো। আর সামুদ্রিক মাছের স্বাদ অপূর্ব! তাই কাঁচা মাছও এখানে বেশ সুস্বাদু লাগে খেতে। অবশ্য পুরোপুরি কাঁচা বললে সত্যের অবমাননা হয়! লেবুর রসে সি ব্যাস, করভিনা কিম্বা এই জাতীয় কোনও একটা মাছ পেঁয়াজ, ধনেপাতা এবং অল্প লঙ্কা দিয়ে জারিয়ে ‘সেভিচে’ নামের এক অতি উপাদেয় পদ এখানকার প্রায় সব ক’টা রেস্তোরাঁতেই পরিবেশিত হয়। দেওয়া মাত্রই নিমেষে সেটাকে আমরা সাবাড়ও করে দিতাম! অবশ্য এই রকম ‘সেভিচে’ আমরা আগেও খেয়েছিলাম মেক্সিকোতে গিয়ে। এ বার কোস্টা রিকায় সেই হারানো স্বাদের স্মৃতি ফিরে পেলাম!

তবে এত সব মাছের বর্ণনা দিচ্ছি বলে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে মাংসের স্বাদ কিছু কম এ দেশটায়। গোমাংসের বেশ ভালই চল আছে এখানে এবং তার প্রমাণও পেয়েছি রাস্তার ধারে ধারে বেড়া দেওয়া মাঠে গরুদের চলাফেরা দেখে। তবে কিনা বাঙালি বলেই হয়তো মাছের এমন প্রাচুর্য দেখে সে দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলাম।

এ তো গেল খাবারের লিস্টি। এ বার আসি ফল এবং ফলের রসের কথায়। সমুদ্রের জোলো হাওয়ায় ফলের গাছগুলোর বাড়বাড়ন্ত এখানে। মে মাসের প্রথম দিকে গিয়ে দেখলাম রাস্তার এক জায়গায় প্রায় ডজনখানেক আম রাস্তায় গড়াগড়ি দিচ্ছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, কেউই সেগুলো কুড়িয়ে খাওয়ার জন্যে দৌড়াদৌড়ি করছে না, এমনকী বাচ্চারাও না! সেই অভাবটা অবশ্য আমার স্বামী বেশ ভাল ভাবেই মিটিয়ে দিয়েছিল ওই আম কুড়িয়ে, খোসা ছাড়িয়ে আরাম করে খেয়ে। তবে আম ‘চোর’দের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। মন্টেজুমা নামের এক ছোট্ট সমুদ্রতটবর্তী শান্ত গ্রামে দেখেছিলাম তাদের কীর্তিকলাপ। ‘কাপুচিন’ নামের এক দল চতুর বাঁদর অনায়াসে আমগাছের ডালপালা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কাঁচা আম মাটিতে ফেলছিল। তারপর এক ছুটে মাটি থেকে সেগুলো কুড়িয়ে এনে পাকা গিন্নির মতো বেশ করে ডালের ওপর ঠুকে ঠুকে ভেঙে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছিল। কাণ্ডকারখানা দেখে তো আমরা হেসেই অস্থির।
ফলের রসের জন্যে কোস্টা রিকার নামডাক দুনিয়াজোড়া। রিফ্রেস্কোস অথবা রকমারি ফলের সরবত এখানকার পানীয়ের তালিকার এক অবিছিন্ন অঙ্গ। মাছ মাংস যদিও বা আমরা এক আধ দিন বাদ দিয়েছি, ফলের রস কিন্তু এক দিনের জন্যেও বাদ পড়েনি আমাদের। আর কোন ফল ছেড়ে কোনটার কথা বলব! আম তো রয়েইছে, তার সঙ্গে আছে পেঁপে, পিন্যা মানে আনারস, মোরাস মানে ব্ল্যাকবেরি, কলা, তরমুজ, পেয়ারা, কমলালেবু, প্যাশান ফ্রুট, আভোকাডো। এবং তেঁতুল! একদম ঠিক পড়ছেন। ট্যামারিন্ড মানে তেঁতুল দিয়ে যে এমন মিষ্টি সরবতও হয় সেটা প্রথম জানলাম কোস্টা রিকায় গিয়ে। তবে পানীয়টি মোটের উপর অতি উৎকৃষ্ট এবং ভরা গ্রীষ্মের দুপুরবেলায় এক চুমুক দিলেই শরীরের সঙ্গে মনও বেশ ফুরফুরে রকমের ঠান্ডা হয়ে যায়। এমন ‘অবাক জলপান’-এর ভক্ত না হয়ে কি ফিরে আসা যায়!

এই রকম অনেক অভিনব পানীয় আর সুস্বাদু খাবারের আস্বাদ নিতে নিতে কোস্টা রিকার সক্রিয় আরেনাল আগ্নেয়গিরি, মেঘে ঢাকা মন্টেভারডে বনরাজি কিম্বা মন্টেজুমার নিভৃত সমুদ্রসৈকতে এগারোটা দিন যেন চোখের নিমেষে কেটে গেল।

ছবি: লেখক

এই লেখকের আরও রচনা




রোজের আনন্দবাজারএ বারের সংখ্যা • সংবাদের হাওয়াবদল • আপনার রান্নাঘর • খানা তল্লাশি • পুরনো সংস্করণ