বিষের শিশিতে রুহ্-আফজা, কার্ডের বদলে পাসপোর্ট
কটা থার্মোমিটার, একটা পাসপোর্ট, একটা নাটকের বই, একটা ম্যাচবক্স, একটা বিয়ের কার্ড। এই পাঁচটা জিনিসের মধ্যে কোনও মিল খুঁজে পাচ্ছেন কি?
না পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
তবে মিল রয়েছে।
এই সব কিছুই পাঠানো হয়েছে প্রতিটি সংবাদপত্রের দফতরে। সিনেমার প্রিমিয়ারের আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে। যেমন সিনেমার থিম। তার সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে জিনিস বেছে বেশ নজরকাড়া একটা প্যাকেটে পার্সেল করে পাঠানো হয়েছে। এক ঝলক দেখে প্রথমে বোঝাই দায় যে সেগুলো আসলে আমন্ত্রণপত্র!
অনীক দত্তর ‘আশ্চর্য প্রদীপ’য়ের প্রিমিয়ারে যাওয়ার ইনভিটেশন কার্ডটা ছিল একটা চেক আর একটা ডেবিট কার্ড। সেটা নাকি সিনেমা জিনির থেকে পাঠানো।
তাতে আবার জিনি-র সইও ছিল। ‘তাসের দেশ’য়ের ক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল বোর্ডিং পাস আর পাসপোর্ট। তাতে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছিল যে দেশ-য়ে ঢোকার জন্য এই পাসটা প্রয়োজন। ‘অলীক সুখ’য়ের ক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল একটা মেডিক্যাল বক্স। ছবিটি ডাক্তারদের নিয়ে। তাই বক্সে রাখা ছিল থার্মোমিটার আর কিছু ব্যান্ড-এড। সঙ্গে একটা চিঠি। যেটা একটা বিশেষ নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে দেখালে কমপ্লিমেন্টারি ইসিজি, ইকো আর টিএমটি করার সুযোগও দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে ‘দ্য প্লে’ নামের এক সিনেমা। তার প্রিমিয়ারের আমন্ত্রণপত্রটা দেখতে একটা মোটা বইয়ের মতো।
এই সব অসাধারণ নেমন্তন্নের কার্ড ডিজাইন করার পিছনে কারণটা কী? ঋ অভিনয় করেছেন ‘তাসের দেশ’য়ে। বলছেন, “আমাদের একটা কোম্পানি আছে। নাম ‘ওভারডোজ’। সেখানে একটা টিম রয়েছে, যারা এই সব নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে। কিউ-য়ের বিজ্ঞাপনের ব্যাকগ্রাউন্ড। তাই সব সময় চেষ্টা থাকে কী করে প্রিমিয়ারের কার্ডগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। ফিল্ম-য়ের কনটেন্ট ভেবে আমরা ঠিক করি কী ভাবে নতুন একটা কিছু তৈরি করব।”
কিউ যে শুধু ‘তাসের দেশ’য়ের ক্ষেত্রেই এটা করেছিলেন, তা নয়। ‘বিষ’ সিনেমাটার প্রিমিয়ারের আগে প্রত্যেক অতিথিকে এক শিশি বিষ পাঠিয়েছিলেন তিনি! শিশির মধ্যে ভরে দিয়েছিলেন রুহ্আফজা আর তাই উস্কে দিয়েছিল কত রকমের কথাবার্তা!
কিন্তু এই সব ইনভিটেশন কার্ডগুলো তো সিনেমার পোস্টারের মতো জনসাধারণের কাছে পৌঁছনো যাচ্ছে না! তা হলে এই রকম একটা বিনিয়োগের কি সঠিক মূল্য পাওয়া যায়! “আমরা চেষ্টা করি কম বাজেটে কিছু মজার ব্যাপার করতে। সামথিং দ্যাট ইজ চিপ অ্যান্ড কোয়ার্কি। এ বার নববর্ষের আগে আমরা মিষ্টির হাঁড়িতে চানাচুর ভরে সবাইকে পাঠিয়েছিলাম,” বলছেন ঋ।
এই প্রথম রিংগো তাঁর সিনেমার জন্য একটা অন্য রকমের ইনভিটেশন কার্ড ডিজাইন করেছেন। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘সাদা কালো আবছা’র প্রিমিয়ারের আমন্ত্রণপত্রের বদলে তিনি তৈরি করিয়েছিলেন একটা ‘এভিডেন্স প্যাক’। “তাতে রেখেছিলাম একটা বিয়ের কার্ড, একটা সিম কার্ড, ফিঙ্গারপ্রিন্টের ইম্প্রেশন, একটা প্লাস্টিকের ট্যাগ যা দিয়ে হাত বেঁধে রাখা যায়। আমার ছবিটা ছিল একটা থ্রিলার। এ সবগুলোই ছিল গল্পের ক্লু। বাংলা সিনেমা যে মাত্রায় গিয়েছে, সেখানে বিষয়বস্তু আর প্রোমোশন খুব জোরালো হওয়া দরকার। শহরভিত্তিক সিনেমাতে সৃষ্টিশীল ভাবনা দিয়ে দর্শককে টানাটা খুব দরকার। তাই এই উদ্যোগ,” বলছেন রিংগো। আরও জানাচ্ছেন যে, “এই রকম কিছু করতে গেলে প্রযোজকের বিচক্ষণতা থাকাটা খুবই দরকার। ছোট প্রযোজক যাঁরা নিজেদের জায়গা করতে চাইছেন, তাঁরা বুঝতে পারছেন যে চোখে পড়ার জন্য এটা করা দরকার। বড় প্রযোজকদের সিনেমায় তো পাবলিসিটির অভাব থাকে না। ছোট বাজেটের ছবিতে সেটা দরকার, যাতে কম টাকা খরচ করেও নজর কাড়া যায়। পাল্লা ভারী করতে অর্থ কম থাকলে ক্রিয়েটিভিটির দ্বারস্থ হতে হয়। আর সেটাই এখন টলিউডে হচ্ছে। এখনকার দিনে সিনেমার পিআর যাঁরা করেন, তাঁরাও এ বিষয়ে বেশ সচেতন।”
প্রথম যখন টিম ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ এই নতুন ধরনের ইনভিটেশন কার্ড তৈরির কথা ভাবে, পরিচালক অনীক দত্তর খানিকটা কুণ্ঠা ছিল। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’য়ে তো এ সব কিছুই করা হয়নি। “সেটা না হওয়াটা আমার কাছে ব্লেসিং ইন ডিজগাইজ। আমি গিমিক পছন্দ করি না। তাই এমন কিছু করতে চাইনি যেটা বোকা-বোকা দেখায়। অনেকে মিলে ঠিক করা হয় যে একটা ডেবিট কার্ড তৈরি করা হবে। তবে এটাও বলে রাখি যে আমার আগেও এই সব করা হয়েছে। ‘প্রলয়’য়ের সময় তো একটা খবরের কাগজ পাঠানো হয়েছিল। ‘তাসের দেশ’য়ের পাসপোর্টের আইডিয়াটাও আমার বেশ ভাল লেগেছিল,” বলছেন অনীক।
পরিচালক রাজ চক্রবর্তী তো ‘তাসের দেশ’য়ের পাসপোর্টটা নিজের বাড়িতে সাজিয়ে রেখেছেন। বাঁধিয়ে রেখেছেন ‘প্রলয়’-এর সেই খবরের কাগজ। “আমি আরও অনেকের কথা জানি, যারা এই কাগজটা বাঁধিয়ে রেখেছে। ‘প্রলয়’ অরিজিনাল সিনেমা ছিল। তার পর ছবিটা ছিল নিউজ ওরিয়েন্টেড। খবর পড়েই আইডিয়াটা মাথায় আসে। তাই প্যাকেজিংটা এই রকম ভেবেছিলাম। মনে পড়ছে ‘হেমলক সোসাইটি’র প্রিমিয়ার কার্ডে একটা দেশলাইয়ের বাক্স পাঠানো হয়েছিল,” বলছেন রাজ। তবে এই সব করে কি সিনেমার বক্স অফিসে কোনও প্রভাব ফেলা যায়?
অনীকের মতে বক্স অফিসে প্রভাব ফেলার জন্য তো এই ধরনের কাজ করা হয় না। কারণ প্রিমিয়ার ইনভিটেশন কার্ড আর ফিল্মের পোস্টারের মধ্যে তো একটা ফারাক রয়েছে। তবে রাজ মানতে নারাজ যে এগুলো শুধু মাত্র গিমিক। “কিছু না হলেও তো ২০০-৩০০ লোকের কাছে এটা পৌঁছবে। তাঁরা আবার অন্য দর্শকদের বলবেন। তাঁদের কথাকে আমি দাম দিই। ভবিষ্যতেও আমি এই ধরনের কিছু করার কথা ভাবতে রাজি আছি। তবে বাণিজ্যিক বাংলা ছবিতে এখনও এই ট্রেন্ডটা দেখিনি। কারণ সেখানে প্রিমিয়ার হয় না। ক্লোজড্ ডোর শো হয়, যাতে কেবল মাত্র ইন্ডাস্ট্রির কলাকুশলীরাই থাকেন। সেখানে এই চলটা এখনও আসেনি,” বলছেন রাজ।
প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতা বলছেন যে, এই সব ইউনিক আমন্ত্রণপত্রের ব্যবহারিক উপযোগিতা শুধু মাত্র ইন্ডাস্ট্রির ভিতরে রয়েছে। “বছরে আমরা হয়তো ৪-৫ টা ছবিতে এগুলো করি। যে সিনেমাগুলো একটু আলাদা রকমের হয়। ‘প্রলয়’-এর ক্ষেত্রে করেছিলাম। ‘হেমলক’-এর ক্ষেত্রেও। ‘মিশর রহস্য’র ফ্লেক্স-য়ে কিছু কাজ ছিল। তবে কার্ডে কোনও কিছু আমরা আলাদা করে করিনি,” বলছেন শ্রীকান্ত। সামনেই মুক্তি পাচ্ছে শ্রীকান্ত মোহতা প্রযোজিত ‘চাঁদের পাহাড়’। তার পর ‘অপুর পাঁচালি’। সেখানে নতুন কী করবেন, সেই ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।
এখন অপেক্ষা শুধু মাত্র আমন্ত্রণপত্রের।

ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.