কাজ শেষ ২০১৪’তে
বে সার্কিট বেঞ্চ চালু হবে তা নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলেই রয়েছে জলপাইগুড়ি। বৃহস্পতিবার শিলিগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাসে একপক্ষ যখন আশায় বুক ফের বাঁধছেন, তখন অন্যপক্ষ নানা প্রশ্নে সংশয়ে পড়েছেন। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী শীঘ্রই সার্কিট বেঞ্চের কাজ চালু করানোর বার্তা দিয়েছেন। তাতে অনেকেই খুশি। যেমন সার্কিট বেঞ্চ দাবি আদায় সমন্বয় কমিটির সম্পাদক আইনজীবী কমলকৃষ্ণ বন্দোপাধ্যায় বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর যখন ঘোষণা করেছেন। তখন আমরা আশাবাদী। বিশদে খোঁজ নিচ্ছি।”
তবে কবে, কী ভাবে তা চালু হবে তা নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। প্রসঙ্গত, গত সেপ্টেম্বর মাসে সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবন নির্মাণের শিলান্যাস করে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ২ বছরের মধ্যে নির্মাণের কাজ শেষ হয়ে যাবে। তার পরে প্রায় ৫ মাস হতে চললেও, স্থায়ী ভবনের নির্মাণ কাজই শুরু হয় নি। পূর্ত দফতর সূত্রের খবর, সম্প্রতি ভবন নির্মাণের বরাদ্দের আর্থিক অনুমোদন পাওয়া গিয়েছে, আগামী সপ্তাহেই ভবন নির্মাণ কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া সম্ভব হবে। রাজ্য সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা।
যদিও পূর্ত দফতরের বাস্তুকাররাই মনে করছেন, জানুয়ারিতে কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হলেও আগামী ফেব্রুয়ারির আগে কিছুতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা কাজ শুরু করতে পারবে না। কাজ শুরুর পরে প্রায় ৪০ একর জমিতে ভিত প্রস্তুত করতেই কেটে যাবে প্রায় বছর খানেক। বাকি ৬ মাসের মধ্যে ইট গেঁথে ভবন তৈরির কাজ শেষ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই হাইকোর্টের বিচারপতিরা জানিয়ে দিয়েছিলেন, অস্থায়ী ভবনে নয়, তারা স্থায়ী ভবনেই হাইকোর্টের বেঞ্চ শুরু করতে আগ্রহী।
সার্কিট বেঞ্চের জন্য অধিগৃহীত জমিতে কাজ চলছে। ছবি: সন্দীপ পাল।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার সূত্র ধরেই হাইকোর্টের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, “রাজ্য সরকার বলেছে ২ বছরের মধ্যেই স্থায়ী ভবন তৈরি হয়ে যাবে। তার পরেই স্থায়ী ভাবে বেঞ্চ চালু হবে জলপাইগুড়িতে।” সে কারণে অনেকেরই উদ্বেগ বেড়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে ঘোষণা করলেও টেন্ডার নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। রাজ্য সরকারের থেকে দেশের প্রথম সারির কয়েকটি নির্মাণ সংস্থাকে দিয়ে স্থায়ী ভবনের কাজ করানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বরাদ্দ কম থাকায় সেই সংস্থাগুলি এগিয়ে আসেনি বলে জানা গিয়েছে। দু দফায় টেন্ডার করার পরে একটি সংস্থা বরাত পায়। টেন্ডার হওয়ার পরে রাজ্য সরকারের অর্থ দফতরের ছাড়পত্র পেতে মাস তিনেক কেটে যায়। জানা গিয়েছে, আগামী সপ্তাহে সংস্থাকে কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হবে।
অন্যদিকে রাজ্য সরকারের বেধে দেওয়া সময়ে শেষ হয়নি জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের অস্থায়ী বেঞ্চের সীমানা পাঁচিলের কাজও। যদিও পূর্ত দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, পাঁচিল তৈরির সঙ্গে স্থায়ী ভবন নির্মাণের সম্পর্ক নেই। গত বছরের জানুয়ারি মাসে ৩১ ডি জাতীয় সড়কের ধারে পাহাড়পুরে সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবনের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ৪০ একর জমি ঘিরতে পাঁচিল তৈরির কাজ শুরু হয়। কাজের দায়িত্ব পায় সরকারি সংস্থা ম্যাকিন্টস বার্ন। নভেম্বর মাসের মধ্যে পাঁচিল তৈরির কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও বরাত পাওয়া সংস্থার তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কাজ শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগবে। নির্মাণ কাজে বালি, পাথর, সিমেন্ট সরবারহ করার বরাত পাওয়া নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে সংস্থার বিবাদের কারণেই মাঝে মধ্যে কাজ বন্থ থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। কংগ্রেসের আইনজীবী সংগঠনের জেলা উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য নির্মল ঘোষ দস্তিদার বলেন, “সার্কিট বেঞ্চ নিয়ে গত তিন দশকে জলপাইগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গবাসী এত আশ্বাস পেয়েছে যে উদ্বোধনের দিন না আসা পর্যন্ত সংশয় থেকেই যায়।” সর্বভারতীয় তৃণমূল লিগাল সেলের সাধারণ সম্পাদক তথা বার কাউন্সিল সদস্য গৌতম দাস জানান, রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী নিজে এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি নিয়মিত হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে যোগাযোগ করে চলেছেন। সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন দেওয়ার পরে সার্কিট বেঞ্চ শুরু শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
সার্কিট বেঞ্চ নিয়ে আশা আশঙ্কা জলপাইগুড়িতে
সাকির্ট বেঞ্চ কী
বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে রাজ্যের রাজধানী ছাড়া অন্যত্র উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্টের আরও একটি খণ্ডপীঠ। কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ রয়েছে আন্দামান নিকোবরে।
জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চ: গোড়ার কথা
১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ আইনজীবী আসোসিয়েশন -এর সভায় জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চে তৈরির প্রস্তাব।
১৯৭৫-এ সরকার জলপাইগুড়িতে বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে।
১৯৯৮ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিদের প্রতিনিধি দলের মত অনুযায়ী জলপাইগুড়িতেই বেঞ্চ গঠনের সিদ্ধান্ত।
২০০১ কেন্দ্র রাজ্যকে জানাল জলপাইগুড়িতে সার্কিট হবেঞ্চ হবে, সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের।
২০০৪ সার্কিট বেঞ্চের অস্থায়ী ভবনের জন্য জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ভাড়া নিল সরকার।
২০০৬ জুনে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন।
২০০৭ সালের অক্টোবরে সার্কিট বেঞ্চের স্থায়ী ভবন তৈরির জন্য জাতীয় সড়ক সংলগ্ন এলাকায় ৪০ একর জমি অধিগ্রহণ।
২০১১ সার্কিট বেঞ্চের জন্য অধিগৃহিত জমিতে পাঁচিল দেওয়ার কাজ শুরু। প্রায় ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাজ্য সরকারের। সেপ্টেম্বরে ওই কাজের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জয়নারায়ণ পটেল।
জলপাইগুড়িতে শুরু আন্দোলন
১৯৯৩ সালে রাজ্য সরকার জলপাইগুড়ির পরিবর্তে শিলিগুড়িতে বেঞ্চে তৈরির প্রস্তাব দিতেও আন্দোলনের সূত্রপাত। আইনজীবী থেকে শুরু করে শহরের সবরকম সংগঠন, সংস্থা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে তৈরি হয় সার্কিট বেঞ্চ দাবি আদায় সমন্বয় কমিটি। টানা বনধ, অবরোধ, অনশন, রেল রোকো। চলতে থাকে আইনজীবীদের টানা কর্মবিরতি। পরে অবস্থা শান্ত হয়। দ্রুত বেঞ্চ চালুর দাবিতে এখনও সরব সার্কিট বেঞ্চ দাবি আদায় সমন্বয় কমিটির।
জলপাইগুড়িতে আন্দোলন কেন?
শতাব্দী প্রাচীন বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ হলে পরিকাঠামো ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন হবে। বঞ্চিত তকমা মুছে জলপাইগুড়ি শহর ঘুরে দাড়াতে পারবে বলে দাবি নাগরিক কমিটির।
কী কী পরিকাঠামো তৈরি জলপাইগুড়িতে
জেলা পরিষদ ডাক বাংলো সংস্কার করে বেঞ্চের অস্থায়ী ভবন তৈরি হয়েছে।
তিস্তাভবনে বিচারপতির অস্থায়ী আবাসন।
সার্কিট হাউস সম্প্রসারণ করেও তৈরি বিচারপতিদের আরও দুটি আবাসন।
পাহাড়পুর সংলগ্ন সরকারি আবাসনে বেঞ্চের ১২০ জন কর্মী ও তাদের পরিবারের থাকার ব্যবস্থা।
স্থায়ী বাড়ির জন্য অধিগৃহীত জমিতে পাঁচিল তৈরি শুরু।
বেঞ্চ শুরু হতে কী প্রক্রিয়া প্রয়োজন
কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সম্মতি।
রাজ্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রধানমন্ত্রীর দফতর সার্কিট বেঞ্চের ফাইল রাষ্ট্রপতিকে পাঠাবেন। রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞপ্তি জারি করলেই বেঞ্চ চালু হবে।
বেঞ্চ হলে কোন কোন সুবিধা মিলবে
অন্যায়ের বিচারের জন্য হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে গেলে কলকাতায় ছুটতে হবে না উত্তরবঙ্গের ৬ জেলার বাসিন্দাদের। জলপাইগুড়ি বেঞ্চেই বিচার পাওয়া যাবে।
সার্কিট বেঞ্চের কারণে শহরে বাড়তি কী পরিকাঠামো হবে
অস্থায়ী ভবন লাগোয়া তিন নম্বর ঘুমটি সম্প্রসারণ।
টাউন স্টেশন সংস্কার। বিচারপতিদের যাতায়াতে স্টেশন রোড চওড়া করে ডিভাইডার। আলোর ব্যবস্থা।
পাহাড়পুরে রাস্তা সংস্কার, গোটা রাস্তায় পথবাতি।
সার্কিট বেঞ্চের কারণে তিনটে বিলাসবহুল হোটেল।
পাহাড়পুরে জমির দাম ৩ গুণ বেড়ে গিয়েছে।
স্টেশন বাজারে বহুতল বাজার তৈরির পরিকল্পনা।
বেঞ্চের কাজ শুরু হলে বাড়তি প্রাপ্তি
বেঞ্চ শুরু হয়ে যাওয়ার পরে শহরের সব রাস্তা সম্প্রসারণ করে ডিভাইডার বসানো হবে। বাড়বে নিরাপত্তা। শহরে কাজে আসা মানুষের সংখ্যা কয়েক গুন বেড়ে যাওয়ায় নতুন হোটেল,দোকান, আবাসন, আধুনিক বাজার ভবন হবে।
খরচ এক নজরে
অস্থায়ী পরিকাঠামো তৈরিতে খরচ ২ কোটি। পাহাড়পুরে ৪০ একর জমি অধিগ্রহণে খরচ প্রায় ১ কোটি ১৪ লক্ষ। পাঁচিল তৈরিতে বরাদ্দ সাড়ে ৩ কোটি টাকা। স্থায়ী ভবনে বরাদ্দ ৬০ কোটি টাকা। সার্কিট বেঞ্চের অস্থায়ী ভবনের জন্য রাজ্য সরকারকে ২০০৪ সাল থেকে মাসে ৯১ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে ভাড়া বেড়ে হয়েছে মাসে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। স্থায়ী অস্থায়ী মিলিয়ে সার্কিট বেঞ্চে বরাদ্দ এবং খরচের অঙ্ক কম-বেশি ৬৮ কোটি টাকার কাছাকাছি।



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.