বাঘ, বুনো মোষের পরে গন্ডার। গত এক মাসের মধ্যে রক্ষকের গুলিতেই কাজিরাঙার তিন আবাসিক প্রাণ হারাল। সবকটি ক্ষেত্রেই আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছে বলে কাজিরাঙা কর্তৃপক্ষের দাবি। ১৬ জানুয়ারি চোরাশিকারিদের ধাওয়া করতে গিয়ে বনরক্ষীদের গুলিতে জখম একটি গন্ডারের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। কার্যত, জঙ্গলে বন্যপ্রাণী বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাতও বাড়ছে। এরমধ্যে গভীর অরণ্যে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া বা চোরাশিকারিদের ধাওয়া করা রক্ষীদের অবস্থা আরও বিপজ্জনক। তবে বনকর্মীদের ‘গাফিলতি’ নিয়ে বিরক্ত বনকর্তারা। তাঁরা বনরক্ষী ও হোমগার্ডদের জন্য বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করেছেন।
গত মাসে কোহরা রেঞ্জে একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার বন থেকে বেরিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়ে। বাঘ তাড়াতে আসে কয়েকজন বনরক্ষী। সংখ্যায় নগণ্য বনরক্ষীরা বাঘটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। উল্টে বাঘের তাড়া খেয়ে একে ৪৭ থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে দেয় পুলিশ। অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় বাঘটি। এরপর কাজিরাঙায় টহলদার বনরক্ষীদের আক্রমণ করে একটি বুনো মোষ। এক সহকর্মীকে মোষের হাত থেকে বাঁচাতে অন্যরা ৫ রাউন্ড গুলি চালান। মোষটি মারা যায়। বনরক্ষীকেও বাঁচানো যায়নি। এ বারের ঘটনাটি ঘটেছে, ১৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায়। ওই দিন চোরাশিকারিরা কাওয়াইমারি শিবিরের কাছে একটি গন্ডার মেরে তার খড়্গ কাটার আগেই বনরক্ষীরা অকুস্থলে হাজির হন। শিকারিদের ধাওয়া করে তারা। এই সময় একটি গন্ডারের আক্রমণের সামনে পরে বনরক্ষীরা। তাকে ভয় দেখাতেই রাইফেল থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে রক্ষীরা পালিয়ে আসেন। তবে একটি গুলি গন্ডারটিকে আঘাত করেছিল। ১৭ জানুয়ারি ফের চোরাশিকারিদের ঘাঁটি খুঁজতে জঙ্গলে ঢোকে বনরক্ষী ও হোমগার্ডদের একটি দল। তল্লাশির সময় মৃত গন্ডারটির দেহ মেলে। আজ তার ময়নাতদন্ত হয়।
কাজিরাঙার ডিএফও দিব্যধর গগৈ বলেন, “ঘটনাটি দুঃখজনক। কিন্তু এমন কিছু সময় আসে যখন প্রাণ বাঁচাতে গুলি চালাতেই হয়। সামান্য বেতনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর জঙ্গলে বন্যপ্রাণীদের পাহারায় থাকা রক্ষীদের প্রতি পদে বিপদ। এক দিকে উন্নতমানের রাইফেলধারী চোরাশিকারিরা। অন্যদিকে, জলে-স্থলে হাতি, মোষ, গন্ডার, বাঘ, সাপের সঙ্গে সহাবস্থান।” তাঁর বক্তব্য, এমনিতে শান্ত মনে হলেও, যে কোনও সময় গন্ডার, মোষ বা হাতি আক্রমণ করতে পারে। তাঁদের মেজাজ বোঝা ভার। সঙ্গে শাবক থাকলে তারা আরও বিপজ্জনক। গত এক বছরে, দু’জন রক্ষী মোষের হানায়, দু’জন রক্ষী হাতির পায়ের তলায় ও দু’জন রক্ষী গন্ডারের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন।
রবিবার সন্ধ্যার ঘটনাটি নিয়ে বন বিভাগ বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। সেই সঙ্গে বনকর্মী, রক্ষী ও হোম গার্ডদের নিয়ে একটি কর্মশালারও আয়োজন করা হয়। কখন কোন পরিস্থিতিতে মোষ, হাতি, গন্ডার ক্ষেপে উঠতে পারে, উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ও দ্রুতগতিতে কী ভাবে তার মোকাবিলা করা যায়, প্রতিবর্ত ক্রিয়ার উপরে নিয়ন্ত্রণ-সহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কর্মশালায় রক্ষী ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে এত হালকাভাবে দেখতে রাজি নয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বেচ্ছাসেবী কর্তার বক্তব্য, এ ভাবে তো চলতে পারে না। বনরক্ষীদের এর থেকে অনেক বেশি সতর্ক থাকা উচিত ছিল। কারণ, তাদের হাতেই ওই বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীদের জীবনরক্ষার ভার। এই কর্তার দাবি, এই ক্ষেত্রে অভিযুক্ত বনরক্ষীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা উচিত। বন দফতর কঠোর হলে বনরক্ষীরাও সতর্ক হতে বাধ্য হবে। |