সুকুমার রায় একটি গল্পে ‘অসিলক্ষণ পণ্ডিত’ নামে একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র আঁকিয়াছিলেন, যিনি তরোয়াল শুঁকিয়া বলিতেন তাহা সুতীক্ষ্ণ কি না। এ রাজ্যের বিধানসভা ক্রমশ সেই ভূমিকা লইতেছে। বিধায়কের জন্য কোন পদটি সমীচীন, কোনটি নহে, আইন করিয়া তাহা নিরূপণ করা শুঁকিয়া তরোয়ালের ধার পরীক্ষা করার সমান। সিদ্ধান্ত যাহাই হউক, তাহা মূল্যহীন। কারণ গলদ রহিয়াছে মূলে। বিধায়করা জনপ্রতিনিধি, তাঁহারা জনস্বার্থ রক্ষা করিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। অতঃপর তাঁহারা যদি রাজনৈতিক প্রভাব অসৎ উদ্দেশে ব্যবহার করেন, তবে তাঁহাদের বিচার আদালতে আইনমাফিক হইতে পারে, রাজনৈতিক দলের অনুশাসনের দ্বারা হইতে পারে, অথবা সরাসরি নির্বাচনী প্রতিযোগিতাতেও হইতে পারে। কিন্তু বিধানসভা কয়েকটি পদকে বিধায়কদের যোগ্য বলিয়া ছাপ মারিয়া দিবে, ইহা নিতান্ত অসঙ্গত এবং হাস্যকর। যে কমিটি বা সংস্থাগুলিতে বিধায়কদের সদস্যপদ অনুমোদন পাইয়াছে, কিংবা পাইবে, সে সকল পদে কি তাঁহারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য, কিংবা ‘দলতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করিতে পারেন? সেখানেও তাঁহারা জনস্বার্থেই কাজ করিবেন, সেই প্রত্যাশা থাকিবে। অপর দিকে, যে সকল পদ নিষিদ্ধ, সেখানে যে তাঁহারা বকলমে নিজের কিংবা দলের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করিতেছেন না, তাহারও কোনও নিশ্চয়তা নাই। সেখানেও তাঁহারা অন্যায় প্রভাব বিস্তার করিতেছেন কি না, নজর রাখিতে হইবে। এমনকী যাঁহারা দলনেতা কিন্তু বিধায়ক নহেন, তাঁহাদের প্রতিও একই কারণে নজরদারি প্রয়োজন। ‘সিন্ডিকেট’-এ দলীয় প্রভাব যাঁহারা খাটাইতেছেন, তাঁহারা আইনের অপেক্ষায় বসিয়া নাই। লাভজনক পদ বিষয়ে বিচার মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে চলিতে পারে। তাঁহারা যে হেতু সরাসরি প্রশাসনের সহিত যুক্ত, তাই অন্যত্র নিযুক্ত থাকিলে পরস্পরবিরোধী দায়বদ্ধতার সংকট দেখা দিতে পারে। কিন্তু বিধায়কদের কাজ আইন-প্রণয়ন, তাঁহারা সরকারের অংশ নহেন। তাঁহাদের নিয়োগক্ষেত্র সংকুচিত-প্রসারিত করিয়া সরকার কী রূপে রাজনৈতিক সততা প্রমাণ করিতে পারে? দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করিবার উপায় ইহা নহে।
আইনের উদ্দেশ্য কী, তাহা লইয়া সম্ভবত আরও এক বার চিন্তার প্রয়োজন হইয়াছে। ন্যূনতম মজুরি হইতে পরিবেশ সুরক্ষা, সরকারের নিকট মানুষের যাহা কিছু প্রত্যাশা, তাহা মিটাইতে চটজলদি একটি আইন পাশ করিবার ঝোঁক এ দেশে বহু দিন হইতে চলিতেছে। সম্প্রতি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের দাবিও একটি নূতন আইনের দাবিতে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। শিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠাইতে, তাহার মুখে খাদ্য জোগাইতেও নূতন নূতন আইন প্রণয়ন করা হইতেছে। ভাবিয়া দেখিতে হইবে, আইন ছিল না বলিয়াই কি এই কাজগুলি ঘটিতে পারে নাই? সংবিধান যাহা বলিয়াছে, যে সকল আইন রহিয়াছে, বিভিন্ন আদালত নানা সময়ে যে সকল নির্দেশ দিয়াছে, তাহার ভিত্তিতেই কি সামাজিক ন্যায় এবং প্রশাসনিক তৎপরতা নিশ্চিত করা যাইত না? আইনের অভাব যদি সততা-তৎপরতার অন্তরায় না হইয়া থাকে, তাহা হইলে আইন করিয়া কী করিয়া কার্যোদ্ধার হইবে? কাজ না করিয়া আইন তৈরি করিবার যে প্রথা চলিয়া আসিতেছে, তাহা এই বার বন্ধ হউক। আইন পরিবর্তন করিয়া দলতন্ত্র রুখিবার হাস্যকর চেষ্টা না করিয়া সরকার জনস্বার্থ-সম্পর্কিত যে কোনও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করিয়া তুলুক। |