প্রশ্ন লোকপাল নিয়েই
আইন করলেই কি আটকানো যাবে দুর্নীতি
ড়াই আপাতত এই প্রশ্নগুলো ঘিরেই। সরকারের লোকপাল বিল না অণ্ণা হজারের জনলোকপাল বিল? অণ্ণার দাবিমতো প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে কেন প্রধানমন্ত্রীকেও আনা হবে না লোকপালের তদন্তের আওতায়?
তবে রাজনীতির এই লড়াইয়ের মধ্যেই অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা তুলতে শুরু করেছেন আসল প্রশ্নটা। তা হল, লোকপাল বিল হোক বা জনলোকপাল বিল স্রেফ আর একটি আইন করলেই কি দেশে দুর্নীতি রোধ নিশ্চিত করা যাবে? প্রকাশ্যে না বলতে পারলেও শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে সাংসদদের একটা বড় অংশও স্বীকার করছেন, দুর্নীতি রোধে যে সব আইন ইতিমধ্যেই আছে, সেগুলো ঠিকঠাক রূপায়ণ করতে পারলে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব। লোকপালের মতো কোনও বিলেরই দরকার নেই।
রাজনীতির বাইরে থাকা ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য অবশ্য অনেকটাই চাঁছাছোলা। যেমন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি জে এস বর্মা। তাঁর মতে, লোকপাল একেবারে ‘সুপার-বডি’ হবে এবং সব সমস্যার সমাধান করে দেবে, এমন না ভাবাই ভাল। লোকপালের ধারণা মহৎ হতে পারে, কিন্তু তা সর্বরোগহরবটিকা নয়। প্রায় একই সুর নন্দন নিলেকানির। দেশ জুড়ে অভিন্ন পরিচয় পত্র চালু করার দায়িত্ব এখন যাঁর কাঁধে। ইনফোসিসের এই প্রাক্তন কো-চেয়ারম্যানের বক্তব্য, এই মুহূর্তে দেশে দু’ধরনের দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে। একটি বড় মাপের দুর্নীতি। আর একটি নিত্য দিনের ‘খুচরো’ দুর্নীতি। জনপরিষেবাকে যত আরও স্বচ্ছ ও সহজ করা যাবে, লাল ফিতের ফাঁস যত কাটানো যাবে, ততই এই দ্বিতীয় ধরনের দুর্নীতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে বলে তাঁর মত।
কংগ্রেসের এক শীর্ষ নেতা আবার ঘরোয়া ভাবে বলছেন, এই মুহূর্তে দেশে যা আইন রয়েছে, সেগুলো ঠিকমতো রূপায়িত হলেই দুর্নীতি অনেকটা রোধ করা সম্ভব। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদটিও সরকার সমর্থন করেছে। বিদেশে নিযুক্ত ভারতীয় আমলারা ঘুষ নিলে তাঁদের শাস্তি দিতেও বিল পেশ হয়েছে। অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ আইন নামে একটি কঠোর আইন হয়েছে, যার মাধ্যমে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কথাও বলা হয়েছে। উচ্চ পদস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই তা তদন্ত করতে সিবিআইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কালো টাকা রুখতেও একগুচ্ছ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চের মাধ্যমে কালো টাকা পাচার রুখতে আরও চাপ বাড়ানো হচ্ছে। সংসদে সদ্য বেনামি বিলও পেশ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বেনামি সম্পত্তি ধরা পড়লেই ক্ষতিপূরণ না দিয়ে সেটি বাজেয়াপ্ত করা হবে। ছ’মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাবাসও হতে পারে। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশেই লোকপালের মতো ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এখনও ডেনমার্ক বা স্পেনের মতো হাতে গোনা কিছু দেশ ছাড়া আর কোথাও এই ব্যবস্থা নেই।
এখানেই শেষ নয়, কংগ্রেসের এই নেতার পাল্টা প্রশ্ন, নতুন লোকপাল গঠন হলে নতুন দুর্নীতির মুখ যে খুলে যাবে না, তার কী নিশ্চয়তা রয়েছে? তাঁর বক্তব্য, এখন পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছোটখাটো সরকারি কাজ আদায় করতে অফিসারদের ঘুষ দিতে হয়। লোকপালের অফিসাররা যে নতুন করে আম-আদমির উপর বোঝা বাড়াবেন না, সে কথা কে বলতে পারে? ফলে গোটা ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন। একমত বিজেপির এক শীর্ষ নেতাও। তাঁর কথায়, “শুধু আইন করেই যদি দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হত, তা হলে তা অনেক আগেই হয়ে যেত। নতুন একটি আইন এনেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এই ধারণা বিভ্রান্তিকর।” তাঁর বক্তব্য, দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসনের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। যা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর যদি রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থাকত, তা হলে জোটধর্মের দোহাই দিয়ে দুর্নীতিকে আড়াল করতে হত না।
অণ্ণা-শিবির অবশ্য প্রশ্ন তুলছেন, দুর্নীতি রোধে যে সব সংস্থা বা ব্যবস্থার উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো আদতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। কাজেই সেই ব্যবস্থায় দুর্নীতি দমন করা যাবে না।
টিম-অণ্ণার অন্যতম সদস্য অরবিন্দ কেজরিওয়ালের অভিযোগ, দুর্নীতির তদন্ত করার জন্য সিবিআই আছে ঠিকই, কিন্তু তা স্বাধীন নয়। সিবিআই সরকারের ইশারায় চলে। আবার প্রশাসনে দুর্নীতি রোধে সিভিসি (সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশন)-র মতো সংস্থাকে স্বশাসন দেওয়া হলেও কার্যত কোনও ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সে কারণেই জনলোকপালের প্রস্তাব মতো একটি কঠোর লোকপাল বিল দরকার। যেখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা থাকবে লোকপালের ও ফৌজদারি ক্ষমতাও থাকবে।
কিন্তু অনেক সাংসদই পাল্টা প্রশ্ন করছেন, সম্পূর্ণ ভাবে সরকারের প্রভাবমুক্ত, এমন লোকপাল কী ভাবে গঠন করা যাবে? আর তথাকথিত সরকারের প্রভাবমুক্ত হলেই কি দুর্নীতিও এড়ানো যাবে?
সেই নিশ্চয়তাই বা কোথায়? তাঁরা বলছেন, লোকপাল কার প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে? রাষ্ট্রপতির কাছে? কিন্তু ভারতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন দেশের সাংসদ ও বিধায়কদের ভোটেই। আর কাজ করেন মন্ত্রিসভার পরামর্শে। আবার রাষ্ট্রপতি যাকে নিয়োগ করেন, সেই স্বশাসিত সিভিসির পদকেও কিন্তু দুর্নীতি-বিতর্কমুক্ত রাখা যায়নি।
এই প্রসঙ্গে প্রাক্তন সিভিসি পি জে টমাসকে নিয়ে বিতর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। ফলে কেউ প্রকাশ্যে, কেউ জনান্তিকে স্বীকার করেই নিচ্ছেন, অণ্ণার জনলোকপালই হোক বা সরকারের লোকপাল, সার্বিক সদিচ্ছা না থাকলে আখেরে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে পারবে না কোনওটাই।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.