বিদায় বিশ্বকাপ রানার্সদের
দেশের হয়ে জীবনের ম্যাচ রোনাল্ডোর

নেদারল্যান্ডস-১ (ফান ডার ফার্ট)
পর্তুগাল-২ (রোনাল্ডো-২)
উরোপিয়ান ফুটবলের রাজকাহিনিতে ‘প্রিন্স অব ইউরোপ’ বেঁচে রইলেন। মাথা উঁচু করেই।
তাঁর সামনে ‘মেসি, মেসি’ বলে চেঁচালেই এখন রেগে কাঁই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। অবিকল বাচ্চাদের মতো। প্রতিপক্ষের সমর্থকরা এক ভাল অস্ত্র পেয়েছেন তাঁকে চটিয়ে দেওয়ার। ড্যনিশরা চেঁচিয়েছিল আগের দিন। রবিবার উপচে পড়া গ্যালারির ডাচ সমর্থকরাও চেঁচাল। তা ধুলোয় উড়িয়ে দিল রোনাল্ডোর দুটো গোল।
এই ইউরোতে এসেও চলছে রোনাল্ডো বনাম মেসি তর্ক। ফুটবলের নিরিখে গতি, হেডিং, ফ্রিকিক এবং শরীর ব্যবহারে এগিয়ে রোনাল্ডো। মেসি আবার এগিয়ে স্কিল, ড্রিবলিং, বল কন্ট্রোল, পায়ের কাজে। ইদানীং মেসি রোনাল্ডোকে অনেকটা পিছনে ফেলে যাচ্ছেন টিমগেমের বিচারে, জাতীয় দলের জার্সিতে। বিশ্বকাপ রানার্সদের ছিটকে দেওয়ার জোড়া গোল রোনাল্ডোকে কিছুটা হারানো জমি ফেরত দেবে। আপাতত তাঁকে দেখে আর কেউ চেঁচাবে না ‘মেসি, মেসি’ বলে। ‘সি আর সেভেন’ যে বেঁচে উঠলেন জাতীয় দলের মেরুন সবুজ জার্সিতে।
ফুটবলের সি আর সেভেন কী জিনিস? তাঁর ফ্রিকিকের গতি সেকেন্ডে ৩২ মিটার, সেখানে ফরমুলা ওয়ান কারের গতি সেকেন্ডে ৪.৬ মিটার। এক জন অলিম্পিক স্প্রিন্টার মরসুমে যতবার স্প্রিন্ট টানেন, রোনাল্ডোকে স্প্রিন্ট টানতে হয় তাঁর ৯০০ গুণ।
রোনাল্ডো: জোড়া গোলের হুঙ্কার
সি আর সেভেন মানে কী? খারাপ দিকও রয়েছে। অবিশ্বাস্য ইগো এবং স্বার্থপরতাও।
এ দিন ইউরোয় ইগো ও স্বার্থপতা মুছে দলের হয়ে উঠলেন রোনাল্ডো। দলের প্রয়োজনে নামলেন ডিফেন্সিভ থার্ডে। ধ্বংসাত্মক কাজটা করেই আবার দ্রুত সৃষ্টিশীলতায়। পোস্তিগা, নানিকে গোলের পাস সাজিয়ে দিতে। দু’বার পোস্ট ফিরিয়ে না দিলে তাঁর নামের পাশেই চার গোল লেখা হত।
এই ম্যাচটার আগে রোনাল্ডো গত তিন বছরে পর্তুগালের হয়ে গোল করেছেন ১১টি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে গোল সেখানে ১১২। মাস খানেক আগের একটা পরিসংখ্যান আরও কৌতূক জাগানো। জাতীয় দলের জার্সিতে রোনাল্ডোর ম্যাচ পিছু গোল .৩৭৫, ক্লাব দলের হয়ে .৬৪২। সব আপাতত মুছে গেল, সব।
ক্লাবের হয়ে রোনাল্ডো-ঝড় জাতীয় দলে স্তিমিত হয়ে যায় কেন? একটা ব্যাখ্যা, ক্লাব দলের একতা জাতীয় দলে থাকে না। দ্বিতীয়ত, ক্লাবের হয়ে ওজিল, কাকা, বেঞ্জিমা, হিগুয়াইনদের পাওয়া যায়, জাতীয় দলে সতীর্থদের অত প্রতিভা নেই। ফান ডার ফার্টের ১-০র পরে পর্তুগিজরা যে ভাবে তিনটে গোল নষ্ট করল, অবিশ্বাস্য। পর্তুগালে বেঞ্জিমা বা ইগুয়াইন থাকলে আধঘণ্টায় খেলাটা শেষ হয়ে যেত। এখানে চাপ বাড়ল। রোনাল্ডো ও নানি মিলে খেলাটাকে টেনে আনলেন তাঁদের দিকে। ভাগ্য খারাপ, গোল বাড়ল না।
অঙ্কের বিচারে প্লাসে প্লাস সব সময় প্লাস। কিন্তু ফুটবল দেখিয়েছে, প্লাসে প্লাসে মাইনাসও সম্ভব। দুটো অসম্ভব আক্রমণাত্মক দল মুখোমুখি হলে বিশ্রী ফুটবল হয়। উদাহরণ এক, গত বিশ্বকাপ ফাইনাল। উদাহরণ দুই, জার্মানির বিশ্বকাপে ‘ব্যাটল অফ নুরেমবুর্গ’। এই দুটো দলের ম্যাচেই ১৬ হলুদ কার্ড, ৪ লাল কার্ড দেখান রেফারি। রবিবার কিন্তু দুটো দলের লড়াইয়ে মেঘে মেঘে গর্জনের শব্দ হল। প্লাসে প্লাসে প্লাসই হল। এ দিকের উইংয়ে রবেনের পায়ে বল পড়লে মনে হচ্ছিল বিদ্যুৎ চমকায়। ও দিকে রোনাল্ডোর বিখ্যাত ‘স্টেপ ওভার’ শুরু হলেই মেঘের গর্জন। ফান ডার বার্টের গোলে যদি পায়ের চেটোর সৃষ্টিশীলতা কাজ করে, তা হলে রোনাল্ডোর দুটো গোলের পিছনে থাকল গতি এবং বুদ্ধি।
এমনিতে দুটো দলের চোখ ধাঁধানো ফুটবলের পিছনেই অন্ধকার জমাট হয়ে বসে। ডাচদেরটা সবাই জানেন। ইউরোতেই রবেন জার্সি ছুঁড়ে ফেলেছেন কোচ বসিয়ে দেওয়ায়। নাইজেল ডি জংও তাই করেছেন। ফান ডার ফার্ট বা হান্টেলার কোচকে যা খুশি বলেছেন না খেলানোয়। পর্তুগিজদের টিমেও দুটো ক্যাম্প। কোচ পাওলো বেন্তোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আসেনইনি রিয়াল মাদ্রিদের কার্ভালহো ও চেলসির বোসিঙ্গা। রোনাল্ডোর জোড়া গোল তাঁর কোচকেও আপাতত বাঁচিয়ে গেল। বেন্তোর সঙ্গে পর্তুগালে খেলেছেন রোনাল্ডো। মাঠের বাইরে কার্ভালহোকে আক্রমণ করে, কোচের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এই ম্যাচটা জিতে বেন্তোকে অক্সিজেন দিলেন তাঁর কোচিং জীবনে। বিশ্বকাপ রানার্স কোচ আবার তা পাবেন না। চুক্তি ২০১৬ পর্যন্ত থাকলেও মার উইকের চাকরি যেতে পারে। রোনাল্ডোর জোড়া গোলেই।
রোনাল্ডোর জীবনের এই ম্যাচটার আর একটা বড় প্রশ্ন, দারুণ শুরু করেও ডাচরা হারিয়ে গেল কী ভাবে? ডাচ ফুটবলের শেষ কথা জোহান ক্রুয়েফ একটা শব্দ ব্যবহার করতেন বারবার। ‘লেফ’। সৃষ্টিশীলতা, সাহস এবং ঠান্ডা মাথা বোঝাতে। ডাচ ফুটবলে এখন এটারই অভাব। ডাচদের রক্ষণ এমনিতেই দুর্বল। কোচ মারউইক কেন জোড়া রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার নিয়ে নামতেন, বোঝা গেল। ডাচদের রক্ষণ এবং আক্রমণের দুটো ব্লকের মধ্যে এত ফাঁক ফোকর যে থই পেল না তাঁদের মাঝমাঠ। ০-১ পিছিয়ে পর্তুগিজরা এমন চাপ দিল, নাভিশ্বাস উঠল ডাচ রক্ষণের। মনে হচ্ছিল, তারা দশ জনে খেলছে। মিনিট কুড়ি পর থেকেই রবেন, ফান পার্সি এবং স্নাইডার, হান্টেলারকে খুঁজতে হচ্ছিল দূরবীন দিয়ে।
না, না, ওঁরা চার জন কেউই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নন। রোনাল্ডো একা, রোনাল্ডো অনন্য। রোনাল্ডো দেশকেও জেতাতে জানেন!




First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.