: শহরের নদী-ঘাট
চাঁদপাল
৭৭৩ সাল। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। এই শহরে স্থাপিত হল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘গভর্নর জেনারেল সুপ্রিম কাউন্সিল’ ও ‘সুপ্রিম কোর্ট’। পরের বছর অক্টোবর মাসের ১৯ তারিখ বেলা ১২টা নাগাদ একটি ‘সাহেবি তরী’ এসে থামল গঙ্গার প্রিন্সেপ ঘাট ছাড়িয়ে একটু দক্ষিণের এক ঘাটে।

মনে করা যাক ২৩৯ বছর আগের সেই দিনটি— একে একে নেমে আসছেন স্যর ফিলিপ ফ্রান্সিস, লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যর জন ক্লেভারিং ও কর্নেল মনসন এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যর এলিজা ইম্পে ও তিন সহকারী বিচারপতি জন হাইড, রবার্ট চেম্বার্স ও স্টিফেন সিজার লিমেস্টার। কলকাতার এই নদী ঘাট স্থান পেল ইতিহাসের পাতায়। এর পর থেকে ভারতে যত বড়লাট, সেনাপতি, বিশপ, বিচারপতিরা এসেছেন তাঁরা নেমেছেন এই ঘাটেই। আবার এখান থেকেই ফিরে গিয়েছেন জাহাজে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।
সেই ‘সাহেবি তরী’ আজ আর নেই। হাল টানা পাল তোলা নৌকাও আর আসে না এই ঘাটে। সাহেবি তরীর পাশাপাশি সার দিয়ে আসত মাল বোঝাই নৌকাও। মাঝিরা হুঁকো টানতে টানতে খানিক জিরিয়ে নিত গাছের ছায়ায়— সে বট হোক বা পাকুড়। খিদের মুখে ঘাটের দোকান থেকে খাবার কিনে খেত। এমনই এক মুদির দোকানের মালিক ছিল চন্দ্রনাথ পাল। সেই নাম লোকমুখে চাঁদপাল হয়ে যায়। কথিত, তার নামেই হয় ঘাটের নামকরণ।

এক সময়ে এই ঘাট ছিল শহরের প্রধানতম জাহাজঘাটা। ইংরেজ আমলে রেল পথ চালু হওয়ার আগে অবধি যত প্রশাসনিক প্রধান বা ‘রাজপুরুষ’ কলকাতায় আসা-যাওয়া করতেন, তাঁরা এই ঘাটেই জাহাজ ভেড়াতেন। হাওড়া রেল স্টেশন চালু হওয়ার পর এই জাহাজঘাটার গুরুত্ব কমে যায়। এখন জাহাজ না এলেও এই ঘাট থেকে নিয়মিত ফেরি সার্ভিস চলাচল করে। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে ১৭৭৪ সালের মানচিত্রে ‘চাঁদপাল ঘাট’-এর নামের উল্লেখ থাকলেও ১৭৫৬ সালে তা ছিল না।
১৮২০ সাল। রাজধানীতে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনার একটি ছিল শহরের জলকষ্ট। কয়েকটি পাড়ায় জল সরবরাহের জন্য এই ঘাটের পাশে একটি ছোট বাষ্পীয় পাম্প বসানো হয়। এই পাম্পের সাহায্যে গঙ্গার জল রাস্তার পুব দিকে তৈরি একটি চৌবাচ্চায় ভরা হত। পাকা নালা দিয়ে সেই জল স্থানীয় পাড়ায়, রাস্তা ধোয়া ও আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহৃত হত। জেসপ কোম্পানি এর জন্য মাসে ৪০০ টাকায় এই পাম্প চালাবার ঠিকা নিয়েছিল। চুক্তি অনুসারে ওই কোম্পানি দিনে ৭ ঘণ্টা করে, বছরে ৮ মাস পাম্প চালাত আর বাকি চার মাস পাম্প বন্ধ থাকত। ওই পাকা চৌবাচ্চাটিকে পুকুর বললে ভুল হবে না। এই পুকুরটিই পরবর্তী কালের ‘ক্যালকাটা সুইমিং ক্লাব’।

ক্রমে চাঁদপাল ঘাটের কদর কমলো বন্দরগামী মালগাড়ি যাওয়ার ফলে। এর পর উল্টোডাঙা থেকে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত চক্ররেল চালু হওয়ায় তার অবস্থা আরও খারাপ হয়। শব্দের আঘাতে এখন নদীর সঙ্গে ঘাটের সুখ-দুঃখের কথা হয় না। তবুও মাঝরাতে জেটিঘাটকে ধাক্কা দিয়ে জাগায় নদীর জল, বলে— মনে পড়ে ১৪৫ দিন ধরে মহাসমুদ্র আর বহু নদী পাড়ি দিয়ে লন্ডন থেকে কলকাতায় ভিড়েছিল ‘এন্টারপ্রাইজ’! গঙ্গার ইতিহাসের সেই-ই প্রথম বাষ্পীয় জাহাজ।
এর পর অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ১৯০৭ সালে এই ঘাট থেকে পোর্ট ট্রাস্ট-এর পরিচালনায় প্রথম স্টিমার চলাচল শুরু হয় ‘ফেরি’ পরিষেবা হিসেবে। শুরুটা ঠিকই ছিল, কিন্তু ট্রেন-বাস-গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকায় কদর কমে যায় ফেরির। শেষে, ১৯২৭ সালে, প্রায় কুড়ি বছর পর এই পরিষেবা বন্ধ করে দেয় পোর্ট ট্রাস্ট। তখন তাদের স্টিমারের সংখ্যা মাত্র ১৩। এর পর আবারও এই পরিষেবা শুরু হয় ‘ক্যালকাটা স্টিম ন্যাভিগেশন কম্পানি লিমিটেড’-এর পরিচালনায়। তাদের অফিস ছিল ৫ ফেয়ারলি প্লেস-এ। দৈনিক দু’টি ফেরি চলত তখন—
• চাঁদপাল-রামকৃষ্ণপুর-তেলকলঘাট
• চাঁদপাল-শিবপুর-তক্তাঘাট-বটানিক্যাল গার্ডেন-মেটিয়াবুরুজ-রাজাবাগান-রাজগঞ্জ


১৯৫২ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত সুন্দরবন লঞ্চ সিন্ডিকেটের অধীনে ছিল এই ফেরি সার্ভিস। এর পর থেকে হুগলি নদী জলপথ পরিবহণ সমবায় সমিতির অধীনে চলাচল করছে। এখন চাঁদপাল-রামকৃষ্ণপুর (সকাল ৫-৫০ থেকে রাত ৮-৩০), চাঁদপাল-শিবপুর (সকাল ৭-৩০ থেকে রাত ৮-৩০), হাওড়া-চাঁদপাল (সকাল ৭-৩০ থেকে রাত ৮টা) ও চাঁদপাল-হাওড়া (৭-৪৫ থেকে ৮-১৫) রুট চালু আছে। ভাড়া ৫ টাকা।

এখন ছবিটা খানিক এ রকম— সময়সূচি মেনে সকাল সাড়ে পাঁচটা থেকে পারাপারের স্রোত ওঠে নদীবুকে। সাতসকালে হাওড়া থেকে চাঁদপালমুখী লঞ্চটি জেটিতে ভিড়লেই পিলপিল করে নেমে আসে নিত্যযাত্রীরা। কাঠের জেটিতে হাজারও চটি-জুতোর শব্দ। পারাপারের সময়টুকুর কত খুনসুটি, কত টুকরো বাদানুবাদ উবে যায় এক মুহূর্তে। তড়িঘড়ি চক্ররেলের লাইন পার হয়ে যাত্রীরা এসে দাঁড়ায় বাসের অপেক্ষায়। তার পর হারিয়ে যায় কলকাতার জনারণ্যে। পাশেই আছে একটি বট গাছ— কবেকার কে জানে! তারই ছায়ায় ৬২ বছর ধরে ডাব বিক্রি করে চলেছেন জনৈক বিক্রেতা। খাওয়া ডাবের স্তূপের পাশে অপেক্ষারত স্কিনফিট জিন্স। ঘন ঘন ফোন। মানুষের কোলাহলে চা-পান-ঠান্ডা পানীয়ের দোকানে ব্যস্ততা বাড়ে। গরম তেলে টপাটপ ডুবতে থাকে আলুর চপ, ডালপুরি। খোসা ছাড়িয়ে পসরা সাজায় ফলের ঝুড়ি। পারাপারের জন্য লাইন পড়ে টিকিটঘরে। সকালের সেই শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়!

তথ্য: পাপিয়া মিত্র
নিজস্ব চিত্র
 
 


 

Content on this page requires a newer version of Adobe Flash Player.

Get Adobe Flash player

 
অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.