প্রচার নেই, হোমের আসন ফাঁকা
দেউলিয়ার পরেশ মাইতি। দশ বছর বয়সে তার বাবা মারা যাওয়ার পর দিশেহারা মা দু’মুঠো ভাত নিশ্চিত করতে পাঠিয়ে দিয়েছিল কলকাতায়। সেখানে চায়ের দোকানে বাসন মাজত সে। পাঁচ বছর পর উন্নতি হয়ে রাস্তার ধারে ভাতের হোটেলে বাসন মাজছে। পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা হয়নি। অন্য দিকে ময়নার মগরা গ্রামের শ্যামল নায়েক। পড়ানোর ক্ষমতা নেই বুঝতে পেরে অত্যন্ত দুঃস্থ পরিবারের বালককে তমলুকের সরকারি হোমে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পরিজনেরা। পড়াশোনা করার পর আজ সেনাবিভাগে কর্মরত শ্যামল সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনে।
পরেশের মামা বা পড়শিরা জানতেন না, অনাথ অথবা দুঃস্থ ছেলে-মেয়েদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া-পড়ানোর জন্য সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত সমাজ কল্যাণ আবাস আছে। থাকলে হয়তো ফুটফুটে ছেলেটার ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল হত। পরেশের মতো আরও হাজার-হাজার শিশু দু’মুঠো ভাতের জন্য ভিন্ শহরে পাড়ি দিয়ে উদয়াস্ত খাটছে। বিসর্জন দিয়েছে শৈশব, পড়াশুনার ন্যূনতম অধিকার। অথচ, পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় এই রকম পাঁচটি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত আবাসিক হোমে মোট ৬৭৫ জনকে রাখার ব্যবস্থা থাকলেও রয়েছে মাত্র ৩০৫ জন। অর্থাৎ মোট আসনের অর্ধেকই ফাঁকা পড়ে। এই অবস্থার জন্য সরকারি উদ্যোগ ও প্রচারের অভাবকেই দায়ী করছেন লোকজন। বকলমে সে অভিযোগ মেনেও নিচ্ছেন প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
সরকারি অনুমোদনে চলা সমাজ কল্যাণ আবাস বা হোমে অনাথ, পিতৃহীন, মাতৃহীন অথবা দুঃস্থ ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মাধ্যমিক পাশ করা পর্যন্ত বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। দায়িত্বে জনশিক্ষা প্রসার দফতর (সমাজ কল্যাণ দফতরের হোম আলাদা)। নিয়ম অনুযায়ী এই হোমে থাকার জন্য আবেদন করতে হয় জেলা জনশিক্ষা প্রসার দফতরে। অনেক সময় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিও উদ্যোগী হয়ে আবেদন করে দেয়।

জায়গা থাকলেও খাগদা শিশুসদনে আবাসিক সংখ্যা মাত্র ৩০। ছবি: কৌশিক মিশ্র।
এরপর দফতর থেকে আবেদনকারীকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় হোমে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সরাসরি দফতর পরিচালিত হোমটি রয়েছে কাঁথিতে। এখানে শুধুমাত্র মেয়েরা থাকে। সরকারি এই হোমে ১৫০ জন আবাসিক থাকার জন্য অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ৭০ জন। জেলার বাকি চারটি হোম সরকারি ভাবে অনুমোদিত ও আর্থিক সাহায্যপ্রাপ্ত। এগুলিতে শুধু ছেলেরা থাকে। এর মধ্যে কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার (সেভ দি চিলড্রেন) পরিচালনাধীন জেলায় দু’টি হোম রয়েছেএগরা-২ ব্লকের খাগদা ও হলদিয়া মহকুমার মহিষাদলের এক্তারপুরে। খাগদার হোমে ১৫০ জন আবসিকের থাকার অনুমোদন থাকলেও সেখানে বর্তমানে মাত্র ৩০ জন বালক রয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদিত আবাসিক সংখ্যার মাত্র এক পঞ্চমাংশ আবাসিক রয়েছে। এক্তারপুরের হোমে ১৫০ জন আবসিক থাকার অনুমোদন থাকলেও সেখানে মাত্র ৩২ জন রয়েছে। তুলনায় কিছুটা ভাল অবস্থা তমলুক ব্লকের শ্রীরামপুর শিশু নিকেতন হোমের। এখানে ১৬৫ জন আবাসিক থাকার অনুমোদন রয়েছে। বর্তমানে রয়েছে ১১৭ জন। তমলুক শহরের পার্বতীপুরে থাকা তমলুক শিশু রক্ষা সমিতিতে ৬০টি অনুমোদিত আসনে রয়েছে ৫৬ জন।
আবসিক মিলছে না কেন?
হোম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এই সুযোগের কথা জানেই না অধিকাংশ লোক। জানানোর জন্য ব্যবস্থাও নেয়নি প্রশাসন। শুধুমাত্র অজ্ঞতার কারণে সরকারি এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনাথ, দুঃস্থ ছেলে-মেয়েরা। হোমের জায়গা অনুযায়ী আবাসিক সংখ্যার ভারসাম্য না-থাকার কারণ বোঝাতে গিয়ে জেলা জনশিক্ষা প্রসার দফতরের এক আধিকারিক বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে বাড়ি থেকে দূরের কোনও হোমে রাখার ব্যবস্থা করলে অনাথ বা দুঃস্থ ছেলে-মেয়েদের অভিভাবকরা রাজি হন না। তাই জেলাসদর তমলুকে তুলনায় অনেক বেশি আবাসিক থাকলেও এগরার খাগদায় সংখ্যাটা খুবই কম।”
পূর্ব মেদিনীপুর জেলা জনশিক্ষা প্রসার দফতরের আধিকারিক দেবমাল্য নস্কর কিছুটা দায় এড়িয়ে বলেন, “উপরতলা থেকে যেমন নির্দেশ আসে, তেমনটা করে থাকি। প্রচারও করা হয়।” তবে, সরকারি উদ্যোগের অভাবই যে আবাসিক সংখ্যা কমের মূল কারণ, তা মেনে নিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদের শিক্ষা-সংস্কৃতি কর্মাধ্যক্ষ মামুদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘জনসাধারণের কাছে প্রচারের ক্ষেত্রে আমাদের খামতি রয়েছে। এই পরিস্থিতির হাল বদলাতে আমরা ইতিমধ্যে উদ্যোগী হয়েছি। শীঘ্রই দফতরের আধিকারিক ও জেলার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিকে নিয়ে বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।”
এ দিকে, হোমগুলিরও নিজস্ব অনেক সমস্যা রয়েছে। সরকারিভাবে আবাসিকদের মাথাপিছু যে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয় তাতে খাওয়া-পড়াশোনার ব্যবস্থা করা মুশকিল। ফলে অধিকাংশ আবসিক হোমগুলি আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, হোমগুলিতে আবাসিকদের মাথাপিছু প্রতি মাসে বরাদ্দ ১২৫০ টাকা। এর মধ্যে খাওয়ার জন্য ৯০০ টাকা, পড়াশোনা, দেখভালের জন্য নিযুক্ত কর্মীদের ১২০ টাকা ও অন্য খরচ বাবদ ২৩০ টাকা। এক আবাসিক হোমের কর্মকর্তা বলেন, “আবাসিক বালকদের খাওয়া, পড়াশোনা ছাড়াও অন্যান্য খরচ বাবদ সরকারি ভাবে যে টাকা দেওয়া হয় তাতে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী খুবই অসুবিধা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন জানানো হলেও সুরাহা হচ্ছে না।”
কষ্টে চললেও হোমে মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে, মেলে দু’বেলার খাবার। কত শিশু-কিশোর যে সেটুকুও পায় না, হিসাব রাখে কে?


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.