এমন রাত কোনও দিন দুঃস্বপ্নেও কাটাইনি
চাঁদ উঠতে আরও অপার্থিব মনে হচ্ছিল চারপাশ।
দু’পাশে গহন অরণ্য। এক সঙ্গে দশ-বারোটা হাতির গর্জন-আর্তনাদ। তার মধ্যে এক বিরাট সরীসৃপের মতো নিথর দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদের ট্রেন। মনে হচ্ছিল, সভ্য সমাজ থেকে বহু দূরে কোথাও আটকে পড়ে রয়েছি। প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল, এখনই বুঝি ওই পাহাড়প্রমাণ হাতিগুলি এসে ট্রেনে ধাক্কা দেবে। প্রতিবার তাদের গর্জনে চমকে উঠছিলাম। বাইরের দিকে তাকাতে পর্যন্ত সাহস হচ্ছিল না। গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর মধ্যে যেখানে অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে, মনে হচ্ছে সেগুলিই বুঝি এখনই নড়েচড়ে এসে ট্রেনটাকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করবে।
বিকেলে ট্রেনে ওঠার সময়ে ঘুণাক্ষরেও এমন একটা কাণ্ড ঘটতে পারে বলে ভাবিনি। রাতের মধ্যেই আলিপুরদুয়ার পৌঁছে যেতে পারব ভেবে এনজেপি থেকে স্বামী চা শ্রমিক নেতা জোয়াকিম বাক্সলার সঙ্গে বুধবার বিকেলে উঠেছিলাম অসমগামী কবিগুরু এক্সপ্রেসে। ট্রেন ঠিকঠাকই যাচ্ছিল। যথারীতি জঙ্গলের মধ্যেও ঢুকে পড়ল। আমার তখন একটু ঝিমুনি এসেছে। বাঙ্কে একটা চাদর পেতে শুয়ে পড়েছিলাম। সহযাত্রীরা অবশ্য বেশ উত্তেজিত ছিলেন। এমন ঘন অরণ্য তাঁদের অনেকেই আগে দেখেননি। কামরার আলোও নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাইরেটা ভাল দেখা যায়। অনেকে দরজার সামনেও দাঁড়িয়েছিলেন। আর তখনই হঠাৎ একটা বিরাট ঝাঁকুনি। তারপরেই ট্রেনটা দাঁড়িয়ে পড়ল। ইঞ্জিনের দিক থেকে খুব শব্দ আসছিল। সহযাত্রীরা দেখেছেন, লাইনের উপর থেকে পাথরকুচি, ধুলোবালি ছিটকে যাচ্ছে নানা দিকে। সঙ্গে সুতীব্র জান্তব চিৎকার। তখন সন্ধ্যা প্রায় পৌনে ছ’টা।
বৃহস্পতিবার সকালেও সেতু থেকে ঝুলছে হাতির দেহ।
চলছে সরানোর প্রস্তুতি। ছবি: দীপঙ্কর ঘটক।
প্রথমে বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে। কয়েক জন সহযাত্রী নেমে গেলেন ট্রেন থেকে। খানিক পরে সহযাত্রীদের কাছ থেকেই জানলাম, ট্রেনের নীচে কাটা পড়েছে বেশ কয়েকটি হাতি। হাতির বাকি দলটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আশপাশেই। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, ট্রেন এখন আর নড়বে না।
তখন থেকেই ভয়টা চেপে বসল আরও। কামরায় কয়েকটি বাচ্চা ছিল। তারাও কী জানি বুঝে চুপ করে গেল। যেটুকু প্রাণ ছিল, তা-ও যেন কেউ কেড়ে নিল। দমবন্ধ করে বাইরের দিকে চেয়েছিলাম। ট্রেনটা মাঝে মধ্যে দুলছিল। আসলে লোকজনের দৌড়োদৌড়িতে অমনটা হচ্ছিল। লাইন থেকে একটু দূরেই হাতির দল। কোনটা তাদের গর্জন, কোনটা আর্তনাদ বুঝতে পারছিলাম না। গুজব রটছিল নানা রকম। হঠাৎই এক সহযাত্রী বললেন, হাতির আরও দল এসে নাকি গোটা ট্রেন ঘিরে ফেলেছে। তাই ভয়ে সকলে দরজার সামনে থেকে ফিরে আসেন। যে ক’টা আলো জ্বলছিল, তা-ও নিভিয়ে দেওয়া হয়। তার মধ্যে ঠকঠক করে কাঁপছি।
তার মধ্যেই কেউ বলছিলেন, হাতির দল তাড়া করে আসবে। কেউ বলছিলেন, চাপড়ামারির অরণ্যে চিতাবাঘও রয়েছে। এক সহযাত্রী অভয় দিয়ে বললেন, হাতির দল যে ভাবে দাপাদাপি করছে, তাতে চিতাবাঘ বা বাইসন কাছে ঘেঁষবে না। কিন্তু কোন কথাটা সত্যি আর কোনটা নয়, তা তখন বুদ্ধি দিয়ে বিচার করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। বাইরের দিকে তাকাতেই ভয় করছিল। এক একটা জায়গায় জটলা করে বসে সহযাত্রীরা নিচু স্বরে কথা বলছিলেন। কতক্ষণ এ ভাবে কেটেছে জানি না, আস্তে আস্তে হাতিদের আর্তনাদ বন্ধ হয়ে গেল। এ বার একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক। তারপরে একবার বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে একটা হাতির ডাক শুনলাম। আবার কিছুক্ষণ পরে বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে আর একটা হাতির ডাক শুনতে পেলাম। এরকম চলতে থাকল আরও কিছুক্ষণ। কার্তিকের রাতে দ্বাদশীর জ্যোৎস্না যেন আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
অবশেষে অনেক রাতে দেখলাম বন ও রেল দফতরের লোকজন এসেছেন। তাঁরা ট্রেনটিকে ভাল করে পরীক্ষা করলেন। তারও বেশ কিছুক্ষণ পরে ট্রেন পিছন দিক থেকে চলতে শুরু করল। শুনলাম, একটি ইঞ্জিন এসে ট্রেনটিকে চালসায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত দেড়টা। তখন খিদের কষ্ট বুঝতে পারলাম। রাতেই আলিপুরদুয়ার চলে যাব ভেবে বিকেলে এনজেপি-তে শুধু কেক আর ডালবড়া খেয়েছিলাম। তারপর খিদের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
রেল কর্তৃপক্ষই চালসাতে রুটি, আলুভাজা, ডিমভাজা দেন। তাই যেন তখন অমৃত। এনজেপি ফিরে এ দিন সকালে বাড়ি পৌঁছেছি। যে রাত কাটিয়ে এলাম, তা দুঃস্বপ্নেও কোনওদিন কাটাব ভাবিনি।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.