দোষারোপে ক্ষুব্ধ প্রণব ব্যাখ্যা চান সরকারের
দেশের আর্থিক নীতি কোন পথে হাঁটবে, তা নিয়ে এত দিন অমর্ত্য সেনের সঙ্গে জগদীশ ভগবতীর তাত্ত্বিক লড়াই চলছিল। কিন্তু দেশের বর্তমান আর্থিক সঙ্কটের দায় কার, সেই নিয়ে এ বার নতুন সংঘাত প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পালানিয়প্পন চিদম্বরমের।
ভারতীয় অর্থনীতির সাম্প্রতিক যাবতীয় সমস্যার জন্য অর্থমন্ত্রী চিদম্বরম গত ক’দিন ধরেই বিভিন্ন মঞ্চে তাঁর পূর্বসূরি, অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে পরোক্ষে আক্রমণ করছিলেন। এমনকী, গত সপ্তাহে সংসদেও তিনি নাম না-করে প্রণব-জমানার দিকে আঙুল তোলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ তাঁর পাশেই বসেছিলেন।
চিদম্বরমের এই দোষারোপে প্রণববাবু ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। সেই ক্ষোভের কথা ঘরোয়া স্তরে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে পৌঁছে দিয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবন। ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে সরকারের। তবে সরকারি ভাবে এ নিয়ে কিছু না-করার কারণ হল, সে ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হতো। রাষ্ট্রপতি সেটা চাননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, প্রণববাবু যেচে এই ক্ষোভের কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে যাননি। আত্মরক্ষার খাতিরেই তাঁকে এই কাজ করতে হয়েছে। সাউথ ব্লক সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী জি-২০ বৈঠকে যোগ দিতে রাশিয়া যাওয়ার আগে রাষ্ট্রপতির ক্ষোভের কথা জেনেছেন। সব শুনে তিনি দুঃখিত। মনমোহন-ঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা অশ্বিনী কুমার আজ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন।
চিদম্বরমের আক্রমণের জবাব দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবন সূত্রে বেশ কিছু যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রণববাবু যে বাজেট পেশ করেছিলেন, তাতে প্রধানমন্ত্রী সই রয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেই বাজেট অনুমোদিত হয়েছে। যে বৈঠকে চিদম্বরমও হাজির ছিলেন। তা হলে সার্বিক দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে ব্যক্তিবিশেষের দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে কেন? তা ছাড়া, যে সময় কালে, যে আর্থিক ব্যবস্থার জন্য আজকের সঙ্কট বলে চিদম্বরমের অভিযোগ, সেই সময় প্রণববাবু অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্বই ছিলেন না বলে রাষ্ট্রপতি ভবন সূত্রের দাবি।
প্রথম ইউপিএ-জমানার গোড়া থেকে অর্থমন্ত্রী ছিলেন চিদম্বরম। ২০০৮ সালে নভেম্বরে মুম্বই-হামলার পরে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব নেন। তার পর থেকে প্রধানমন্ত্রীই অর্থ মন্ত্রক সামলাচ্ছিলেন। ২০০৯-এর জানুয়ারিতে অর্থমন্ত্রী হন প্রণববাবু। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে ফের অর্থ মন্ত্রকে ফেরেন চিদম্বরম। এর মধ্যে গোটা বিশ্বে আর্থিক সঙ্কট ঘনিয়েছে। দেশের অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়েছে। লাগামছাড়া হয়েছে রাজকোষ ঘাটতি ও বিদেশি মুদ্রায় আয়-ব্যয়ের ফারাক।
চাপান-উতোর
অর্থ মন্ত্রক রাষ্ট্রপতি ভবন
অর্থনীতি চাঙ্গা করার জন্য উৎসাহ দিতে গিয়েই বিপত্তি
জিএসটি চালুর কাজ হয়নি। উল্টে কর ফাঁকি
রোখার আইন আতঙ্ক ছড়িয়েছে শিল্প মহলে।
জিএসটি চালু করতে ব্যর্থ

প্রথম দু’দফার উৎসাহ মনমোহনের হাত ধরেই
প্রণবের আমলেই ডিটিসি বিল পেশ। গত এক বছরে
কিছু হয়নি। কর ফাঁকি রোখা হয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে
সব চেয়ে বেশি কাজ তখনই

প্রণব-চিদম্বরম সংঘাতের সূত্রপাতও সেখান থেকেই। চিদম্বরম পরোক্ষে বোঝাতে চাইছেন, প্রণববাবুর জমানায় আন্তর্জাতিক মন্দা থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে গিয়ে উৎসাহবর্ধক ব্যবস্থা (স্টিমুলাস প্যাকেজ) গ্রহণের ফলে আর্থিক ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির হার লাগামছাড়া হয়েছে। সেই সময়েই উৎপাদন শুল্ক ও আমদানি শুল্কের হার কমানো হয়। বাড়ানো হয় সরকারি খরচ। যার জেরে বাড়ে রাজকোষ ঘাটতি। চলতি খাতে বাণিজ্যিক ঘাটতিও (ডলারের আয়-ব্যয়ের ফারাক) নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পায়ের তলার জমি হারায় দেশের অর্থনীতি।
রাষ্ট্রপতি ভবনের পাল্টা যুক্তি হল, প্রথম দফার ২০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা হয়েছিল ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে। তখন অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্বে স্বয়ং মনমোহন। এর পর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য ২০০৯ সালের ২ জানুয়ারি মাসে আরেক দফা উৎসাহবর্ধক ব্যবস্থা ঘোষণা হয়। তখনও প্রণববাবু অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্বে আসেননি। ২৪ জানুয়ারি মন্ত্রকের দায়িত্ব নিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি অন্তর্বর্তী বাজেট পেশ করেন। যেখানে উৎপাদন শুল্ক ও পরিষেবা করের হার কমানো হয়। কিন্তু সেই বাজেটের প্রস্তুতি আগেই সারা হয়ে গিয়েছিল। ফলে এই সব ব্যবস্থার কোনওটির দায় সরাসরি প্রণববাবুর উপরে বর্তায় না।
চিদম্বরম বলছেন, এই সব উৎসাহবর্ধক ব্যবস্থা নেওয়ার ফলেই রাজকোষ ঘাটতির হার ২০০৮-’০৯ অর্থবর্ষে জিডিপি-র ৬.২ শতাংশে পৌঁছে যায়। ২০০৭-’০৮ সালে যা ছিল ২.৭ শতাংশ। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবনের বক্তব্য, চিদম্বরম তাঁর শেষ বাজেটে (২০০৮-’০৯ সালের জন্য) রাজকোষ ঘাটতির হার কম করে দেখিয়েছিলেন। বাজেটে তিনি বেশি ব্যয় দেখাননি। কিন্তু পরে দু’দফায় ১ লক্ষ ৫৬১৩ কোটি ও ৪২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দের অনুমোদন নেন। ফলে বছর শেষে রাজকোষ ঘাটতির হার বেড়ে যায়।
কিন্তু তখন চিদম্বরম আর অর্থ মন্ত্রকে নেই। তাই তিনি দায় এড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। অন্য দিকে, প্রণববাবু নিজের জমানায় মাত্র ১০,৭৬৫ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ের অনুমোদন নিয়েছিলেন। চিদম্বরম-শিবির আরও বলছে, কর ব্যবস্থা সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রণববাবু কিছুই করে যাননি। তা সে প্রত্যক্ষ কর বিধিই (ডিটিসি) হোক বা পণ্য পরিষেবা কর (জিএসটি)। এই দু’টি কর চালু হলে অর্থনীতি চাঙ্গা হতো। উল্টে ২০১২-’১৩-এর বাজেটে ভোডাফোনের উপরে কর বসানো ও কর ফাঁকি প্রতিরোধ বিধি (জিএএআর) চালুর মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিদেশি লগ্নিকারীরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্রপতি ভবনের যুক্তি, ডিটিসি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু প্রণববাবুর জমানাতেই। ২০০৯-এর ১২ অগস্ট প্রথম খসড়া প্রকাশ হয়। সব মহলের মত জেনে সংশোধিত খসড়া লোকসভায় পেশের পর স্থায়ী কমিটিতে যায়। কিন্তু ২০১২-র মে-র পর ডিটিসি বিল ফের লোকসভায় পেশ হয়নি। অথচ রীতি মানলে এ বছরের মে-র মধ্যে তা হওয়ার কথা ছিল। যা দেরি হয়েছে, তা গত বছর মে-র পর, চিদম্বরমের জমানায়। জিএএআর চালু হয়েছিল স্থায়ী কমিটির সুপারিশ মেনেই।
জিএসটি নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের যুক্তি, এই কর ব্যবস্থা চালুর জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য করতে প্রণববাবু ২৯ মাসে ২০ বার বৈঠক করেছেন। ১৬ বার তিনি রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের এমপাওয়ার্ড কমিটি বা তার চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। চার দফায় গুজরাত, বিহারের মতো বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন। উল্টে চিদম্বরমই তাঁর ২০০৬-’০৭ ও ২০০৭-’০৮-এর বাজেটে জিএসটি নিয়ে দু’রকম বক্তব্য রাখেন। তথ্যই বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যেই জিএসটি নিয়ে সব থেকে ঘটনাবহুল কাজ হয়েছে। কিন্তু তার পর থেকে জিএসটি চালুর বিশেষ কিছুই করতে পারেনি সরকার। আর নতুন কর ব্যবস্থা চালুর জন্য নন্দন নিলেকানিকে তথ্য-প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো তৈরির দায়িত্বও দেওয়া হয় প্রণববাবুর আমলেই।
চিদম্বরম যে ভাবে প্রণববাবুকে দোষারোপ করছেন, তার নিন্দা করেছেন বিজেপি নেতৃত্বও। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে লালকৃষ্ণ আডবাণী জানান, তাঁরা বিস্মিত। কারণ চিদম্বরম এখন নিজের সরকারেরই প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছেন, যখন তিনি পদাধিকারের কারণে জবাব দিতে পারবেন না। চিদম্বরমের বিরুদ্ধে অধিকার ভঙ্গের নালিশের হুমকিও দেন বিজেপি সাংসদ যশবন্ত সিনহা।

পুরনো খবর:



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.