শাসকের রং পাল্টাইলেই সমাজের চরিত্রও বদলাইবে, এমন আশা সম্ভবত পরিবর্তনের সর্বাগ্রগণ্য ধ্বজাধারীরাও করেন নাই। ২০১১ সালের মে মাসের পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ যেমন ছিল, ২০১৩ সালের অগস্ট মাসেও তেমনই আছে। রাজনীতিকদের সহিত সমাজের সম্পর্কও পূর্ববৎ। সম্পর্কটি অনুগ্রহকারী মুরুব্বি এবং অনুগৃহীতের। দ্বিতীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে প্রথম গোষ্ঠী তাহাদের বিভিন্ন অন্যায্য সুবিধার ব্যবস্থা করিয়া দিবেন— ইহাই বঙ্গীয় রাজনৈতিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি। অনস্বীকার্য, আর পাঁচটি সামাজিক ব্যাধির ন্যায় এই অনাচারটির জন্মও বাম আমলে। দলীয় খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধিয়া রাখিতে পারিলে রসের অভাব হইবে না, এই বিশ্বাসটি চৌত্রিশ বৎসরের বাম শাসনে বঙ্গমানসে অনপনেয় হইয়াছে। রাজনৈতিক ‘পরিবর্তন’ সেই বিশ্বাসের নয়া পয়সা এ দিক ও দিক করিতে পারে নাই। বরং, নূতন নেতারা নূতন মুরুব্বি হইয়া বসিয়াছেন— অনুগ্রহের ধারাটি দিব্য বহমান। পূর্বে যেমন পার্টি অফিসের সুপারিশপত্র হাতে অযোগ্য ছাত্ররা কলেজে ভর্তি হইতে যাইত, এখনও তেমনই মদন মিত্র-আদি নেতাদের চিঠি লইয়া যায়। পূর্বে কলেজে ছাত্র ভর্তির প্রক্রিয়ায় দাপাইত এস এফ আই-এর কর্মীরা, এখন দাপায় তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র পরিষদের ঝান্ডাবাহকরা। ছবিটি একই আছে, রং বদলাইয়াছে মাত্র। পূর্বে হইত বলিয়াই এখন হইতেছে, অতএব তাহাতে দোষ নাই— এই যুক্তিটি শাসকপক্ষ ব্যবহার করিতেই পারে। বস্তুত, যে কোনও অ(প)শাসনের ক্ষেত্রে ইহাই এখন প্রধানতম যুক্তি। কিন্তু যুক্তিটি বিষাক্ত। তাহাতে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা মারা পড়িবে। মারা পড়িতেছে। জয়পুরিয়া কলেজ তাহার সাক্ষী।
উদ্ধারের পথ একটিই— ভর্তি প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ করা, যাহাতে দুর্নীতি হইলে অন্তত তাহা যেন চোখে পড়ে। স্বচ্ছতা আনিবার একটি পথ ইতিমধ্যেই আলোচিত হইতেছে— অনলাইন ভর্তি। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পারে নাই, কিন্তু বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় করিয়া দেখাইয়াছে। কেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পারিল না, তাহার বহুবিধ উত্তর সম্ভব। সবকয়টি উত্তরই সম্ভবত কম-বেশি ঠিক। তবে, আর কোনও কারণ না থাকিলেও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল বপুই সবকয়টি কলেজকে অনলাইন ভর্তির আওতায় আনিবার পথে একটি বৃহৎ বাধা। কিন্তু, বাধাগুলিকে কাটাইতে হইবে। হাতে এক বৎসর সময়, তাহার মধ্যেই অনলাইন ভর্তির পরিকাঠামো গড়িয়া তুলিতে হইবে। আগামী শিক্ষাবর্ষে যেন ফের এই পরিস্থিতি না হয়।
কেহ বলিতেই পারেন, অনলাইন ভর্তির ব্যবস্থা হইলেই দুর্নীতি উবিয়া যাইবে না। ব্যবস্থা বদলাইলেই সমাজের মন বদলাইবে না, রাজনীতিকদের সহিত জনতার মুরুব্বি-অনুগৃহীতের সম্পর্কও বদলাইবে না। তাহা হইলে আর নূতন ব্যবস্থায় লাভ কী? যুক্তিটি অসার। অনলাইন ব্যবস্থা হইলে তাহা যে বর্তমান ব্যবস্থা অপেক্ষা স্বচ্ছতর হইবে, তাহা নিশ্চিত। সেই স্বচ্ছতা বহুমূল্য। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় স্থানীয় চাপ অনেকখানি কমিবে। তবুও ফাঁকফোকর থাকিয়া যাইবে। সেই ছিদ্র বন্ধ করাই পরবর্তী দায়িত্ব। কী ভাবে অনলাইন ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা যায়, তাহা দেখিতে হইবে। অর্থনীতির পরিভাষা ব্যবহার করিলে বলা চলে, বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় অনলাইন ব্যবস্থা ‘প্যারেটো সুপিরিয়র’, অর্থাৎ ব্যবস্থার অন্তর্গত কোনও পক্ষই পূর্বের অবস্থার তুলনায় খারাপ থাকিবে না, কিন্তু কেহ পূর্বের তুলনায় ভাল থাকিতে পারে। সেই ব্যবস্থার পথে হাঁটাই কর্তব্য। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাহা পারিবে কি? |