ভুটানে আইনসভার দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে শাসক দল ড্রুক ফুয়েনসাম সোগপা (ডি পি টি) প্রতিদ্বন্দ্বী দল পি ডি পি-র কাছে পরাস্ত। ইহা ছিল ভুটানরাজ জিগমে সিনজে ওয়ানচুক তাঁহার দেশে গণতান্ত্রিক আইনসভা মারফত শাসন চালাইবার বন্দোবস্ত প্রবর্তন করার পর দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ৪৭টির মধ্যে ৩২টি আসন জিতিয়া বিরোধী দল এ বার ক্ষমতাসীন। নির্বাচনী প্রচারপর্বে রাজনৈতিক দল ও তাহার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা গিয়াছে, নির্বাচনী প্রচারপর্বে প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের মধ্যে যে উদ্যম ও তৎপরতা দেখা গিয়াছে, জনসাধারণ যে-ভাবে তাহাতে সাড়া দিয়াছেন, তাহাতে মনে হয়, প্রথম নির্বাচনের তুলনায় এ বার ভোটদাতারা অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যায় অংশগ্রহণ করিলেও সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি হয়তো ভুটানে ক্রমশ জনপ্রিয় হইতেছে। রাজতন্ত্র হইতে গণতন্ত্রে বিবর্তনের সমগ্র প্রক্রিয়াটিতে আধুনিক, ভবিষ্যমুখী ভুটানরাজের ব্যক্তিগত সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও রহিয়াছে।
এ বার ভুটানকে এত কাল ধরিয়া কেরোসিন ও প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর দেওয়া ভর্তুকি প্রত্যাহার করিয়া লওয়ার ভারতীয় সিদ্ধান্তটি ভুটানের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয় হইয়া ওঠে। বিদায়ী শাসক দল গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের সহিত ঘনিষ্ঠতা বাড়াইতে গিয়া নয়াদিল্লিকে চটাইয়া এই ভর্তুকি রদের কারণ হইয়াছে, বিরোধীদের এই প্রচারই সম্ভবত ভারতের উপর অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল ভুটানের নির্বাচকমণ্ডলীকে বিরূপ করিয়া তোলে। নয়াদিল্লির তরফে এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক, বিশেষত যে সময়ে তাহা গৃহীত হইয়াছে। ভুটানের বিদেশ নীতি, অর্থাৎ ভুটান কোন তৃতীয় রাষ্ট্রের সহিত কী ধরনের সম্পর্ক গড়িয়া তুলিবে, সে-সংক্রান্ত নীতি দীর্ঘ কাল নয়াদিল্লির মর্জিনির্ভর ছিল। ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান মৈত্রী চুক্তি নূতন করিয়া সম্পাদিত হওয়ার সময় ভুটান এ ব্যাপারে সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী হয়। তদবধি গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের সহিত থিম্পুর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি হইতে থাকে। নয়াদিল্লি স্বভাবতই থিম্পুর এই স্বাধীনতাপ্রিয়তা সুনজরে দেখে নাই।
নূতন শাসক দল পি ডি পি নয়াদিল্লির সহিত সম্পর্ককেই অগ্রাধিকার দিয়া ভর্তুকি ফিরিয়া পাইতে উদ্গ্রীব। কিন্তু এই ভাবে এক ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করিয়া আঞ্চলিক আধিপত্য কায়েম রাখার কূটনৈতিক প্রয়াস প্রায়শ ব্যুমেরাং হইতে দেখা গিয়াছে। নেপাল, বাংলাদেশ, এমনকী মালদ্বীপ এবং সর্বশেষ ভুটান যে ভাবে ভারতের মিত্ররাষ্ট্র হইতে ক্রমে বিরোধী রাষ্ট্রে পরিণত হইয়াছে, তাহা উদ্বেগজনক। বেজিংয়ের সহিত নয়াদিল্লির সম্পর্ক যেমনই হউক, ভুটানকে তাহার নিজের মতো করিয়া চিন বা অন্য যে কোনও তৃতীয় রাষ্ট্রের সহিত স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়িতে দেওয়া উচিত। অন্যথায়, অচিরেই সংকট ঘনাইতে পারে। |