তেহট্টে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনার উপরে ক্রমেই ধুলো পড়ছে। ঘটনার চার মাস পরেও তদন্তের ‘গতি প্রকৃতি’ থেকে শুরু করে প্রশাসনের পদক্ষেপের ‘বহর’ দেখে এ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গতবছর ১৪ নভেম্বর তেহট্টের হাউলিয়া মোড়ে উত্তেজিত জনতাকে সামলাতে গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। মৃত্যু হয় স্থানীয় বাসিন্দা অশোক সেনের। গুরুতর আহত হন সুধাময় ঘোষ নামে এক যুবকও। দুবরাজপুরের লোবায় পুলিশের গুলি চালানোর রেশ কাটতে না কাটতে তেহট্টে পুলিশের গুলি চালানো নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজ্য রাজনীতি। যদিও পুলিশের কর্তারা দাবি করেন, আত্মরক্ষার জন্যই গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তেহট্টের তৎকালীন এসডিপিও শৈলেশ। ঘটনার পরের দিন থেকেই তেহট্টে ভিড় করতে শুরু করে রাজনীতির কারবারিরা। মিছিল, মিটিং, প্রতিবাদে সরগরম হয়ে ওঠে নদিয়ার প্রান্তিক ওই জনপদ। অভিযোগের আঙুল ওঠে স্থানীয় কিছু তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধেও। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষপর্যন্ত তেহট্টে ছুটে আসেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সরকারের প্রতিশ্রুতি মতো মৃতের পরিবারকে দেওয়া হয় চাকরি ও ক্ষতিপূরণ, আহতদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সাহায্যও। কিন্তু তারপর তদন্তভার সিআইডি-র হাতে যাওয়ার পরে ক্রমেই ধুলো জমতে থাকে সে দিনের ঘটনার উপরে।
তেহট্টের স্থানীয় বাসিন্দারা যেমন বলছেন, ‘‘আর কী চাই? সবই তো হয়ে গেল! পুলিশের গুলিতে মৃত কিংবা আহতদের পরিবারের কেউ পুলিশের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করল না, পাছে চাকরি কিংবা ক্ষতিপূরণ হাতছাড়া হয়ে যায়। উল্টে পুলিশ অসংখ্য নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ দায়ের করে বসে থাকল আর চেনা ছকে গোটা ঘটনার রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে আসরে নেমে পড়ল রাজনৈতিক দলগুলোও।” অথচ যে রাস্তার পাশে যে সরকারি জমি নিয়ে এত কাণ্ড, তার স্থায়ী কোন সমাধানও প্রশাসন এখনও পর্যন্ত করল না।
তেহট্টে গুলি চলেছিল ১৪ নভেম্বর। প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ ওই ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও ১৭ নভেম্বর তেহট্ট কাণ্ডের তদন্তের ভার নেয় সিআইডি। প্রশ্ন হল, যে এসডিপিও’র গুলি চালানো নিয়ে এত হইচই হল তাঁর বিরুদ্ধে কি কেউ কোন অভিযোগ দায়ের করেছে? নদিয়ার পুলিশ সুপার সব্যসাচী রমন মিশ্র বলেন, ‘‘না, তৎকালীন এসডিপিও শৈলেশের বিরুদ্ধে কেউ কোনও অভিযোগ করেননি কেউই।” ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁকে রাজ্য সশস্ত্র পুলিসের তৃতীয় ব্যাটেলিয়নে বদলি করেই দায় সেরেছে পুলিশ। অন্যদিকে, এসডিপিও’র অভিযোগের ভিত্তিতে সে সময় যে মামলা শুরু হয়েছিল তার চার্জশিট এখনও পর্যন্ত জমা দিতে পারেনি সিআইডি।
জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘‘তেহট্টের ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের একটি তদন্ত হবে বলেও শুনেছিলাম কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই তদন্ত শুরু হয়েছে কিনা তাও আমাদের জানা নেই।’’ পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে তেহট্টের ঘটনায় এসডিপিও’র অভিযোগের ভিত্তিতে যে চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁরা জামিনে ছাড়া পেয়ে গিয়েছে। সেইসময় পরিস্থিতি যা তৈরি হয়েছিল তাতে ওই চারজনের পর আর কাউকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রেও বেশ ঝুঁকি ছিল। আর অন্যান্য অভিযুক্তদের অনেকেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন।
তেহট্ট মহকুমা আদালতের আইনজীবী অনিকেত জোয়ারদার বলেন, ‘‘তেহট্ট কান্ডের পর যা যা হল তা একপ্রকার লোকদেখানো ঘটনা ছাড়া আর কিছু নয়। ওই ঘটনার পর তৎকালীন এসডিপিও শৈলেশ যাদের নামে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাদের মধ্যে মৃত অশোক সেন ও আহত সুধাময় ঘোষের নামও ছিল। মৃত ও আহতদের পরিবারের লোকজনকে মঞ্চে তুলে মুখ্যমন্ত্রী তাদের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র ও ক্ষতিপূরণও তুলে দিলেন। ব্যাস মামলা তিতিয়ে যেতে থাকে এরপরেই। থানার আইসি ও এসডিপিওকে বদলি করেই মামলার ‘যবনিকা’ ফেলে দিয়েছে পুলিশ বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মত।
হাউলিয়া পার্ক মোড় আবার আগের মতো জমজমাট। দরদাম, বিকিকিনি, গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজ, ধুলো, ভিড়ে সেই কবেই মিলিয়ে গিয়েছে মাটিতে পড়ে থাকা জমাট রক্তের দাগ। একটু একটু করে উধাও হয়ে গিয়েছে কালো পিচ রাস্তায় পড়ে থাকা গাড়ির ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোও। শুধু মাঝেমধ্যে অশোক সেনের বাড়িতে হা-হুতাস। আর, সুধাময় ঘোষের স্ত্রী রীতাদেবী বলেন, ‘‘লোকটা একেবারে পঙ্গু হয়ে গেল। দুই নাবালক ছেলেমেয়েকে নিয়ে সংসারটা এ বার কিভাবে চলবে বলতে পারেন?”
|