বেআইনি স্কুলগাড়ি নিষিদ্ধ করতে মহাকরণ থেকে ফের নির্দেশ জারি হল। এক মাসের মধ্যে এই নির্দেশ কার্যকরী করা হবে বলে ঘোষণা করেছেন পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র। এর আগে আরও দু’বার লিখিত নির্দেশ জারি হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পরিবহণমন্ত্রী মৌখিক নির্দেশও দিয়েছেন। তবুও কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় দাপিয়ে চলছে বেআইনি স্কুলগাড়ি। অভিযোগ, নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও অধিকাংশ গাড়িতে থাকছে না।
বাণিজ্যিক ছাড়পত্র ছাড়া স্কুলগাড়ির ব্যবসার প্রতিবাদে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানাচ্ছে ট্যাক্সি-মালিক এবং কন্ট্রাক্ট-বাস মালিকদের সংগঠন। এ ব্যাপারে এই দুই সংগঠন বিভিন্ন সময়ে ধর্মঘটও ডেকেছে। তা সত্ত্বেও প্রায় চার হাজার বেআইনি স্কুলগাড়ি কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় দাপটে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী মদন মিত্র কিছু দিন আগে স্কুলগাড়ি-মালিকদের সংগঠনের নেতাদের মহাকরণে ডেকে জানিয়ে দেন, এ বার তাঁদের আইনের কাঠামোয় আসতে হবে। মন্ত্রীর নির্দেশে সম্প্রতি পরিবহণসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় বিভাগীয় অফিসারদের নিয়ে সংগঠন প্রতিনিধিদের সঙ্গে সবিস্তারে কথা বলেন। এর পরে জারি হয় নির্দেশিকা। |
২০০৭-এর জুলাই মাসে স্কুলগাড়ির দুর্ঘটনায় ভিআইপি রোডে একটি নামী স্কুলের এক ছাত্রের মৃত্যু হয়। এর পরে বেআইনি স্কুলগাড়িগুলোকে আইনি করার চেষ্টায় নির্দেশিকা জারি হয়। ২০০৯-এর ৩১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট স্কুলগাড়ির নিরাপত্তার ব্যাপারে একটি নির্দেশ দেয়। তার প্রেক্ষিতে ২০১০-এর গোড়ায় রাজ্য সরকার ফের নির্দেশিকা দেয়। কোনওটিতেই কাজের কাজ হয়নি। নিয়ম মেনে ছাড়পত্র পায় মাত্র ৮২টি স্কুলগাড়ি।
কেন এই হাল? স্কুলগাড়ি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবির রায় বলেন, “আমরা আগ্রহী থাকলেও পরিবহণ দফতরের ঢিলেমি এবং জটিলতায় বিষয়টা গতি পায়নি।” প্রায় এক হাজার আবেদন পিভিডি-তে ফাইলবন্দি হয়ে আছে বলে তাঁর দাবি। এ ব্যাপারে পরিবহণ দফতরের এক অফিসার বলেন, “যে সব শর্ত ও আবশ্যিক নথি আবেদনের সঙ্গে চাওয়া হয়েছিল, আবেদনগুলির অধিকাংশতেই সে সব ছিল না।”
আগের নির্দেশিকায় স্কুলগাড়ির চালকের ন্যূনতম অভিজ্ঞতা পাঁচ বছর হওয়া বাঞ্ছনীয় বলা হয়েছিল। গাড়িতে চালকের একজন সহকারী রাখার কথাও জানিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু অভিযোগ, স্কুলগাড়ির মালিকেরা এ সবের ধার ধারেন না। এ ব্যাপারে পরিবহণ দফতরের এক পদস্থ অফিসার বলেন, “এত স্কুলগাড়ির উপরে নজরদারির পরিকাঠামো আমাদের নেই।” পরিবহণমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, “আমরা দায়িত্বে আসার পরে গোটা ব্যাপারটা বুঝে গুছিয়ে নিতে একটু সময় লাগছে। আইনি নির্দেশ এবং নিরাপত্তা রক্ষার সঙ্গে কোনও আপোস চলবে না।”
মহাকরণের নয়া সরকারি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে কলকাতার মোটর ভেহিক্যাল্স (পিভিডি), বিভিন্ন জেলার শাসক ও পরিবহণ-অফিসারদের (আরটিও)। |
বেআইনি স্কুলগাড়ি পর্যায়ক্রমে আইনসিদ্ধ করার নির্দেশও দিয়েছে রাজ্য সরকার। নির্দেশিকায় লেখা হয়েছে,
১) নয়া আবেদনকারীদের স্কুলগাড়ি ১০ বছরের পুরনো হলে চলবে না।
২) ২০০৬ ও ২০০৯-এ রাজ্যের পরিবহণ দফতর যে রূপরেখা দিয়েছিল, তা মানতে হবে।
৩) প্রতিটি স্কুলগাড়িকে প্রতি বছর নিয়মিত ছাড়পত্র (সিএফ) নিতে হবে।
৪) নরম ছাউনির কোনও গাড়িতে পড়ুয়াদের নেওয়া যাবে না। বুধবার পরিবহণমন্ত্রী মহাকরণে বলেন, “এক মাসের মধ্যে স্কুলগাড়িগুলোকে নথিভুক্ত করতে হবে। সবাইকে চলতে হবে আইন মেনে। প্রতিটি গাড়িতে ইচ্ছেমতো বাচ্চা নেওয়া যাবে না।” মন্ত্রীর হিসেবে, কলকাতায় এ রকম স্কুলগাড়ি চলে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার।
মহাকরণ সূত্রের খবর, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতি বছর স্কুলগাড়ি বাবদ সরকার অন্তত ৪ কোটি টাকা বাড়তি আয় করবে। সেই সঙ্গে বাড়বে ‘সার্টিফিকেট অফ ফিটনেস’ এবং বিমা-খাতে আয়। এখন বছরে ৩,৪০০ টাকা সড়ক কর, তিন হাজার টাকার তৃতীয় পক্ষের বিমা করিয়ে স্কুলগাড়ি চালানো হচ্ছে। আইনসিদ্ধ হয়ে গেলে বছরে সড়ক কর বাবদ সরকারের আয় হবে প্রায় ১৬,৬০০ টাকা। তৃতীয় পক্ষের বিমা-বাবদ স্কুলগাড়ি পিছু আয় হবে ১১,৫০০ টাকা। প্রতি জেলায় যাতায়াতের জন্য স্কুলগাড়ির মালিকের কাছ থেকে সরকার প্রতি পাঁচ বছরে নেবে ২,৫০০ টাকা। অর্থাত্, বারাসতের পরিবহণ বিভাগে নথিভুক্ত স্কুলগাড়ি যদি ছাত্র নিয়ে বেহালায় যায়, সেটির জন্য কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা এই তিন জেলায় যাতায়াতের বৈধ অনুমতিপত্রের জন্য দিতে হবে ৭,৫০০ টাকা। |