বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তাঁকে বলেছিলেন, “তোমার যা পড়াশুনো, তাতে নোবেল পেতে পারতে। তা না করে এটা তুমি কী করলে! বিশ্বের অর্থনৈতিক জগৎ তোমার মতো এক জন শিক্ষককে হারাল।”
সময়টা ১৯৭৭-৭৮ সাল হবে। কলকাতায় প্রশাসন সংক্রান্ত এক সেমিনারে প্রিয় ছাত্র তরুণ দত্তের উদ্দেশে ‘ভবতোষ স্যারে’র বলা ওই কথাগুলো এখনও স্মৃতিতে রেখে দিয়েছেন এ রাজ্যের অনেক আইএএস।
সেই তরুণ দত্ত মারা গেলেন শনিবার ভোরে। বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তাঁর একমাত্র পুত্র দীপঙ্কর দত্ত জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তরুণবাবুকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
প্রায় পঁয়ত্রিশ বছরের কর্মজীবনে ১৯৫৬ ব্যাচের এই আইএএস অফিসার রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বাস্থ্যসচিব-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এ দিন সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই তরুণবাবুর সমসাময়িক এবং পরবর্তী প্রজন্মের অনেক অফিসার তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যান।
সেই দলে ছিলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, বিদ্যুৎমন্ত্রী মণীশ গুপ্ত, মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্র-সহ আরও অনেকে। এ দিন বিকেলে কেওড়াতলা শ্মশানে তরুণ দত্তের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
হতেই পারতেন বিশ্বের যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অথবা স্বনামধন্য গবেষক। ভবতোষ দত্তের মতো অনেকে তা-ই চেয়েছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে যাঁরাই তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন, তাঁরাও প্রশাসক তরুণ দত্তের মধ্যে সেই পণ্ডিত মানুষটিকে আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর মাস্টারমশাই সুলভ আচরণের ছোঁয়া পাননি এমন মানুষ বিরল। যে কোনও বিষয় নিয়ে তাঁর কাছে গেলে অবধারিত ভাবে শুনতে হত, “ব্যাপারটা আগে ভাল করে বুঝতে হবে। না হলে জানবে কী করে? লিখবেই বা কী করে?”
উত্তর কলকাতার হাটখোলা দত্তবাড়ির ছেলে তরুণবাবু আইএএস-এ বসার আগে পর্যন্ত জীবনের কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। ম্যাট্রিকুলেশন, ইন্টারমিডিয়েট, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সবেতেই প্রথম স্থানে।
আইএএস পরীক্ষাতেও প্রথম পাঁচ জনের মধ্যে ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে অমর্ত্য সেনের চেয়ে এক বছরের ‘সিনিয়র’ তরুণ দত্ত স্নাতক স্তরে পড়ার সময়েই ভবতোষ দত্তের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। গবেষণা বা শিক্ষকতা না-করে অন্য জগতে পা রাখায় তরুণবাবুর পরিচিতরা এখনও আফশোস করেন।
তবে প্রশাসক তরুণ দত্তও সব মহলেই সমাদৃত ছিলেন। দিল্লির নর্থ ও সাউথ ব্লকেও যে কোনও মন্ত্রকের সচিবের ঘরে তাঁর অবাধ গতিবিধি ছিল। কলকাতা বন্দর এবং ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য নগরোন্নয়ন (তখন অন্য নাম ছিল) দফতরের সচিব এবং অবসরের আগে মুখ্যসচিব পদে বরাবর মাথা উঁচু করে কাজ করেছেন। সহকর্মীরা বলেন, একই ঘরে বসে অনায়াসে একসঙ্গে ৫-৬টি সরকারি মিটিং করতেন তরুণ দত্ত। এক বার একটি বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। শিল্প-প্রতিনিধিরা জানিয়েছিলেন, এমন নেতা পাওয়া দুর্লভ। ১৯৯১ সালে অবসরের পরে রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন তরুণবাবু। ছিলেন প্রথম রাজ্য নির্বাচন কমিশনারও।
এমন দীর্ঘকায় প্রশাসকও জীবনে এক বার বিতর্কে জড়িয়েছেন। ১৯৭০ সালে যখন তিনি বর্ধমানের জেলাশাসকের পদে তখনই ঘটেছিল সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড।
ঘটনাচক্রে সাঁইবাড়ি নিয়ে বর্তমান রাজ্য সরকার বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু তরুণ দত্তকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মুখ্যমন্ত্রীর দূত অবশ্য এ দিন হাজির ছিলেন শ্মশানে। |