অবশিষ্ট ভারতের কথা ক্রমশ প্রকাশ্য, কিন্তু সংগ্রামী পশ্চিমবঙ্গের সংগ্রামী ট্রেড ইউনিয়ন এবং তাহাদের পশ্চাদ্বর্তী সংগ্রামী রাজনৈতিক দলের সংগ্রামী নায়কদের চিত্ত আজ নিশ্চয়ই চুলবুল করিতেছে। কারণ ‘আজ হরতাল, আজ চাকা বন্ধ’। এই পুলক আক্ষরিক অর্থেই দ্বিগুণ হইয়াছে, তাহার কারণ, ভাষা দিবসের প্রতি শ্রদ্ধাবশতই হউক, জনসাধারণের বন্ধ-বিরাগ অনুমান করিয়াই হউক অথবা মুখ্যমন্ত্রীর সতর্কবাণীকে গত দেড় বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতায় জারিত করিয়াই হউক, দুই দিনের সাধারণ ধর্মঘটকে উদ্যোক্তারা পশ্চিমবঙ্গে এক দিনে ছাঁটিতে বাধ্য হইয়াছেন। আগামী কাল শিল্প ধর্মঘটের আহ্বান অক্ষত আছে বটে, তবে যান চলাচল করিলে এবং দোকানপাট খোলা থাকিলে আর ধর্মঘটের সুখ কী? অতএব দুই দিনের বিপ্লব এক দিনে সারিতে হইতেছে। পাটিগণিতের সূত্রেই বৈপ্লবিক উত্তেজনার অনুপাত দ্বিগুণ হইবে, তাহা অনিবার্য। বামপন্থী বলিয়া পরিচিত নহেন, এমন শ্রমিক সংগঠন বা তাহাদের পশ্চাদ্বর্তী দলও এই ধর্মঘটে শামিল, তবে কিনা, প্রথমত, এই রাজ্যে বামপন্থী দলগুলির অনুসারী ইউনিয়নবৃন্দই প্রচারের অধিকাংশ পরিসর জুড়িয়া থাকেন এবং দ্বিতীয়ত, নামে যাহাই হউক, চিন্তাধারায় এই উদ্যোক্তারা সকলেই অমোঘ বামপন্থী।
সমগ্র আয়োজনে নূতন কিছুই নাই। পরিচিত কর্মনাশা যজ্ঞ, পরিচিত উদ্যোক্তা, পরিচিত দাবিপত্র। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ বা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো কিছু দাবি কার্যত অর্থহীন, কারণ এই দাবিতে পালানিয়াপ্পন চিদম্বরমও সোৎসাহে যোগ দিবেন। অবশিষ্ট দাবিগুলির একাংশ, যথা বিলগ্নিকরণের বিরোধিতা বা স্থায়ী পদে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের প্রতিবাদ জুরাসিক যুগে প্রচলিত ছিল। আর তাহাদের অন্য অংশ যথা, মাসে দশ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি বা অসংগঠিত শ্রমিকের জাতীয় সুরক্ষা তহবিল গঠন আদর্শ পরিস্থিতিতে প্রাসঙ্গিক হইলেও বাস্তবোচিত নয়, কারণ অর্থনীতি তথা সরকারের সেই দাবিগুলি রূপায়ণের সামর্থ্য নাই। ধর্মঘটের উদ্যোক্তারা এই সকল সত্য জানেন না, এমন কথা মনে করিবার কোনও কারণ নাই। প্রথমত, এগুলি নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানের কথা। দ্বিতীয়ত, সময়ান্তরে তাঁহাদের কর্তাব্যক্তিরা কেহ কেহ কথাগুলি কার্যত স্বীকারও করিয়াছেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথামৃত স্মরণীয়।
তাহা হইলে কেন এই অন্তঃসারশূন্য দাবিপত্র দেখাইয়া অর্থহীন অকর্মযজ্ঞ? কেন একটি মন্দাক্রান্ত দেশের, বিশেষত একটি বিধ্বস্ত রাজ্যের অর্থনীতির উপরে ধর্মঘটের ঘা দেওয়া? উত্তর সহজ। দেশের বা রাজ্যের অর্থনীতিকে যে পথে উন্নত করা যায়, বামপন্থীদের কেতাবে তাহা নিষিদ্ধ। তাহা উদার নীতির পথ। বুদ্ধদেববাবু বাস্তববোধের প্রেরণায় সেই পথে হাঁটিতে চাহিয়াছিলেন, পারেন নাই, প্রকাশ্যে বন্ধ-এর সমালোচনা করিয়াও পরে আত্মখণ্ডন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। সুতরাং তাঁহাদের ‘আজ হরতাল, আজ চাকা বন্ধ’ বিনা গীত নাই। এই ধর্মঘট প্রকৃতপক্ষে ভাবের ঘরে ডাকাতি। |