সম্পাদকীয় ১...
শূন্যতার পরিণাম
থিত আছে, নরকের পথ শুভ ইচ্ছা দ্বারা বাঁধানো। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতর এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করিয়াছে যে, আসন্নপ্রসবা নারীকে হাসপাতালে লইয়া যাইবার জন্য সরকার প্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি হুকুমদখল করিতে পারিবে। উদ্দেশ্য মহৎ। সন্তানপ্রসব হাসপাতালে হওয়া উচিত, গৃহে নয়, তাহাতে জননী এবং সন্তান উভয়েরই মঙ্গল। কিছু কিছু মানুষ এই সিদ্ধান্তে নীতিগত আপত্তি তুলিতে পারেন, তাঁহাদের বক্তব্য: যথেষ্ট পরিকাঠামোর আয়োজন করিয়া বাড়ির পরিবেশে প্রসব ঘটাইতে পারিলে হাসপাতাল অপেক্ষা তাহা শ্রেয়, কারণ অনেক বেশি মানবিক। এই বিষয়ে তর্ক চলিতে পারে, কিন্তু সেই তর্ক আপাতত থাকুক। উন্নত দুনিয়ায় বা ভারতের মতো দেশের উচ্চকোটিতে বাড়িতেই ‘যথেষ্ট পরিকাঠামো’ সরবরাহ হয়তো সম্ভবপর। কিন্তু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জননীর জীবনে তাহার আলোচনাও সম্পূর্ণ অর্থহীন। বিশেষত, যে নারীকে হাসপাতালে লইবার জন্য হুকুমদখল করিয়া গাড়ি সংগ্রহের কথা ভাবিতে হয়, তাঁহার বাড়িতে প্রসূতিসদনের সংস্থা্ন?
সমস্যা অতএব অনস্বীকার্য। আসন্নপ্রসবাকে হাসপাতালে লইয়া যাওয়া দরকার। অনেকের পক্ষেই সে জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সুতরাং বিশেষ সহযোগিতা জরুরি। সেই সহযোগিতা সরকারকেই করিতে হইবে, এমন নয়। সমাজ, অ-সরকারি সংগঠন, বেসরকারি সংস্থা, বিভিন্ন মহল হইতেই সাহায্য আসিতে পারে। যদি অন্য কোনও মহল হইতে সাহায্য না আসে, তবে পুরসভা, পঞ্চায়েত বা সরকারের উপর এক ধরনের নৈতিক দায়িত্ব বর্তায়, এই যুক্তিও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার ব্যক্তিগত গাড়ি হুকুমদখল করিতে পারে কি? এই বিষয়ে আদালত ইতিমধ্যেই বলিয়াছেন যে, ইহার জন্য আবশ্যক আইন নাই, আগে আইন সংশোধন করিতে হইবে। এই বিষয়ে চূড়ান্ত রায়দান কয়েক দিন পরে। আইনের বিচার মহামান্য আদালতের হাতে। কিন্তু এই উপলক্ষে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন উঠিয়া আসিয়াছে। তাহা নৈতিকতার প্রশ্ন। ব্যক্তির অধিকারের প্রশ্ন। ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন।
সমাজ ব্যক্তির সমাহার। কিন্তু যথার্থ সমাজ ব্যক্তির সমাহারমাত্র নয়। অনেক ব্যক্তি একত্র হইলেই প্রকৃত সমাজ গড়িয়া ওঠে না। তাহার জন্য আবশ্যক ব্যক্তির সহিত ব্যক্তির সম্পর্কের যথাযথ কাঠামো ও সেই কাঠামোর কালোপযোগী বিবর্তন। ভারতীয় সমাজ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হইয়াছে, তাহা অতি-আলোচিত সত্য। এক কালে পাড়ার যে কোনও একটি বাড়ির প্রয়োজনে অন্য সব বাড়ি হইতে লোকজন ছুটিয়া আসিত, আজ তাহা, অন্তত শহরাঞ্চলে, ঐতিহাসিক স্মৃতিমাত্র। ফলে ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হইয়াছে। অথচ, সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য নৈর্ব্যক্তিক কোনও প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো তৈয়ারি হয় নাই। পশ্চিম দুনিয়ার নানা দেশে যেমন সরকার এবং এন জি ও মিলিয়া একটি ‘সহায়ক অর্থনীতি’ সরবরাহ করিয়া থাকে, এ দেশে তাহার আয়োজন হয় নাই। অর্থের অভাবে হয় নাই, সামাজিক মূলধনের অভাবে হয় নাই, সরকারি তাগিদের অভাবেও হয় নাই। তাহার পরিণামেই এখন আসন্নপ্রসবাকে হাসপাতালে লইয়া যাইতেও ব্যক্তিগত গাড়ি জোর করিয়া ‘ধরিবার’ নির্দেশ দিতে হইতেছে। এমন বিসদৃশ নির্দেশের পিছনে রহিয়াছে একটি বিসদৃশ সমাজ, যে সমাজ পুরানো কাঠামো হারাইয়াছে, নূতন কাঠামো খুঁজিয়া পায় নাই।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.