খেলাধুলা...
ক্রিকেটমোহিনী
ফেসবুকে ভক্তের সংখ্যা তেরো হাজার ছুঁইছুঁই। পুরুষদের রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। তাঁদের গার্লফ্রেন্ডদের হিংসের পাত্রী।
হাঁটুর ছ’সাত ইঞ্চি আগে শেষ হয়ে যাওয়া কালো পোশাকে মোড়া লম্বা, ছিপছিপে শরীরটাকে যদি এক শব্দে বোঝাতে হয়, দশ জনের মধ্যে ন’জনের উত্তর কী হতে পারে? বাজি রেখে বলা যায়। সেক্সি!
আসুন, পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি অর্চনা বিজয়া।
কলকাতা নাইট রাইডার্স-ডেকান চার্জার্স ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে। বরাবাটি স্টেডিয়াম। দীর্ঘাঙ্গীর দীর্ঘায়িত দুটো পা পরম মমতায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে হালকা নীল জিন্স। সঙ্গে সাদা স্লিভলেস টি-শার্ট। পায়ে শকিং পিঙ্ক স্নিকার্স। ডান হাতে বুম, বাঁ হাত দিয়ে চোখের উপর নেমে আসা অবাধ্য চুল ঠিক করতে করতে নির্দেশ দিচ্ছেন ক্যামেরাম্যানকে। দেখে শুনে নাইট রাইডার্সের প্র্যাক্টিস দেখতে আসা উৎসাহী জনতার আর দায় পড়েছে নেটে গৌতম গম্ভীরের ব্যাটিং দেখার? এ তো এক কথায় মরুভূমিতে মরূদ্যান! অগত্যা দু’আঙুল মুখে পুরে সিটি!
অর্চনা অবশ্য এ সবে উদাসীন। সিটির উদ্দেশ্য যে তিনি, জানেন। জানেন এবং পেশাদারি পটুত্বে তা উপেক্ষা করতে পারেন। কটকের চল্লিশ ডিগ্রি গরমে কপালে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম আলতো করে মুছে নিয়ে তৈরি হন শু্যটের জন্য। পুরুষ হৃদয়ে অব্যর্থ মোচড় দিতে ঠিক কী রসায়ন লাগে, তা এ মেয়ের হাতের তালুতে। বিনোদনের টি-টোয়েন্টিতে এ মেয়ে এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতো। যা প্রতি সন্ধেয় টিভিতে জয় করে নিচ্ছে লাখ লাখ পুরুষের হৃদয়। শরীর নিয়ে নেই কোনও ন্যাকা ছুঁৎমার্গ। অনায়াসে নিজের ওয়েবসাইটে আপলোড করতে পারেন বিকিনি শুটের ছবি। যা আছে, তা দেখাব না কেনভাবখানা এই। ম্যাচের আগে ওয়াসিম আক্রমের লাইভ ইন্টারভিউ করছেন যখন, ক’টা লোক আক্রমের কথা শুনছেন? চোখ যে পিছলে যাচ্ছে সেট ম্যাক্সের বুম ধরা মসৃণ দুটো হাতে, কমলা লিপগ্লস রাঙানো পাতলা ঠোঁটে, কাজল-পরা চোখের গনগনে আগুনে।
আইপিএলের মেজাজের সঙ্গে একেবারে খাপে খাপে ‘ফিট’ করে যাচ্ছেন অর্চনা। ইনি শাড়ির সঙ্গে মন্দিরা বেদি খ্যাত নুডল স্ট্র্যাপ ব্লাউজের সাহসিকতাকে ইতিহাস করে দিতে পেরেছেন। এবং বেছে নিয়েছেন হাঁটুর অনেক উপরে শেষ হয়ে যাওয়া মিনি স্কার্ট বা ক্লিভেজের বিপজ্জনক হাতছানি সহ লো কাট টপ। এই তো সে দিন ম্যাচের আগে সঞ্চালনায় বসেছিলেন সঞ্জয় মঞ্জরেকর ও অজয় জাডেজা। ম্যাচের আগে টুকরো টিপ্পনী চলছে। অর্চনাই হঠাৎ স্টুডিওতে চিয়ারগার্লদের নাচ দেখতে দেখতে জাডেজাকে বললেন, “এই যে জাড, এ সব দেখে নিশ্চয়ই পুলকিত হচ্ছ!” সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা ছক্কা জাডেজার, “তুমি যখন আছ, এমনিতেই যথেষ্ট পুলকিত। ওদের আর লাগে না!”
এ হল গড়পড়তা পুরুষের মনের কথা। অর্চনার স্ক্রিন প্রেজেন্স এতটাই সাহসী যে টু-পিস পরা চিয়ারকন্যাদের লাস্যময়ী নাচও ফেল মেরে যাচ্ছে। তা কী করে শুরু হয়েছিল এই মেয়ের উত্থান? শুনে নিন, আইপিএলে আগুন ঝরানো অর্চনা খোদ কলকাতার মেয়ে। লরেটো হাউজ, ভবানীপুর কলেজ থেকে পড়াশোনা করা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। এখন পাকাপাকি ভাবে মুম্বইয়ের বাসিন্দা। কিন্তু বাবা-মা এখনও বালিগঞ্জ প্লেসে থাকেন। তবে অর্চনার বাংলাটা সড়গড় নয়। ভাঙা, ভাঙা বলেন। মডেলিংয়ে আসাটা অর্চনার নিজের কথাতেই, ‘লাক বাই চান্স’। ২০০৪-এর কোনও এক রাতে তন্ত্রয় পার্টি wকরতে গিয়ে চ্যানেল ভি-র মডেলিং রিয়্যালিটি শোয়ের অডিশন দেওয়া থেকে শুরু। “আমার বন্ধুরাই বলেছিল অডিশনটা দিতে। তখন ওদের বলেছিলাম, আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবি তো? ঠিক আছে, কর!” ঠাট্টার ছলে অডিশন দেওয়ার সময় ভাবতেও পারেননি দু’সপ্তাহ পর ফোনটা আসবে।
‘গেট গর্জাস’ শোয়ের অন্যতম ফাইনালিস্ট হিসেবে গোয়া যাওয়ার কারণ মডেল হওয়ার অ্যাম্বিশন নয়, গোয়া ঘোরার ইচ্ছে! “কোনও দিন গোয়া যাইনি। মা-বাবাকে বললাম, ঘুরে আসি? ওঁরা বললেন, যা না। এনজয় কর। কয়েক দিন পর দেখলাম আমি কম্পিটিশনটা জিতে গেছি!” হাসতে হাসতে স্মৃতিচারণের রাস্তা থেকে ফিরে আসেন অর্চনা। আইপিএল ম্যাচ শুরুর দু’ঘণ্টা আগে সোনি টিভির কন্ট্রোল রুমের চূড়ান্ত ব্যস্ততা থেকে তিনি তখন আট বছর দূরে। জানালেন, মডেলিংকে পেশা হিসেবে বাছা নিয়ে পরিবার থেকে কখনও বাধা আসেনি। বরং বাবা-মা’র সমর্থন পেয়ে এসেছেন বরাবর। পেরিয়ে এসেছেন একের পর এক স্টেশন। মডেলিং থেকে ভি-জে, ভি-জে থেকে অ্যাঙ্কারিং। মিউজিক চ্যানেল ছেড়ে আইপিএল কেন? না, খেলাধুলোর প্রতি তাঁর বরাবরের আগ্রহ। খেলার মাঠে যে যোগ্যতার বিচারে হার-জিত ঠিক হয়, সেই অমোঘ বিচারের প্রতি এক খেলাপ্রেমীর অবাক শ্রদ্ধা। ইডেনে ভারত-পাকিস্তান টেস্ট দেখতে দেখতে যদিও ভাবতে পারেননি, কোনও দিন এ ভাবে জড়িয়ে যাবেন খেলাটার সঙ্গে।
রাস্তাটা কিন্তু একেবারে গোলাপের পাপড়ি বেছানো নয়। ঈর্ষা করার মতো ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক্স ধরে রাখতে ট্রেডমিলে ছুটতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কানে আইপডের হেডফোন গুঁজে তখন শোনেন পাল্স রেট বাড়িয়ে দেওয়া ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক। সব সময় পরিপাটি সেজে থাকাও কি কম ঝক্কির? ক্লান্তিতে দু’চোখের পাতা বুজে এলেও ক্যামেরার সামনে দিতে হবে হাজার ভোল্টেজের ‘সেক্সি’ হাসি। ভেতরে ভেতরে হোটেলের এসি ঘরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে যতই ইচ্ছে করুক, সেই ইচ্ছেটার এক ভগ্নাংশও দেখানো চলবে না লাখ লাখ দর্শকের সামনে। “লাইভ টিভিতে ভুলের কোনও জায়গা নেই। বিশেষ করে আইপিএলের মতো একটা টুর্নামেন্ট কভার করতে গেলে প্রতি সেকেন্ডে কী হচ্ছে না হচ্ছে খেয়াল রাখতে হয়। সব সময় সিক্সথ গিয়ারে থাকতে হয়। উফ! বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা কী ভাবে সব নিংড়ে নেয়?” আইপিএল শেষ হতে না হতেই তাই সাত দিনের ছুটি নিচ্ছেন অর্চনা। গন্তব্য? “যে কোনও সমুদ্র। সি বিচে সারা দিন শুয়ে থাকব একটা ঢিলে গেঞ্জি আর হাওয়াই চটি পরে! ককটেলে চুমুক দেওয়া ছাড়া কোনও কাজ করব না।” সঙ্গে কি থাকবেন কোনও পুরুষ বন্ধু? মুচকি হেসে অর্চনার উত্তর, “একেবারেই না। অ্যাম স্টিল সিঙ্গল।”
ক্লান্তি যদি একটা দিক হয়, অন্যটা নিশ্চয়ই সারা দিন গুণমু্গ্ধ পুরুষদের দৃষ্টি সামলানো। “প্রথম প্রথম ভীষণ অস্বস্তি হত। এখন কে সিটি মারল, কে আমাকে দেখে হাত নাড়ল, ও সব দেখেও দেখি না। তবে হ্যাঁ, কেউ কোনও অশ্লীল মন্তব্য করলে এখনও খুব খারাপ লাগে।” কোনও ক্রিকেটারের কাছ থেকে সে রকম ব্যবহার পেয়েছেন? “না, না। আমাদের সম্পর্কটা খুব ভাল বন্ধুত্বের। ওরা যেমন আমাকে এই পেশায় বড় হয়ে উঠতে দেখেছে, আমিও তেমনই ক্রিকেটার হিসেবে ওদের পরিণত হতে দেখেছি। আর হালকা ফ্লার্টিং সব অফিসে যেমন হয়, এখানেও তাই।”
আর পাঁচটা সুন্দরী মেয়ের মতো অর্চনাকেও লড়তে হয় এক অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে। যে সারাক্ষণ বলে যায়, তুমি না মেয়ে? ক্রিকেটের মতো পুরুষতান্ত্রিক ক্ষেত্রে তুমি কী করছ? তুমি না সুন্দরী? তা হলে তো মাথায় বুদ্ধি বলে কোনও বস্তু নেই! কী ভাবে লড়েন অর্চনা? “সুন্দর দেখতে হলেই আপনাকে দু’গুণ খাটতে হবে যাতে লোকে আপনাকে সিরিয়াসলি নেয়। হট, সেক্সি এ সব তো রোজই শুনছি। কেউ যদি বলে অর্চনা, তুমি সত্যিই ক্রিকেটটা ভাল বোঝো, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট।”
শুধু মুখে রং মেখে ক্যামেরার সামনে হাসা নয়। অর্চনার জীবনে রয়েছে অক্লান্ত পরিশ্রমও। ডিজাইনার জামাকাপড়ের পাশাপাশি স্যুটকেসে রেখে নেন আন্দ্রে আগাসির আত্মজীবনী ‘ওপেন’ বা খালেদ হোসেনির ‘দ্য কাইট রানার’। সাজগোজ করা বুদ্ধিহীন ‘বিম্বো’ নন, অর্চনা সব দিক দিয়েই ‘বিউটি উইথ ব্রেনস।’


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.