জানতই না রাজ্য
অগ্নিপরীক্ষায় ফেল সেই সেপ্টেম্বরে, স্বীকৃতি কাড়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা
দু’মাস আগেই ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখে তাদের শংসাপত্র বাতিল করে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা ন্যাশন্যাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড অফ হেলথকেয়ার (এনএবিএইচ)। ২০০৮ সালে আমরি প্রথম এই কেন্দ্রীয় সংস্থার স্বীকৃতি পায়। তিন বছর পর পর তাদের শংসাপত্র নবীকরণও করে এনএবিএইচ। কিন্তু এ বছর সেপ্টেম্বরে পরিদর্শনে এসে অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখে তাদের স্বীকৃতি কেড়ে নেয় এনএবিএইচ। রাজ্য সরকার অবশ্য এ ব্যাপারে কিছুই জানত না। সংস্থাটিও তাদের স্বীকৃতি বাতিলের বিষয়টি সরকারকে জানায়ইনি।
আমরি হাসপাতালের অগ্নি পরীক্ষা ব্যবস্থায় কী কী গলদ পেয়েছিল সংস্থাটি?
কোয়ালিটি কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি জেনারেল তথা এনএবিএইচ-এর চেয়ারম্যান গিরিধর জ্ঞানী রবিবার বলেন, “আগুন লাগলে রোগীদের কী ভাবে হাসপাতাল থেকে বের করা যাবে, সেই পরিকল্পনায় যথেষ্ট গলদ ছিল ওদের। সেপ্টেম্বর মাসে পরিদর্শনে গিয়ে দেখলাম, ফায়ার অ্যালার্ম বাজছে না। ফায়ার ড্রিল হয় না। কর্মচারীদের আগুন নেভানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনও প্রশিক্ষণ নেই। অনেক জায়গায় নীচে নামার একাধিক পথ নেই। তাই আমরা শংসাপত্র নবীকরণ করিনি।”
আমরির অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা মুখ্যমন্ত্রীর।
রবিবার টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওয়। —নিজস্ব চিত্র
আমরির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরে দমকল দফতর কিন্তু হাসপাতালের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়ে এই প্রশ্নগুলিই তুলেছে। বিশেষ করে হাসপাতাল থেকে রোগীদের বাইরে বের করার প্রকৃত ব্যবস্থা যদি থাকত, তা হলে এতগুলি প্রাণ যেত না বলেই মত দমকল কর্তাদের। অগ্নিকাণ্ডের পরে হাসপাতালের ফায়ার লাইসেন্স বাতিল করে দমকল উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে। কেন এ সব পরিকাঠামো নেই, সেই প্রশ্ন তুলে আমরির লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য দফতর। কলকাতা পুরসভা বাতিল করেছে হাসপাতালের ট্রেড লাইসেন্স। কিন্তু দমকল, স্বাস্থ্য দফতর এবং কলকাতা পুরসভা তাদের লাইসেন্স নবীকরণ করার সময়ে এ সব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। যেটা তুলেছে এনএবিএইচ।
গিরিধর জ্ঞানী বলেন, “শুধু অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থাই নয়, নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিভাগ থাকলে যে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো থাকার দরকার, সেটাও ছিল না আমরির। ওরা নিউক্লিয়ার মেডিসিনের বেশ কিছু যন্ত্র কিনেছে, কিন্তু অ্যাটোমিক এনার্জি বোর্ডের অনুমোদন নেয়নি। এটা গর্হিত অপরাধ।”
রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর, পুরসভা বা দমকল কিন্তু লাইসেন্স নবীকরণ করার সময়ে এ সব প্রশ্ন তোলেইনি।
কেন? ওই তিন দফতরের কর্তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনও ব্যাখ্যা নেই। তবে কী ভাবে এত গলদ সত্ত্বেও তিন দফতর বার বার আমরির লাইসেন্স নবীকরণ করল, তা নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত হবে বলে মহাকরণ সূত্রের খবর।
গিরিধরবাবু বলেন, “আমরির শংসাপত্রের মেয়াদ ছিল এ বছরের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত। তার মধ্যে সব ত্রুটি ওরা শুধরে নিতে পারেনি। তাই ওদের শংসাপত্র নবীকরণ করিনি।” তাঁদের দেখানো গলদগুলি যদি আমরি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শুধরে নিতে পারত, তা হলে এতগুলি মানুষের প্রাণ যেত না বলে মনে করছেন এনএবিএইচ-কর্তৃপক্ষ।
কেন আমরি শুধরে নিল না তাদের গলদ? হাসপাতালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সত্যব্রত উপাধ্যায়ের জবাব, “নিউক্লিয়ার মেডিসিনের যন্ত্রের জন্য অ্যাটোমিক এনার্জি বোর্ডের অনুমোদন চেয়ে আমরা চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এনএবিএইচ আমাদের যা যা করতে বলেছিল, সে গুলিও সব করে অনুমতির জন্য অক্টোবরেই কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সার্টিফিকেট পুনর্নবীকরণের আগেই দুর্ঘটনা ঘটে গেল।”
আমরি হাসপাতালে মৃতদের স্মরণে মোমবাতি মিছিল।
রবিবার দেশকল্যাণ চৌধুরীর তোলা ছবি।
কী এই এনএবিএইচ? তাদের শংসাপত্রেরই বা কী দাম? কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের অধীনস্থ একটি সংস্থা হল কোয়ালিটি কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করার জন্য তার দু’টি শাখা রয়েছে এনএবিএইচ এবং এনএবিএল (ন্যাশন্যাল অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড অফ ল্যাবরেটরিস)। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক অফিসার বলেন, “এনএবিএইচ এবং এনএবিএল শংসাপত্র যে কোনও হাসপাতাল এবং প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির কাছে দক্ষতার স্বীকৃতি। অনেকগুলি ধাপ পেরিয়ে এই শংসাপত্র অর্জন করতে হয়। একটি হাসপাতালের পরিষেবা কী রকম চলছে, তার মাপকাঠিই হল এনএবিএইচ-এর শংসাপত্র।” এ দেশে এই সার্টিফিকেট পেয়েছে সাড়ে পাঁচশো হাসপাতাল। কলকাতার চারটি হাসপাতালের মধ্যে ঢাকুরিয়ার আমরিই হল প্রথম, যারা এই শংসাপত্র পেয়েছিল।
কিন্তু প্রথম বার শংসাপত্র দেওয়ার সময়ে আমরির এই সব গলদ কেন ধরা পড়েনি? গিরিধর জ্ঞানী বলেন, “আমাদের নির্দেশিকায় মোট ১০টি পরিচ্ছদ রয়েছে। তার মধ্যে ৫টিই রয়েছে রোগী নিরাপত্তার উপরে।
শংসাপত্র দেওয়ার সময় এর উপরেই সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকি আমরা। ২০০৮ সালে আমরিকে শংসাপত্র দেওয়ার সময় সেগুলি দেখা হয়েছিল। তখন সব কিছু সন্তোষজনক মনে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী কালে আমরি সেই মান ধরে রাখতে পারেনি।”
তবে সেপ্টেম্বরেই আমরির প্যাথোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির এনএবিএল-এর শংসাপত্র নবীকরণ হয়েছে বলে জানান এনএবিএইচ-এর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “সে ক্ষেত্রে ওরা সব গুণমান পূরণ করতে পেরেছে।”
কিন্তু প্রশ্ন হল, রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর কি এনএবিএইচ শংসাপত্র বাতিল হওয়ার কথা জানত না? স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন, এই শংসাপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগই করে না কোয়ালিটি কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। আমরির ওই শংসাপত্র যে বাতিল হয়েছে, তা হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষ বা এনএবিএইচ কেউই তাঁদের জানায়নি। আর আগুন লাগার আগে পর্যন্ত আমরি নিজেদের এনএবিএইচ-স্বীকৃত বলে দাবি করে এসেছে বলে স্বাস্থ্যকর্তারা মন্তব্য করেছেন।
এনএবিএইচ তাদের শংসাপত্র বাতিল করার পরেও কেন ঢাকুরিয়ার আমরি নিজেদের ওই সংস্থা স্বীকৃত বলে দাবি করেছে? সত্যব্রত উপাধ্যায়ের দাবি, “আমাদের ধারণা ছিল, আমাদের শংসাপত্র নবীকরণ হয়ে যাবে। আমরা ওদের সব শর্তই পালন করেছিলাম। এনএবিএইচ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।”

এই সংক্রান্ত আরও খবর
• মমতাকে কুর্নিশ এ বার টাটারও
• জাতীয় বিধি মেনে বাড়ি, কঠোর মুখ্যমন্ত্রী



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.