শরীরের ভাষা বলছে, তিক্ততা এখনও মেটেনি।
দমন থেকে গুজরাতের প্রবেশদ্বারেই ঢাকঢোল, হাতি-ঘোড়া, হেলিকপ্টার থেকে পুষ্পবৃষ্টি আর করজোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সব মিলিয়ে আয়োজন যথেষ্টই জমকালো। গুজরাতে লালকৃষ্ণ আডবাণীর জনচেতনা যাত্রাকে ‘সফল’ করতে সব রকম চেষ্টা করে গেলেন মোদী। প্রতিটি সভায় নিজের হাজার হাজার ‘ভক্ত’ সমাবেশ করিয়ে শক্তি প্রদর্শনও করেছেন।
কিন্তু প্রায় দেড় মাসের ব্যবধানে দেখা হওয়ার পরে আডবাণী যখন আলিঙ্গনের জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দিলেন, মোদীর তরফে তেমন সাড়া মিলল না। দিনভর একটি সভাতেও আডবাণীর পাশে বসলেন না। দু’জনের মাঝখানে একটি চেয়ার রাখলেন এবং সেখানে বসালেন গুজরাত বিজেপির রাজ্য সভাপতি আর সি ফালদুকে! অবশ্য এ নিয়ে নানা স্তরে গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছে টের পেয়ে সন্ধ্যায় নবসারির সমাবেশে আডবাণীর পাশে বসলেন। কিন্তু সে যেন নেহাতই বিতর্ক এড়াতে! এমনকী বড় মালায় আডবাণীর পাশে দাঁড়িয়ে এক সঙ্গে মাথা গলাতেও ইতস্তত বোধ করলেন। |
দুই নেতার মধ্যেকার এই দূরত্ব বিলক্ষণ চোখে পড়ছে। পড়ছে বলেই দলের নেতারা নানা ভাবে তাকে চাপা দিতে তৎপর। গুজরাতের মাটিতে আডবাণীর রথ কতটা ‘সফল’ তা তুলে ধরতেই ব্যস্ত তাঁরা। মোদী-আডবাণী ‘ঘনিষ্ঠতা’ নিয়ে কথা উঠলেই তাকে উড়িয়ে দিচ্ছেন নেতারা।
যেমন এ দিন বাপীতে প্রথম সভাতেই মোদী বোঝানোর চেষ্টা করলেন, এই গুজরাতে তিনিই ‘রাজা’। এখানে তিনিই শেষ কথা। আডবাণীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে দুর্নীতি প্রশ্নে মনমোহন সিংহ ও সনিয়া গাঁধীকে আক্রমণ করলেন ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিলেন, আডবাণীর এই দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনে তেমন অভিনবত্ব নেই। প্রকাশ্য সভায় আডবাণীর পাশে দাঁড়িয়েই মোদী জানিয়ে দিলেন, এই গুজরাতেই চিমনভাই শুক্ল কংগ্রেসের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘প্রথম’ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এমনকী বাবা রামদেব, অণ্ণা হজারেও একই ভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন।
ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন আডবাণীও। তবে তিনি বিলক্ষণ জানেন, গুজরাতে জনপ্রিয়তার নিরিখে মোদীর সঙ্গে টক্কর নেওয়া কঠিন। তাই মোদীর পরে বক্তৃতা করতে উঠে অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘কে বড় নেতা।’ বললেন, “ষাট বছর ধরে সক্রিয় রাজনীতি করছি।” শুধু তা-ই নয়, যে চিমনভাই শুক্লকে ‘অস্ত্র’ করে আডবাণীর দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনকে কিছুটা খাটো করতে চেয়েছিলেন মোদী, সেই চিমনভাইকেই পাল্টা ‘অস্ত্র’ করে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীকে বধ করলেন তিনি। বললেন, “এই চিমনভাইয়ের অনশন ভাঙ্গতে আমিই গিয়েছিলাম। কিন্তু এত বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও আমি সামান্য দলের কর্মী হিসেবে এখানে এসেছি। এই গুজরাত থেকেই অনেক শিক্ষা পেয়েছি আমি।”
এই গুজরাত থেকেই এ বারের রথযাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কথায় কথায় পরোক্ষে সে কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন আডবাণী। সুকৌশলে টেনে আনলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের প্রসঙ্গও। যে নীতীশ কুমার কোনও অবস্থাতেই মোদীর নেতৃত্ব মানতে রাজি নন, আজ তাঁর সমর্থন নিয়েই আডবাণী গুজরাতে পা রেখেছেন। আডবাণী বলেন, “এই গুজরাত থেকেই আমার প্রথম রথযাত্রা শুরু হয়েছিল। বিহারের সঙ্গে গুজরাতের তুলনা অবশ্য হয় না। কিন্তু নীতীশ কুমার রেলমন্ত্রী থাকার সময় গুজরাতের কথা ভেবেছিলেন।” বিজেপি নেতাদের অনেকে একান্তে বলছেন, এক সময় এই আডবাণীই ছিলেন মোদীর ‘রাজনৈতিক গুরু’। কিন্তু বিজেপিতে এখন যে ভাবে নেতৃত্বের দৌড় শুরু হয়েছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার হিসেবে এই ‘গুরু-শিষ্যের’ শীতল যুদ্ধ তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। বরং বেশ ‘রোমাঞ্চকর’। আডবাণীর সফরসঙ্গী এক নেতা তো কিছুটা রসিকতার সুরেই বললেন, “মোদী গুজরাতের ‘হিরো’। তবে গুজরাতের বাইরে তাঁর প্রভাব এখনও পরীক্ষিত নয়। তার মধ্যে সম্প্রতি নিজেকে দলের ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে গিয়ে সঙ্ঘের কোপে পড়েছেন। অন্য দিকে আডবাণীকে আরএসএস প্রধানমন্ত্রীর দৌড় থেকে বাদ রাখতে চাইলেও এই রথযাত্রার মাধ্যমে ফের মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছেন তিনি। ফলে আজ দু’জনে যখন এক মঞ্চে এলেন, তখন তাঁদের এই ঠান্ডা লড়াই দেখার অভিজ্ঞতাও সুখকর।” আর এই দুই নেতার জাঁতাকলে পড়ে এক অদ্ভুত অবস্থা আডবাণীর রথের সারথি অনন্ত কুমার, রবিশঙ্কর প্রসাদদের। গোটা যাত্রায় তাঁরা আডবাণীরই জয়গান করে এসেছেন। কিন্তু গুজরাতে এসে তাঁদের সমান ভাবে মোদীরও জয়ধ্বনি দিতে হচ্ছে! স্বয়ং আডবাণী তো বটেই, অনন্ত কুমার-রবিশঙ্কররাও ‘গুজরাত মডেলে’র প্রসঙ্গ তুলে মোদীর তুমুল প্রশংসা করে গেলেন। তবে পরক্ষণেই ঘরোয়া স্তরে দাবি করছেন, “আমরা মোদীর ‘গুজরাত মডেলে’র আদলে দেশ গড়ার কথা বলছি মাত্র। কখনওই বলছি না, মোদীকে তার জন্য প্রধানমন্ত্রী করতে হবে।” |