মধুরেণ সমাপয়েতে এ বার নিশ্চিন্ত প্রণব
কাল বাদে পরশু ভোট গ্রহণ। তার আগে আজ দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমোচ্ছিলেন। বিকেলে মহাকরণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সমর্থনের কথা ঘোষণা করছেন, ইউপিএ-র রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী তখনও দিবানিদ্রায়! তবে কি তৃণমূলের সমর্থনের সম্ভাবনা নিয়ে এতটাই নিশ্চিন্ত ছিলেন প্রণববাবু!
গত পরশু প্রথম ইঙ্গিতটা এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিক থেকেই! সমর্থনের অনুরোধ জানিয়ে প্রণববাবুর অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সচিব প্রদ্যোৎ গুহ সেদিনও একটি এসএমএস পাঠিয়েছিলেন মমতাকে। জবাবে ছোট্ট উত্তর টেক্সট করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী, “ডোন্ট ওরি!” উৎসাহী প্রদ্যোৎ তখনই প্রণববাবুকে সে খবর দেন। বহু দিনের পোড় খাওয়া রাজনীতিক, কীর্ণাহারের এই ব্রাহ্মণ তবু সতর্ক ছিলেন। মনে আশা জাগলেও মুখ ফুটে সে সম্ভাবনার কথা কাউকে বলেননি। বরং ভাল-মন্দ দু’দিকেরই অঙ্ক কষে চলছিলেন।
আজ ঘুম ভাঙল কলকাতা থেকে আসা একটা ফোনে। খবরটা জানার পর শুধু বললেন, “ওঁর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি।” যদিও মমতার ঘোষণার পর দৃশ্যতই স্বস্তিতে তিনি। তাই দেরি না করে সন্ধ্যায় মমতাকে ফোনটাও করে ফেললেন। বললেন, “তোর সঙ্গে কথা বলেই কলকাতায় যাব।”
প্রণববাবুর ভোটের অঙ্ক
মোট ভোট১০,৯৮,৮৮২
তৃণমূল (ভোট ৪৮,০৪৯) সমর্থন জানানোয় তাঁর ৭,১৭,৭৯৬টি ভোট পাওয়া কার্যত নিশ্চিত।
৭৭৬ জন সাংসদের মধ্যে ৫২৭ জনের ভোট পাওয়ার আশা করছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।
এ ছাড়াও ছোট কিছু দলের ৩১,৯২৭ ভোটের অর্ধেক পাওয়ার আশা করছেন প্রণববাবু।
প্রণববাবুর হিসাবে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পূর্ণ আজিটক সাংমা পেতে পারেন ৩,১২,৭৮৭ টি ভোট।
প্রণববাবু যেমন মমতাকে ফোন করেছেন, তেমনই মমতা আজ তাঁর সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে জানিয়ে দেওয়ার পর তাঁকে এসএমএস করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সনিয়া গাঁধীও। কাল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সম্মানে ইউপিএ-র শরিক ও সমর্থক দলের সাংসদদের মধ্যাহ্নভোজে ডেকেছেন সনিয়া। তৃণমূল সাংসদরা সেখানে যাবেন কি না, এখনও অনিশ্চিত। তবে ২৩ জুলাই হায়দরাবাদ হাউসে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিলের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে উপস্থিত থাকার জন্য আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম।
তৃণমূলের আজকের ঘোষণার পর কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের তরফে দলের নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে তৃণমূল সম্পর্কে কোনও তির্যক মন্তব্য যেন না করা হয়। দলের এক শীর্ষ নেতার কথায়, “আসলে সনিয়া-মনমোহন-প্রণবের মনে গোড়া থেকেই একটা অস্বস্তি ছিল যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য কি শেষমেশ ইউপিএ ভেঙে যাবে!” এক মাস ধরে তাই কংগ্রেস নেতৃত্ব বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বার্তা দিয়েছেন। প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রচারে বেরিয়ে রোজ এক বার করে সমর্থনের আবেদন জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে। কখনও প্রধানমন্ত্রী নিজে সমর্থনের আবেদন জানিয়েছেন, কখনও সনিয়ার রাজনৈতিক সচিব অহমেদ পটেল ফোন করেছেন মমতাকে। ধৈর্য ধরে থেকেছে কংগ্রেস। কেননা তাদের কাছে একটা বিষয় স্পষ্ট ছিল কংগ্রেস-মমতা সংঘাতের বাতাবরণে জাতীয় স্তরে আখেরে লাভবান হবে বিজেপি।
২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে কংগ্রেসের লড়াই তো তৃণমূলের বিরুদ্ধে নয়। বরং বিজেপি-র বিরুদ্ধে। তা ছাড়া তৃণমূল ইউপিএ থেকে বেরিয়ে গেলে মুলায়ম সিংহের উপর কংগ্রেসের নির্ভরতা নিঃসন্দেহে বাড়বে। তুলনায় মমতা-মুলায়মকে একই সঙ্গে ইউপিএ-তে রাখতে পারলে জোটে ভারসাম্য থাকবে। হতাশ করা যাবে বিজেপিকে। তাই মমতাকে বোঝানো ও রাজি করানোর জন্য কংগ্রেসের তরফে ষোলো আনা তৎপরতা ছিল।
আবার মমতার সীমাবদ্ধতার দিকটাও আঁচ করতে পারছিল কংগ্রেস। দশ জনপথ-ঘনিষ্ঠ কংগ্রেসের এক শীর্ষ নেতার কথায়, মমতা যে বিজেপি তথা এনডিএ-র সঙ্গে আঁতাঁত করবেন না, তা জলের মতোই পরিষ্কার ছিল। কারণ তাতে তাঁর কষ্টার্জিত সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয়ত লোকসভা ভোটের এখনও দু’বছর বাকি। তার আগে এখন থেকেই কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া মমতার পক্ষে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা হতো না। বরং ইউপিএ-তে থাকলে রাজ্যের উন্নয়নের জন্য আর্থিক সাহায্য পেতে পারে তাঁর সরকার। সেই বার্তা রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের সঙ্গে বৈঠকেও দিয়েছিলেন প্রণববাবু।
সর্বোপরি স্বাধীনতার পর গত ষাট বছরে এই প্রথম কোনও বাঙালি রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন। ফলে বাঙালি আবেগকেও উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। প্রণববাবুকে সমর্থন জানিয়ে সিপিএম যাতে সেই আবেগের ফায়দা একা নিতে না পারে, সেটাও মমতা সুনিশ্চিত করতে চাইবেন বলে মনে করছিলেন কংগ্রেস নেতারা। এমনকী এই মর্মে সনিয়ার কাছে একটি রিপোর্টও দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য শাকিল অহমেদ। শুধু তাই নয়, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মতে, কংগ্রেস নেতাদের তৃণমূল-বিরোধী আক্রমণও আজ ভোঁতা করে দিয়েছেন মমতা। এমন একটা সময়ে মমতা সমর্থনের কথা ঘোষণা করলেন, যখন রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা সনিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এসেছেন। মমতার ঘোষণার পর তাই বহরমপুরের কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরীকেও বলতে হয়েছে, “এতে দিল্লিতে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট মজবুত হবে।” ইউপিএ-র এই ঐক্যের ছবি আজ স্পষ্ট হতেই সন্ধেয় পেন-খাতা নিয়ে ফের বসে পড়েন প্রণববাবু। গত কাল পর্যন্ত তৃণমূলের ৪৮ হাজার ভোট বাদ দিয়েই হিসেব করেছিলেন। আজ তৃণমূলের ভোট যোগ করে তিনিও রীতিমতো উৎসাহিত। সাম্প্রতিক কালের রাষ্ট্রপতি ভোটে সব নজির ছাড়িয়ে যাবে তাঁর প্রাপ্ত ভোট, এমনই আশা করছেন তিনি। তাঁর এই হিসেবনিকেশের মধ্যেই কংগ্রেস ও অন্য শরিক নেতাদের শুভেচ্ছা ফোন আসা শুরু হল তাঁর কাছে। সংসদের সেন্ট্রাল হলে বসে কফি খেতে খেতে খবরটা শুনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন অজিত জোগী। রাষ্ট্রপতি ভোটে কংগ্রেসের তরফে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রাজীব শুক্লও এলেন। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “কী দাদা! বলছিলাম না! শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমর্থন জানাবেন! মধুরেণ সমাপয়েৎ হল তো!”


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.