রবিবাসরীয় প্রবন্ধ ২...
জাস্ট যাচ্ছি
নেক ক্ষণ অপেক্ষা করলাম শেষ রাতের হ্যালোজেন ফগ্-এ। ফরফর আওয়াজ করে পর পর অটো যাচ্ছিল, দেখা যাচ্ছিল না। বুঝতে পারছিলাম আরও অনেকে চলেছে, কথাবার্তা কানে আসছিল, এক সময় এগিয়ে এল ভারী পায়ের শব্দ। দেখি নীল কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাতি আসছে। কেউ জিজ্ঞেস করল, ‘পত্রকার?’ আমি বললাম, ‘শোনপুর’।
আগুন জ্বলছে ইতিউতি। জড়সড়, কম্বল মুড়ি দেওয়া লোকজন। কোথাও একটা সূর্য উঠেছে নিশ্চয়ই। চায়ের দোকান খুলেছে। ঠেকুয়া তৈরি হচ্ছে। বসলাম। কোনও তাড়া নেই। আর একটা হাতি আসছে। তাড়াহুড়ো করে সবাই চলে গেল ব্রিজের দিকে। ও পারে শোনপুর। কিছু দূরে আর একটা ব্রিজ। ট্রেন আসছে, হর্ন বাজল, ঘুম ভেঙে গেল সর্বাঙ্গে মুড়ি দেওয়া বাচ্চার। চলন্ত মায়ের কোল থেকে বড় বড় চোখ করে সে দেখতে লাগল আমাকে। আমি দেখছিলাম ব্রিজের নীচের দিকের নদীর পাড়টা। হাতি নেমেছে সেখানে, চান করানো হচ্ছে, ছোট্ট লেজ থেকে গয়না পরানো দাঁত অবধি ঘষে দিচ্ছে দুজন লোক। কান নেড়ে, জলে পা মুড়ে বসে, কখনও হঠাৎ উঠে পড়ে হাতিও নানা রকম দুষ্টুমি করছে। ভিজে কাপড় সামলে মেয়ে বুড়িরা জল থেকে দেখছে সব, হাসাহাসি চলছে। পাড়েও প্রচুর দর্শক। নৌকো ভাসছে আশেপাশে, তার ওপর লেন্স তাক করে বসে আছে সেয়ানা সাহেব।
হইহই আওয়াজ উঠল। এ বার হাতি উঠছে জল থেকে। মাথায় বসে মাহুত উসকোচ্ছে এগোনোর জন্য। চারপাশে ঠাসা ভিড়। লোক সরছে না। অসহিষ্ণু হাতি হঠাৎ স্পিড বাড়াল বালিমাটির ঢালে। কে কোথায় ছিটকে পড়ল, কে বেআবরু হয়ে গেল দেখার দরকার নেই। ভিড়কে দু’ফালা করে সে নির্বিকার ভাবে উঠে গেল ওপরে। নীচে আবার ফাঁকা জায়গা ভরে গেল মানুষে। হাতি যে দিকে চলে গেল সে দিকে প্রচুর গাছপালা, ডাল থেকে ডালে কাপড় মেলা হয়ে গেছে। তার ফাঁক-ফোকর দিয়ে দেখতে পাচ্ছি শোনপুরের মেলার বিশাল হিউম্যানস্কেপ। মাঠের মধ্যে বহু লোক রাত কাটিয়ে এখন রোদ পোহাচ্ছে বসে বসে। এই বসাটা উবু হয়ে, ঠিক আমাদের মতো নয়।
নদীর পাড় ছেড়ে কিছুটা দূর গিয়ে রাস্তা ঘুরে এসে আবার পড়েছে নদীর ধারে। সেখানে সারি সারি তাঁবু। মোটা ক্যানভাসের তৈরি, দড়ি দিয়ে টানটান করে বাঁধা। মালিকরা ফোল্ডিং চেয়ার পেতে বসে আছে সামনে, হিন্দি খবরের কাগজ পড়ছে। পাশে বন্দুক, চকচক করছে নল। আমাকে দেখে এক জন ইশারা করলেন বসার জন্য। দুধ এল বড় কাচের গ্লাসে। বললাম, ‘কলকাতা’।
ছবি: শুভময় মিত্র।
সামনের জমিটা ভরে রয়েছে ঘাস, কাটা খড় জাতীয় জিনিসে। তার মধ্যে পর পর দাঁড়িয়ে আছে হাতিরা। সমানে মাথা নাড়ছে, এ দিক ও দিক দেখছে, শুঁড় পাকাচ্ছে, লেজ দোলাচ্ছে। ভারী খড়মড় শব্দ হচ্ছে কারণ পাগুলো মোটা চেন দিয়ে বাঁধা। অনেকের সঙ্গে ছোটরাও রয়েছে, তাদের ছটফটানি বেশি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত হাতি বিক্রি হয়ে যায়?’ উত্তর এল একটু পরে, ‘হাতি কিনতে দম লাগে।’ ‘কত দাম?’ ‘পাঁচ লাখ, সাত লাখ, দামটা বড় কথা নয়।’ ‘আর বাচ্চা হাতি?’ ‘ওই একই দাম।’ ‘কেন?’ ‘আরে ওরাও তো বড় হবে।’ উত্তরগুলো আসছিল খবরের কাগজের পিছন দিক থেকে। আমার দুধ খাওয়া শেষ হতেই বিশাল কাঁসার থালায় শুকনো মিষ্টি এল। খেতে হবে। বললাম ‘হাতি কেনে কে? মানে, কিনে লাভ কী?’ খবরের কাগজ রেখে দিয়ে খুব তাচ্ছিল্য ভরে মালিক বললেন, ‘লাভ? লাভই লাভ। ইজ্জতের ব্যাপার। হাতি কি গাড়ি টানবে নাকি? চাষ করবে? হাতি দাঁড়িয়ে থাকবে দরজায়। তোমার গাড়ি আছে? আছে, কেউ ইজ্জত করে তোমায়? করে না। তুমি হাতি রাখো, লোকজন তোমাকে রেয়াত করবে।’ এর পর তো আর কোনও কথা হয় না। হাত তুলে নমস্কার করে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘একটু ঘুরে দেখি মেলাটা—।’ ‘হাঁ হাঁ, কোনও চিন্তা নেই। যাও, যাও, রাতে আমার কাছে খেয়ে নেবে, এখানেই শুয়ে পড়বে।’ হাজিপুরের একটা নোংরা হোটেলে আমি যে ঘর ভাড়া নিয়েছি সেটা আর বলার সাহস হল না।
সারা দিন মেলায় ঘুরলাম। এক প্রান্তে গরু মোষ ছাগল। এক দিকে কিছু উট। একটা রাস্তার দু’পাশে সারি দেওয়া প্রচুর লোক। দাঁড়িয়ে পড়লাম। হর্স শো হচ্ছে। উন্মত্তের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সওয়ারিরা। কেউ কেউ চলন্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়ছে ঘোড়ার ওপরেই। সঙ্গে সঙ্গে হইহই আওয়াজ উঠছে দর্শকদের মধ্যে থেকে। ঘোড়দৌড়ের রাস্তায় হঠাৎ ঢুকে পড়েছিল এক বুড়ি। বোধ হয় রাস্তা পেরোতে চাইছিল। ছুটে আসা ঘোড়ার সামনে পড়ে গেল সে। ছিটকে পড়ল এক পাশে। ভিড় জমে গেল সেখানে। বোধবুদ্ধিহীনতার কুফল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল।
আঘাত বোঝা যাচ্ছে না। রক্তেরও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না, প্রাণেও বেঁচে আছে। এমনিতেই ভাঙাচোরা, দোমড়ানো-মোচড়ানো শরীরটাকে নিয়ে সে পড়ে আছে। হাতের লাঠিটা ছাড়েনি। কেউ কেউ ময়লা দশ টাকা, বিশ টাকার নোটও দিচ্ছিল। ভাবখানা হল, সেই টাকা দিয়ে বুড়ি চিকিৎসা করিয়ে নিতে পারে। নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে আর কখনও এ রকম না করলেই হল। পুরুষরা আবার ঘোড়দৌড় দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দু-এক জন মহিলা বসে বসে বুড়িকে নিরীক্ষণ করতে লাগল আর ভাবলেশহীন মুখে এ কথা-সে কথা বলতে লাগল। হিন্দি ভাল বুঝি না, এখানকার ভাষাটা আরওই আলাদা। তবু কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, সে এসেছিল তার মেয়েকে নিয়ে। জামাইও ছিল। কিন্তু তারা কোথায় চলে গিয়েছে সেটা জানে না। বাড়ি দ্বারভাঙ্গায়। দু’দিন ধরে ওদের খুঁজেও পাওয়া যায়নি। মনে মনে ভাবছিলাম খোলা আকাশের নীচে সে কাটাল কী করে! খাবারই বা পেল কোথায়? সঙ্গে টাকা আছে বলে মনেও হল না। এক জন একটা কম্বল দিল বুড়িকে। চাপা-ই দিয়ে দিল। কিন্তু বুড়ির কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না। সে জড়সড় হয়ে বসেই রইল এক জায়গায়। একটু একটু কাঁপছিল যেন। সবার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল যে এ রকম ফালতু ব্যাপার না ঘটলেই ভাল হয়। কিন্তু ঘটে যখন গেছেই, তাকে কম্বল চাপা দিয়ে দেওয়াই ভাল। এক জন স্বগতোক্তির মতো করে জানাল— ওদের কোনও দিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না। বেকার শাশুড়িকে নিয়ে চলাও মুশকিল। পুরনো বউকে পোষাও অসুবিধের, বিশেষ করে বাচ্চা না থাকলে। বরং তাকে বেচে দিলে কিছু টাকা পাওয়া যায়, নগদ। নিশ্চয়ই সে রকমই কিছু হয়েছে। এই ভয়ংকর কল্পনার ছবিটা নিশ্চিন্তে উগরে দিয়ে হাসল লোকটা। কেউ কিছু বলল না। বিকেলে মেলা ছাড়িয়ে চলে এসেছিলাম চওড়া, একটু ফাঁকা নদীর চরে। হনুমানের মন্দিরে খুব ভিড়। জরি লাগানো কাপড় বিক্রি হচ্ছে। কমলা লুঙ্গি পরা ফরসা পুরোহিত জাঁকিয়ে বসেছে। নৌকো বোঝাই লোক আসছে উলটো পার থেকে। ফেলে দেওয়া মাটির সরা, ফুল-পাতা ছড়িয়ে আছে এ-দিক ও-দিক। চড়া গোলাপি শাড়ি পরা ঘোমটা দেওয়া একটা মেয়ে খুব মন দিয়ে পা ধুচ্ছে, পায়ের পাতার ওপরে জড়ানো রুপোর মল, চকচক করছে বিকেলের রোদে।
মোটরবাইক নিয়ে মরণফাঁদের খেলা, মুন্ডু কাটা ম্যাজিক, নৌটংকি নাচের ঠেকের দিকে এগোলাম না। গুটগুট করে ফিরে এলাম হাতিদের কাছে। গাছে গাছে স্পটলাইট লাগানো। তাই বড় বড় ছায়া পড়েছে মাটিতে। বাচ্চা হাতি মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, ছটফটানি কম। দেহাতি গানের সঙ্গে নানা রকম ঘোষণার শব্দ ভেসে আসছে কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার আস্তরণ ভেদ করে।
‘ক্যায়সা লগা শোনপুর কা মেলা?’ বন্দুকটা এখন কোলের ওপরে। চকচক করছে নলটা। চোখটাও। বুড়ির ব্যাপারটা বললাম। তার মেয়ের ব্যাপারটাও, যা শুনেছি সেটাই। আমার কথার গুরুত্ব না দিয়ে অর্ডার হল, ‘পত্রকারজিকে লিয়ে বড়িয়া চায়ে লাও, অউর সমোসা, মিঠাই ভি।’ আপত্তির প্রশ্ন উঠছে না, একটু খিদেও পেয়েছিল। রাতে থাকব না সেটাও মিঠে করে বলব এ বারে। বললাম, ‘যদি কিছু মনে না করেন, জিজ্ঞেস করছি, সত্যি বিক্রি হয়?’ ‘ক্যা, লড়কি?’ মাথা নাড়লাম। হাতিদের দিকে অনেক ক্ষণ তাকিয়ে আস্তে আস্তে কাটা কাটা গলায় বললেন, ‘সব কুছ বিক্তা হ্যায় মেলা মে। আপ কা ডিসকভারি চ্যানেল মে দেখা নেহি ক্যা?’ মরিয়া হয়ে বললাম, ‘ইজ্জতের ব্যাপারটা—’ ‘কীসের ইজ্জত? যা বিক্রি হওয়ার তা তো হবেই। গাঁও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, দেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কেন, তুমি জানো না নাকি? মজফ্ফরপুরের লড়কি কলকাতায় যায় তো, চেহারা দেখে বুঝবে না যদিও। তবে ভাল করে দেখলে নেপালের লড়কি আর এখানকার অউরতের তফাত হবে জরুর। কোন ইজ্জত, কার ইজ্জতের কথা বলছ রিপোর্টারবাবু? হাতি কেনো বা লড়কি, তাকে রাখতে জানতে হয়, এর জন্য ধক লাগে, তোমাদের মতো বেশি পড়া-লিখা জানা বাবুরা এটা বুঝেও বুঝতে চাও না। নাও, চা খাও।’


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.