তৎপর কেন্দ্র, তবু অনড় অশোক
ত দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাঁর পদত্যাগ চেয়ে সংসদের ভিতরে-বাইরে সরব হয়েছে। এ বার আরও এক ধাপ এগিয়ে রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান তথা সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করল কেন্দ্র। বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের অপসারণ চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতিকে যে দু’টি চিঠি লিখেছেন, তা রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আবার চিঠি দু’টি কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রকের কাছে পাঠিয়ে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় সে ব্যাপারে তাদের পরামর্শ চেয়েছে।
এমতাবস্থাতেও কিন্তু নিজের অবস্থানে অটল রয়েছেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ঘনিষ্ঠ মহলে ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি। অশোকবাবুর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ইন্টার্নের বয়ান যে ভাবে প্রকাশ্যে এসেছে, তা নিয়ে সোমবার সরব হয়েছিলেন আইনি পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। মঙ্গলবার বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় নিজে এ ব্যাপারে মুখ খুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, “অভিযোগকারিণী হলফনামা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছিলেন, তাঁর বয়ান গোপন থাকবে। তা হলে সেই বয়ান প্রকাশ্যে এল কী ভাবে?”
অসুস্থ থাকায় এ দিন ভবানী ভবনে রাজ্য মানবধিকার কমিশনের কার্যালয়ে যাননি বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। বাড়ি থেকেই ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ঠিক করেছেন। তবে এ দিনও তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ভবানী ভবনের গেটে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন একটি সংগঠনের সদস্যেরা। বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহল অবশ্য বলছে, তিনি এ সব কিছুই গায়ে মাখছেন না। পাল্টা আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রাজনৈতিক দলগুলি একযোগে তাঁর পদত্যাগ দাবি করলেও আইনজীবী মহলের একটা বড় অংশ কিন্তু গোড়া থেকেই বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের পাশে রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বলে একাধিক বার মন্তব্য করেছিলেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। মঙ্গলবার কলকাতা হাইকোর্টের কয়েক জন আইনজীবী সাংবাদিক সম্মেলন করে সেই একই অভিযোগ তুলেছেন।
আইনজীবী মিলন মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি হিসেবে অশোক গঙ্গোপাধ্যায় টু জি-সহ বিভিন্ন মামলায় এমন কিছু রায় দিয়েছিলেন, যাতে কেন্দ্রীয় সরকার ও কিছু রাজনৈতিক দল বিপদে পড়েছে। তারাই বর্তমান পরিস্থিতিকে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছেন। অভিযোগকারিণীর হলফনামার প্রতিলিপি যে ভাবে বাইরে চলে এল এবং তা গণমাধ্যমের হাতে গেল, তাতে চক্রান্তের তত্ত্বই উঠে আসছে বলে মিলনবাবুর দাবি।
আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্যও বলেন, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে ঘটা গোটা ঘটনা লক্ষ করলেই বোঝা যায়, তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে। অশোকবাবু তাঁর বক্তব্য বলার কোনও সুযোগ পাননি। ওই সাংবাদিক সম্মেলনে আরও বেশ কয়েক জন আইনজীবী হাজির ছিলেন। তাঁদের সকলের হয়ে বক্তব্য পেশ করেন মিলনবাবু ও বিকাশবাবু।
রাজধানী দিল্লির চিত্রটি আবার পুরোপুরি উল্টো। বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার সারা দিন ধরে বিভিন্ন দল সরব হয়েছে। তাতে সামিল হয়েছে সমাজবাদী পার্টি, জেডিইউ-র মতো আঞ্চলিক দলগুলি। নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও। এবং এই গোটা ঘটনাক্রমে খুশি তৃণমূল নেতৃত্ব। দল মনে করছে, কোনও মহিলা যখন অবাঞ্ছিত আচরণের অভিযোগ এনেছেন, তখন দিল্লি পুলিশ চাইলে আগেই তদন্ত শুরু করতে পারত। যেমনটি করা হয়েছে সাংবাদিক তরুণ তেজপালের বিরুদ্ধে। দ্রুত তদন্ত শুরুর দাবি জানিয়ে এ দিন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী কপিল সিব্বলের সঙ্গে কথা বলেন তৃণমূলের সাংসদরা।
তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এ দিন রাজ্যসভায় বলেন, “ক্ষমতার শীর্ষে রয়েছেন, এমন এক জন ব্যক্তি ক্ষমতা প্রয়োগ করে নির্যাতিতার মুখ বন্ধ করতে চাইছেন। তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত। না হলে তাঁকে গ্রেফতার করা হোক অথবা রাষ্ট্রপতি তাঁকে বরখাস্ত করুন।” তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের খবর, যে হেতু অভিযোগটির সঙ্গে প্রাক্তন বিচারপতির নাম জড়িয়ে রয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার একাংশ তাঁর পক্ষে সহানুভূতিশীল, সে হেতু তদন্ত শুরু করার আগে সব দিক খতিয়ে দেখেই পা ফেলতে চাইছে দিল্লি পুলিশ। এ দিন রাজ্যসভায় লোকপাল বিল নিয়ে আলোচনাতেও উঠে এসেছে অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ। বিজেপি-সহ একাধিক দলের প্রশ্ন ছিল, আইন আনুযায়ী বলা হচ্ছে, লোকপালের শীর্ষে থাকবেন কোনও প্রাক্তন বিচারপতি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে যদি কোনও অভিযোগ ওঠে, সে ক্ষেত্রে তাঁকে সরানোর প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে সরকার স্পষ্ট দিশা দেখাক। তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় পরে বলেন, “প্রাক্তন বিচারপতিরা যে যাবতীয় অভিযোগের ঊর্ধ্বে নন, তা পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা থেকেই স্পষ্ট।” সপা সাংসদ রামগোপাল যাদবও বলেন, “কী ধরনের বিচারপতিরা এখন রয়েছেন, তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি!” তবে সংসদে ওঠা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অশোকবাবুর মন্তব্য, “সংসদে কী হচ্ছে তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করেছে জাতীয় মহিলা কমিশনও। সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সামনে আসার পরই গত ৬ ডিসেম্বর তাঁকে অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলে চিঠি দেয় মহিলা কমিশন। কমিশনের সদস্য নির্মলা সম্রাট প্রভালকর এ দিন বলেন, “অশোকবাবু তাঁর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে অতিরিক্ত চার সপ্তাহ সময় চেয়েছেন। আমরা তা মেনে নিয়েছি।”

পুরনো খবর:



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.