একটি অন্য ‘ছেলে’ ও তাঁর মা-বাবার কাহিনি
তাঁদের একমাত্র সন্তান সমকামী। সর্বসমক্ষে তা স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই প্রবীণ দম্পতির। নেই তার জন্য কোনও আত্মবিলাপ বা অনুশোচনাও। বরং যৌন-পছন্দের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে চার বছর আগেই তাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন সন্তানের পাশে, অংশ নিয়েছিলেন সমকামীদের আইনি লড়াইয়ে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পর ভেঙে পড়েছেন আশি পার করা প্রবীণ-প্রবীণা। উদ্বিগ্ন হয়ে বলছেন, “হেরে গেলাম। আর বোধহয় ছেলে-মেয়েগুলোর স্বস্তি দেখে যেতে পারব না। শুধু দেখব, নিজের মতো বাঁচতে না পেরে গুমরে-গুমরে শেষ হয়ে যাচ্ছে ওরা।”
সমকাম অপরাধ নয় বলে দিল্লি হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল, তা সুপ্রিম কোর্টে বহাল রাখার অনুরোধ জানিয়ে ২০০৯ সালে শীর্ষ আদালতে আবেদন দাখিল করেছিলেন দেশের ১৯ জন বাবা-মা। তাঁদের প্রত্যেকের ছেলে বা মেয়ে সমকামী অথবা রূপান্তরকামী। এঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ছিলেন প্রমথনাথ রায়চৌধুরী এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মী রায়চৌধুরী। তাঁরা ছিলেন যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ নম্বর আবেদনকারী। তাঁদের ছেলে অনীশ রায়চৌধুরী সমকামী। থাকেন কলকাতারই সন্তোষপুরে।
মা-বাবার সঙ্গে অনীশ। —নিজস্ব চিত্র।
গত ১১ ডিসেম্বর শীর্ষ আদালত রায় দিয়ে জানিয়েছে, সমকামীদের ব্যাপারে আইন সংশোধনের কথা ভাবতে পারে আইনসভা। যত দিন তা না হচ্ছে, তত দিন পুরনো ৩৭৭ ধারা বলবৎ থাকল। এতে দিশাহারা প্রমথনাথ ও বিজয়লক্ষ্মী। প্রতি মুহূর্তে তাঁরা এখন আশঙ্কিত, ছেলের কোনও ক্ষতি হবে না তো? আইনের ধুয়ো তুলে তাঁর যৌন আচরণকে ‘অপরাধ’ বলে চিহ্নিত করে যখন-তখন হেনস্থা বা অপমান করবে না তো পুলিশ-প্রশাসন বা সমাজ? ৮৩ বছর এবং ৮০ বছরের এই দুই প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রশ্ন, “কারও যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে রাষ্ট্র কেন নাক গলাবে? কেন এ ব্যাপারে সুস্থ আইন তৈরি করতে এতটা গড়িমসি করবে সরকার? জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে যে দেশে সমানাধিকার স্বীকৃত, সেখানে যৌন অধিকারেও তা থাকা দরকার।”
নিজের বাড়িতে অসুস্থ মা-বাবার মাঝখানে বসে কথা বলতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই গলা বুজে আসছিল বছর বিয়াল্লিশের অনীশের। চিরকাল তুখোড় পড়াশোনায়। ব্যবসা সামলাচ্ছেন একই রকম দক্ষতায়। বলছিলেন, “একত্রিশ বছর বয়সে প্রথম ছাদে বসে মা-কে বলেছিলাম আমার সমকামী হওয়ার কথা। চরম আশঙ্কা ছিল যে, বাবা-মা ভেঙে পড়বেন। তাঁরা সমাজের চিরন্তন ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। তবু আমি লুকোতে চাইনি। তাঁরা ভেঙেও পড়েছিলেন। কিন্তু তার পরে এত দ্রুত আমার যৌনপছন্দকে সম্মান দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন যে, আমিই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।”
২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনের পাশাপাশি একটি হলফনামাও দাখিল করেছিলেন বিজয়লক্ষ্মীদেবী। তাতে তিনি লিখেছিলেন ‘হ্যাঁ, আমার ছেলে সমকামী। কিন্তু আমার ছেলের সততা ও নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত। এবং আমি বিশ্বাস করি, সে সমাজের পক্ষে কোনও দিক দিয়েই ক্ষতিকর নয়। আমি ও আমার স্বামী বিশ্বাস করি, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিজের যৌনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার থাকতে পারে, যদি না তা কোনও ভাবে অন্যের পক্ষে ক্ষতিকর হয়।”
প্রমথনাথ ও বিজয়লক্ষ্মী এখনও কোথায় যেন আশায় বুক বাঁধছেন যে, দিন বদলাবে। গণতান্ত্রিক দেশের সরকার এত সহজে অগ্রাহ্য করতে পারবে না এতগুলো ছেলেমেয়ের অধিকারের দাবিকে। অনীশের হাতটা ধরে বিজয়লক্ষ্মী বলেন, “আমি আমার ছেলের অনেক বন্ধু-পরিচিতকে দেখেছি। শুধু সমকামী হওয়ার জন্য তাঁদের ঘরে-বাইরে কী পরিমাণ নির্যাতন ও হিংসার শিকার হতে হয়েছে! কত যন্ত্রণা পেয়েছে। বাবা-মা যদি সন্তানের ন্যায্য ইচ্ছায় নীতিগত সমর্থন না জানায়, তা হলে আর কে জোগাবে? তাই আমরা সুপ্রিম কোর্টের আবেদনে শরিক হয়েছিলাম।” অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন প্রমথনাথবাবু। শেষে বললেন, “সামাজিক ধারণা বদলায়। ভিন্ন জাতে বিয়ে এক সময়ে স্বীকৃত ছিল না, এখন আকছার হয়। নারীর অধিকার আগে স্বীকৃত ছিল না, এখন হয়েছে। নিজের মতো করে যৌন-আচারের অধিকারও স্বীকৃত হবে, তবে আশি পার করা আমাদের মতো বাবা-মায়েরা সন্তানের জন্য সে দিন দেখে যেতে পারব কি না জানি না।”
 
 
 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.