বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
প্রযুক্তির ক্ষমতায় না হোক, খরচ আর সময়ের গতিতে নাসাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে ইসরো! মঙ্গলযানের সফল উৎক্ষেপণের পরে ইসরোর কয়েক জন বিজ্ঞানীর এমনটাই দাবি।
মঙ্গলের মাটিতে নাসা যে কিউরিওসিটি রোভার পাঠিয়েছে, তার খরচ বিপুল। প্রায় ১৪৩৫ কোটি ডলার। তার সঙ্গে মঙ্গলযানের তুলনা চলে না। ভারতের মঙ্গলযান মঙ্গলের কক্ষপথে চক্কর কাটবে। তার জন্য ইসরোর খরচ হচ্ছে ৬৯ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা)। ঘটনা হল, আর ১৩ দিন পর নাসা ‘মাভেন’ নামে আরও একটি যান পাঠাচ্ছে মঙ্গলে। সেটিও মঙ্গলের কক্ষপথেই ঘুরবে। মাভেন অভিযানে নাসার খরচ পড়ছে ৬৭১ মিলিয়ন ডলার! এখানেই ভারত টেক্কা দিয়েছে বলে ইসরোর দাবি। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স-এর বিজ্ঞানী সুজন সেনগুপ্ত এবং নাসার বিজ্ঞানী অমিতাভ ঘোষও মানছেন, ইসরোর মঙ্গল অভিযানের খরচ এ ধরনের অন্যান্য অভিযানের তুলনায় অনেক কম।
‘মাভেন’ তৈরি করতে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ইঞ্জিনিয়ারেরা নিয়েছেন পাঁচ বছর। ইসরোর মঙ্গলযান নির্মাণে লেগেছে ১৫ মাস। তবে নাসার তুলনায় তাঁদের যান যে কিছুটা কম ক্ষমতা সম্পন্ন, তা-ও অবশ্য মেনে নিয়েছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা।
বস্তুত, চিনকে টেক্কা দিতেই ভারত ‘সস্তায় বাজিমাত’ করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেছে চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম। চিনা বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র হং লেই বলেছেন, “মহাকাশ মানবজাতির সম্পত্তি। শান্তিপূর্ণ ও উন্নয়নমূলক অভিযান চালানোর অধিকার সব দেশেরই আছে। আন্তর্জাতিক মহলের উচিত এ ব্যাপারে সম্মিলিত ভাবে সক্রিয় হওয়া।”
দেশ অভিযান নির্মাণকাল সাল খরচ
ভারত মঙ্গলযান ১৫ মাস ২০১৩ ৬.৯ কোটি ডলার
আমেরিকা মাভেন ৬০ মাস ২০১৩ ৬৭.১ কোটি ডলার
আমেরিকা লুনার রিকনিসেন্স অরবিটার ৩৬ মাস ২০০৯ ৫৮.৩ কোটি ডলার
ভারত চন্দ্রযান ১৮ মাস ২০০৮ ৫.৯ কোটি ডলার
চিনা সংবাদমাধ্যমের কটাক্ষ উড়িয়ে ইসরো সূত্রে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের পরিচিতি কম সময়ে কাজ শেষ করার জন্যই। ২০০৮ সালে চাঁদে অভিযান চালানোর সময়ও নাকি এমনটাই হয়েছিল। ইসরোর এক মুখপাত্রের বক্তব্য, চন্দ্রযানের সময়ে মার্কিন ও ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কিছু কাজ হয়েছিল। প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর তখন আর মাত্র ১৮ মাস সময় ছিল চন্দ্রযান নির্মাণে। তা দেখে ইউরোপীয় ও মার্কিন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছিলেন, ইসরো ঠিক সময়ে নির্মাণের কাজ শেষ করতে পারবে কি না। শেষ পর্যন্ত সময়েই কাজ শেষ হয় চন্দ্রযানের। অভিযানও সফল হয়। চাঁদে জলের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিল চন্দ্রযান। ইসরোর মুখপাত্র বলছেন, “ওই অল্প সময়েই নাসার চাঁদে অভিযানের মাত্র দশ ভাগ খরচ করে চন্দ্রযান তৈরি করা হয়েছিল।”
এমনটা কী ভাবে সম্ভব হয়? ইসরো সূত্রের ব্যাখ্যা, বাজেট কম থাকে। ফলে কাজটা কম সময়েই করতে হয়। ইসরো সূত্রের খবর, নাসা বা ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা প্রথমে দু’-তিনটি মডেল তৈরি করে, তার পর কাজ চূড়ান্ত করে। তাতে সময় ও খরচ, দু’টোই বেশি লাগে। কিন্তু চন্দ্রযানের সময় থেকেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা সফটওয়্যারেই মডেল তৈরি করে, তার উপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আসল মডেলটি বেছে নেন। গত দেড় বছরে শিফট ভাগ করে সারা দিনই মঙ্গলযান নির্মাণের কাজ চলেছে ইসরোর দফতরে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসরোর চেয়ারম্যান কে রাধাকৃষ্ণন বলেন, “একটা পরীক্ষা করেই কত বেশি ও ভাল ফল পাওয়া সম্ভব, সেটার উপরে জোর দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা।” এক ইসরো-কর্তার কথায়, “ভারতীয়রা ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতা, অভাবের মধ্য দিয়ে বড় হয়। ফলে কম খরচে, তাড়াতাড়ি কাজ করে ফেলাটা তাঁদের জন্মগত গুণ।”
নাসার মঙ্গলযান কিউরিওসিটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বঙ্গতনয়া অনিতা সেনগুপ্তও ইসরোর এই মঙ্গল অভিযান নিয়ে উচ্ছ্বসিত। আনন্দবাজারকে তিনি বলেন, “মঙ্গলে যান পাঠাতে গেলে কী রকম প্রযুক্তিগত উন্নতির দরকার আমি তা বুঝি। ভারতের জন্য এক জন ভারতীয় হিসেবে আমি গর্বিত।”
তবে ইসরোর বিজ্ঞানীদেরই একাংশ অন্য একটি আশঙ্কাও করছেন। তাঁরা বলছেন, “কম সময় ও খরচে তৈরি করার জন্য কিছু বাধার মুখেও পড়তে হতে পারে মঙ্গলযানকে।”
কী রকম? এ দিনের উৎক্ষেপণের পরে মুক্তিবেগ (যে বেগে চললে পৃথিবীর অভিকর্ষ বল ছাড়িয়ে মহাকাশে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব) পেতে মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর চারপাশে ছ’বার পাক খাওয়ানো হবে। সেখানে নাসার মহাকাশযানটিকে তাঁদের উন্নত ও দামী রকেট এক বারের চেষ্টাতেই পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে বাইরে পাঠানো হবে। পাশাপাশি, মাভেনের তুলনায় অনেক কম যন্ত্রপাতিও রয়েছে মঙ্গলযানে। এই সব দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তড়িঘড়ি মঙ্গল অভিযানে নামল কেন ভারত? আরও বেশি সময় নিয়ে কি উন্নত মহাকাশযান পাঠানো সম্ভব হত না?
ইসরোর বিজ্ঞানীরা বলছেন, মঙ্গলে উৎক্ষেপণের সময় দু’-তিন বছর অন্তর আসে। সে ক্ষেত্রে ২০১৩ সালে না পাঠাতে পারলে ২০১৬ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হত। তাতে খরচ বাড়তে পারত। পাশাপাশি, মঙ্গল অভিযান সব সময়ে সফল হয় না। বিশেষ করে, এ যাবৎ কালে প্রথম বারে অভিযান সফলের নজির নেই বললেই চলে। ইসরোর অভিযানও যদি প্রথম বারে ব্যর্থ হয়, সে ক্ষেত্রে তাঁদের হিসেবে খুব বেশি ক্ষতি হবে না।




First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.