স্মৃতিটুকুই আনন্দের, পুজো আঁধারে কাটে সুকুমারদের
পুজো আসে পুজো যায়, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোনও মতে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়াই এখন একমাত্র লক্ষ্য সুকুমার নাথের। দুর্গা পুজোর আনন্দ, উচ্ছ্বাস, আবেগআর মন টানে না।
অথচ, সুকুমারের কাছে পুজো এমন ছিল না।
নৈহাটির গৌরীপুর চটকলের কুলি-লাইনে দুর্গা পুজো মানেই এক সময় ডাক পড়ত সুকুমারের। শিফ্ট শেষের ঘণ্টা বাজলেই চটকলের শ্রমিক সুকুমার হাজির পুজোমণ্ডপে। ‘শ্রমিকের হাত আর শিল্পীর হাতে কোনও তফাত নেই’সুকুমারের পিঠ চাপড়ে বলতেন চটকলের সুপারভাইজার সন্তোষ চক্রবর্তী।
প্রতি বছর মহালয়ায় প্রতিমার চোখ আঁকার সময় মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে যেতেন সুকুমার। মাটির প্রতিমা যে সে দিন সুকুমারের হাতের ছোঁয়ায় চিণ্ময়ী হয়ে উঠবেন! সন্ধ্যাবেলা গঙ্গার ধারের বাজার থেকে মা’র জন্য গরদের শাড়ি কিনে আনতেন। পুজোয় কারখানা থেকে বোনাসও মিলত। ওই টাকায় বাড়ির সবাইকে গাড়িভাড়া করে কলকাতায় ঠাকুর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রায় বছর কুড়ি আগে। শিল্পাঞ্চলের কল-কারখানার ধুলো, ধোঁয়া, ইট-কাঠের মধ্যেও তখন পুজোর আগে কাশফুল ফুটত গঙ্গার পাড়ে। মেলা বসত।
দুর্গা পুজো কি শুধু বাঙালিদের উৎসব? বিহার, গুজরাত, দক্ষিণ ভারতের কত মানুষ উত্তর শহরতলির ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকের কাজ করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজো এখানে যথার্থই বারোয়ারি। পুরনো কথা মনে পড়ে যাওয়ায় সুকুমার বলেন, ‘‘প্রতিমার জন্য গঙ্গার মাটি ছাঁচত আমাদেরই কারখানার শ্রমিক আকবর আলি। খুব আমুদে ছিল। নিজের সারা বছরের সঞ্চয় পুজোর জন্য খরচ করত। তখন কতই বা বেতন! মাইনে আর উপরি মিলিয়ে সপ্তাহান্তে মেরেকেটে একশ টাকা। তার থেকেও প্রতিমার সাজসজ্জা কেনার টাকা জমাত আকবর। বসির শেখ চাকরি করত জগদ্দলের আলেকজান্ডার চটকলে। ও আর সদ্য চটকলের চাকরিতে ঢোকা রামান্না আইয়াপ্পা চন্দননগর থেকে পুজোর মিষ্টি কিনে আনত।’’
১৯৯৭ সালে পুজোর আগে উৎপাদন না হওয়ার কারণ দেখিয়ে কারখানা বন্ধ করার কথা বলেন মালিকপক্ষ। ওই বছর ১২ ডিসেম্বর বন্ধ হয় গৌরীপুর চটকল। প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিক পথে বসেন। অনেক আন্দোলন, আশ্বাস, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকেও কারখানা খোলেনি। গত বছরই বাটি হাতে, খালি গায়ে টিটাগড়ে পিএফ অফিসের সামনে বকেয়া পাওনার দাবিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন সুকুমার, আকবরেরা। শ্রম দফতর বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের দেড় হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু তাতে কি সংসার চলে? ঘরে আলো নেই। খাওয়ার জলটাও আনতে হয় দূরের কল থেকে। মেরামতির অভাবে নষ্ট হতে থাকা বন্ধ কারখানার কুলি-বস্তিতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু আছে এখনও। তবে পুজোর বাজার, স্বপ্ন। সুকুমারের এখন দিন চলে দিনমজুরি করে।
প্রশাসনের হিসেবেই ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে সুকুমারের মতো শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় তিরিশ হাজার। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি মানলে আরও বেশি। কারখানা বন্ধ হয়ে কাজ হারানো শ্রমিকদের একটা বড় অংশ ঠেলা চালান, লোকের বাড়িতে বা রাস্তার পাশের টায়ারের দোকানে কাজ করেন।
এর থেকেও খারাপ কেটেছে অনেকের। ‘‘পুজোর সময় ছোট ছেলে নতুন জামার জন্য বায়না করছে, আর পরদিন খাওয়া জুটবে কি না ঠিক নেই এমনও দিন গিয়েছে। সে দিন সব লজ্জা, সম্মান ভুলে শরীর বেচে উপার্জন করেছি। শুধু ছেলের মুখ চেয়ে’’, বলতে গিয়ে যন্ত্রণা ফুটে ওঠে নদিয়া চটকলের মহিলা-শ্রমিক শান্তি সরকারের (নাম পরিবর্তিত) মুখে। নদিয়া চটকল এখন খুললেও চলছে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। রোজ কাজ জোটে না শান্তিদেবীর। পুজোর বাজারের দিকই মাড়াননি।
নৈহাটি, শ্যামনগর, টিটাগড়, আগরপাড়ার কুলি-লাইনগুলোর ছবি প্রায় এক। “মা, মেয়ে, বউয়ের জন্য পুজোর শাড়ি আর কেনা হয়ে ওঠে না, জানেন?”, গলাটা ভারী হয়ে ওঠে সুকুমারের।





First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.