উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসত মহকুমার কামদুনি গ্রামে একটি পুলিশ ফাঁড়ি চালু করার আশ্বাস দিয়াছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। স্বরাষ্ট্রসচিব মানবাধিকার কমিশনকে এই মর্মে আশ্বাস দিয়াছেন। ইতিপূর্বেই বারাসত থানাকে চারটি ভাগে বিভক্ত করিয়া মধ্যমগ্রাম, দত্তপুকুর ও শাসন নামে তিনটি নূতন থানা গড়া হইয়াছে। নিরাপত্তার অভাবেই যে নিরুপায় ও অসহায় গ্রামবাসীরা বারাসতে উপর্যুপরি দুষ্কৃতীদের অত্যাচার ও তাণ্ডবের শিকার হইতেছেন, পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট সরকার বিপন্ন দিদিকে বাঁচাইতে গিয়া রাজীব দাসের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরেও তাহা বুঝিতে পারে নাই অথবা বুঝিতে চাহে নাই। কামদুনি গ্রামের কলেজ-ছাত্রীর গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার পর বর্তমান সরকার অন্তত নড়িয়াচড়িয়া বসিয়াছে। তাহার পিছনে কামদুনির নির্যাতিত গ্রামবাসীদের দুর্বার আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, যেমন আছে কলিকাতার নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ ও জাগরণের ভূমিকাও। এই সকল অসরকারি, গণ-আন্দোলন ও উদ্যোগের সম্মিলিত চাপই সরকারকে পুলিশি তৎপরতা বাড়াইতে কতকটা বাধ্য করিয়াছে। কামদুনিতে ফাঁড়ি গড়ার প্রস্তাবও সেই চাপের কারণেই। স্মরণীয়, ওই গ্রামে গিয়া মুখ্যমন্ত্রী গত ১৭ জুন পুলিশি বন্দোবস্ত ঢালিয়া সাজার আশ্বাস দিয়াছিলেন।
কামদুনির ঘটনা (এবং সুটিয়া ও অন্যান্য গণধর্ষণের প্রমাণিত আখ্যানগুলি) সমগ্র দেশে পশ্চিমবঙ্গের মাথা হেঁট করিয়া দিয়াছে, রাজ্য সরকারকেও কম বিব্রত করে নাই। মেয়েদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ সহ বিভিন্ন আক্রমণের ঘটনা দেখাইয়া দিয়াছে, রাজ্যের গ্রামাঞ্চল ও মফস্সলে জন-নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ নাই, রাস্তায় আলো নাই, দুষ্কৃতীদের ধরপাকড়ের উদ্যম নাই, অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করিবার সরকারি প্রয়াস নাই। মহিলাদের নিরাপত্তা বিপন্ন, ধর্ষকরা বেপরোয়া, দেশের মধ্যে সর্বাধিক ধর্ষণের কৃতিত্ব যেমন এই রাজ্যের, তেমনই সবচেয়ে কম শতাংশ ধর্ষণকারীর শাস্তিও এই রাজ্যেরই ‘শ্লাঘা’। এই লজ্জা ঘুচাইবার প্রয়াস বিশেষ দেখা যায় নাই। সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ স্তরে দৃষ্টিভঙ্গির কিছু পরিবর্তনের লক্ষণ মিলিতেছে। একটি থানার পক্ষে বারাসতের ২৮৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা এবং সাড়ে ৯ লক্ষ মানুষের জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা দুঃসাধ্য, এই উপলব্ধিও বহু আগেই হওয়া উচিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গে অনেক থানাকেই এখনও বিশাল এলাকা ও বিপুল জনসংখ্যার ভার মাথায় লইয়া কাজ করিতে হয়। আশা করা যায়, সরকার ক্রমশ পুলিশে নিয়োগ বৃদ্ধি, থানা ও ফাঁড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির মতো জরুরি সংস্কারে হাত দিবে।
তাহাই অবশ্য যথেষ্ট নয়। দুষ্কৃতীদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করিতে এবং জনসাধারণের মনে ভরসা জোগাইতে পুলিশ বাহিনীকে দলনিরপেক্ষ ভাবে দুষ্কৃতী দমনে তৎপর করিতে হইবে। এই নিরপেক্ষতার কথা বক্তৃতায় বলিলেই চলিবে না, বাস্তবে দেখাইতে হইবে যে, শাসকের আশ্রিত দুষ্কৃতীদের দমনেও পুলিশ নির্দয় হইতে পারে। কিন্তু প্রশাসনের অর্থ কেবল শাসন নহে। কাজ আরও অনেক আছে। কামদুনির মহিলারা এখনও দলবদ্ধ ভাবে ছাড়া ঘরের বাহিরে যাইতে ভয় পান। বিশেষত দিনের আলো বিদায় লইবার পরে। অন্ধকারের ভয় দূর করিতে কলিকাতার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কামদুনিতে সৌরবিদ্যুৎ চালিত আলোর ব্যবস্থা করিয়াছে। এই উদ্যোগ সরকার করিতে পারিত না? অনেক আগেই? ‘পরিবর্তন’-এরও আগে? |