রাষ্ট্র অনেক সময়েই নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষা করার দায় হইতে মুক্ত থাকিতে পছন্দ করে। তাহা রাষ্ট্রক্ষমতার স্বভাব। ক্ষমতা ব্যবহারের নিরঙ্কুশ সুযোগ থাকিলে ব্যবহারকারীদের বিশেষ সুবিধা হয়। পুলিশ, আধাসেনা, কখনও বা সেনাবাহিনীও হয়তো এই কারণেই মানবাধিকার লঙ্ঘন করিয়া থাকে। এবং অনেক সময়েই ছাড় পাইয়া যায়। কেবল বিচারবিভাগ কিংবা মানবাধিকার কমিশনের কাছে নিগৃহীতরা অভিযোগ জানাইলে তবেই সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হয়। সেখানেও নানা অজুহাত, বিশেষত নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলিয়া সরকারি আমলারা দায় এড়াইতে চেষ্টা করেন। কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে যুক্তিসিদ্ধ করিয়া তোলার চেষ্টা করেন। পশ্চিমবঙ্গেও এই রীতির ব্যতিক্রম নাই। বামফ্রন্ট আমলেও ছিল না, এখনও নাই।
ইতিপূর্বে রাজ্য মানবাধিকার কমিশন একাধিক ক্ষেত্রে রাজ্যবাসীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পুলিশ-প্রশাসনকে দায়ী করিয়াছে, পুলিশের হাতে নিগ্রহ ও হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু সরকার তাহাতে ভ্রূক্ষেপ করে নাই। বিরোধী রাজনৈতিক দল সি পি আই এমের এক ছাত্রনেতাকে শিলিগুড়িতে হাসপাতালের শয্যায় পায়ে বেড়ি পরাইয়া রাখার মতো অমানবিকতার ঘটনাতেও প্রশাসন এই অক্ষম অজুহাতে সাফাই দিয়াছে যে, অন্যথায় সমবেত সাংবাদিকদের ভিড়ের সুযোগে বন্দি ছাত্রনেতা হাসপাতাল ওয়ার্ড হইতে পলায়ন করিত। হাস্যকর এই কৈফিয়ত অবশ্য কলিকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি-সহ দুই বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ মানে নাই। বরং বন্দি ছাত্রনেতার সহিত এই অমানবিকতার জন্য সরকারের ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করিয়াছে।
বন্দিদের সহিত আচরণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের যে স্পষ্ট নির্দেশিকা আছে, তাহা মানিতে প্রতিটি রাজ্য বাধ্য। আদালতের আগাম নির্দেশ ছাড়া কোনও সন্ত্রাসবাদীকেও হাতে হাতকড়া কিংবা পায়ে বেড়ি পরানো অন্যায়। গণতন্ত্র এমনই একটি ব্যবস্থা যেখানে গুরুতর অপরাধে অপরাধীরও কতকগুলি মৌলিক মানবাধিকার রহিয়াছে। ভাল হউক, মন্দ হউক, ইহার নামই গণতন্ত্র। অথচ এ দেশে রাষ্ট্রশক্তির ভাবটি হইল গণতন্ত্রের সুবিধাটি লইব, অসুবিধাটি পিষিয়া মারিব। প্রতিটি মানুষের যে মর্যাদা রহিয়াছে, অভিযুক্ত, অপরাধী কিংবা বন্দি হইলেও যে সরকার তাহা লঙ্ঘন করিতে পারে না, এই সারসত্যটি ক্ষমতামত্ত শাসকরা উপলব্ধি করেন না। তাঁহারা মনে করেন, যেহেতু তাঁহারা জনাদেশে ক্ষমতাসীন, অতএব প্রজাপুঞ্জের সহিত যাহা খুশি করার অধিকার তাঁহাদের আছে। ভারতে দলমত নির্বিশেষে কেন্দ্র-রাজ্য নির্বিশেষে ক্ষমতাসীন কর্তৃত্বের এই প্রবণতা দেখিতে পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার তাই ব্যতিক্রমী নহে, নেহাতই মূলস্রোতানুগামী। আপাতত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা মানিয়া সত্বর ব্যবস্থাগ্রহণ কর্তব্য। প্রতিটি থানায় এবং জেলখানায় পুলিশ ও কারাকর্মীদের প্রাসঙ্গিক নির্দেশ দেওয়া ও প্রশিক্ষিত করা জরুরি। আদালতের নির্দেশানুযায়ী, কেমন আচরণ করা যাইবে না, পুলিশ ও জেলকর্মীদের সর্ব স্তরে তাহা জানাইতে হইবে এবং রাজ্যের সব ইংরাজি ও বাংলা সংবাদপত্রে তাহা বিস্তারিত মুদ্রণ করিতে হইবে। নির্বাচনের সময়ে মানুষের গুরুত্ব প্রভূত, আর নির্বাচনোত্তর শাসনের সময় মানুষ কীটসদৃশ: এই প্রবণতার নিরাময় চাই। অন্যথা গণতন্ত্র নেহাতই মূল্যহীন প্রসাধন। |