সৌজন্যের শিল্পসভায় সঙ্গী সংশয়ও
মতার পাশে বসে মুকেশ অম্বানী হাসছেন। বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ের ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টারে ‘বেঙ্গল বেকন্স’-এ রাজ্য সরকারের এটাই পোস্টার।
মুকেশ অম্বানী পশ্চিমবঙ্গে তাঁর ফোর-জি টেলিকম প্রকল্প চালু করতে চান। কিন্তু জমি অন্যতম বাধা। হলদিয়া পেট্রোকেমের শেয়ার কিনতেও তিনি আগ্রহী। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত বিকেল পাঁচটা থেকে ঘণ্টা দেড়েকের শিল্প বৈঠকে উপস্থিত থাকার পরে রাত আটটা চল্লিশে আবার তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত আলোচনায় বসেন। মহারাষ্ট্র সরকারের যে অতিথি নিবাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকছেন, সেখানে। ছিলেন মুকেশের টেলিকম প্রকল্পের প্রধান তরুণ ঝুনঝুনওয়ালা।
শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার সূত্রপাত করেন মুকেশই। কথার অভিমুখ নির্ধারণ করে দিয়ে বলেন, “ভোটে এত বড় জয়ের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আপনি বাণিজ্য নগরীতে। দ্যাট মিন্স, ইউ মিন বিজনেস।”

মুকেশ অম্বানীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার মুম্বই শিল্পসভায়। ছবি: সুমন বল্লভ।
এ ধরনের শিল্প বৈঠকে কোনও শিল্পপতিই সাধারণত আক্রমণাত্মক হন না। তবু রাজ্যের জমি-নীতি যে এখনও বড় কাঁটা, তা পরিষ্কার হয়ে যায় আদি গোদরেজের উক্তিতে। রাজ্যে জমির ঊর্ধ্বসীমা আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আপনাদের বিকল্প জমি-নীতির কথা ভাবা উচিত।” এই প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রী নতুন কোনও কথা শোনাননি বলেই জানাচ্ছে শিল্প মহল। জমি প্রসঙ্গে যে নীতি নিয়ে তিনি চলছেন, তা বদলের কোনও ইঙ্গিত তিনি দেননি। সাংবাদিক সম্মেলনেও এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “জমির ব্যাপারে আমাদের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করে বলেছি।” শিল্পের জন্য জমির ব্যবস্থা করতে তাঁর সরকার যে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক ও ল্যান্ড ম্যাপ তৈরি করেছে, ফের সে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সরকারের হাতে থাকা জমির যা চরিত্র, তাতে যে বড় শিল্প হবে না, তা ইতিমধ্যেই কবুল করেছেন রাজ্য প্রশাসনের কর্তারা।
পরিকাঠামো, এসইজেড নীতি এমনকী সিঙ্গুর নিয়েও এ দিন নতুন কোনও কথা শোনাননি মুখ্যমন্ত্রী। শিল্প মহলও অবশ্য এ নিয়ে অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখে ফেলেনি তাঁকে। কেন? কারও কারও মতে, মুম্বইয়ে মুখ্যমন্ত্রী অতিথি। তাই তাঁকে বিব্রত করতে চাননি শিল্পকর্তারা। কিন্তু সত্যি সত্যিই যদি তাঁরা রাজ্যে শিল্প করতে যান, তা হলে এ সব প্রশ্ন তো তুলবেনই। এই সব সমস্যার সমাধান না হলে যে শিল্প গড়া সম্ভব নয়, তা আগেই বহু বার বলেছেন শিল্পকর্তারা। তখন রাজ্য সরকারের হাতে যে নতুন কোনও সন্তোষজনক উত্তর থাকবে, এমন ইঙ্গিত এ দিন অন্তত মেলেনি।
তবে শিল্পমহলের হর্তাকর্তাদের উপস্থিতির নিরিখে এ দিনের সম্মেলন অনেকাংশেই সফল। বিশেষ করে বিগত দু’টি ‘বেঙ্গল লিড্স’ এবং দিল্লির শিল্প সম্মেলনের তুলনায়। যে সাফল্যের বেশির ভাগটাই অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের প্রাপ্য বলে শিল্প মহলের দাবি। আর বাকি যে কারণটা শোনা যাচ্ছে, তার পিছনে দিল্লির রাজনীতির অঙ্ক। আগামী বছর লোকসভা ভোটে আঞ্চলিক দলগুলির রমরমার ইঙ্গিত দিচ্ছে একাধিক জনমত সমীক্ষা। সেটা সত্যি হলে দিল্লিতে মমতার একটা দাপট থাকাটা প্রত্যাশিত। সেই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে শিল্পপতিরা তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্কের দরজা খুলে রাখলেন বলে অনেকের মত।

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী ও শিল্পমন্ত্রী। মুম্বইয়ে। —নিজস্ব চিত্র
এ দিনের বৈঠকে শুধু মুকেশ অম্বানী নন, উপস্থিত ছিলেন টিসিএস-এর শীর্ষ কর্তা এন চন্দ্রশেখরন থেকে ব্যাঙ্কিং শিল্পের ছন্দা কোচার, উদয় কোটাক। ছিলেন মধুর বাজাজ, সজ্জন জিন্দল, বেণুগোপাল ধুত, অমিত কল্যাণী-সহ শিল্প জগতের গণ্যমান্যরা। কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন যোগী দেবেশ্বর, করণ পল, সঞ্জীব গোয়েন্কা, সঞ্জয় বুধিয়া ও হর্ষ নেওটিয়া। এই উপস্থিতি রাজ্যের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূল সরকারের পক্ষে অবশ্যই শ্লাঘার। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বলিউড ও টলিউডের তারকারা। মিঠুন চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ, গৌতম ঘোষেরা।
এ দিন গোটা আলোচনা স্বাভাবিক ভাবেই আবর্তিত হয়েছে রাজ্যে দ্রুত প্রকল্প রূপায়ণের সমস্যাকে ঘিরে। সভার শুরুতে মিনিট পাঁচেক স্বাগত ভাষণ দেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। তার পর প্রায় সতেরো মিনিটের বক্তৃতায় রাজ্যের কর্মসংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার কথা তুলে ধরে বিনিয়োগের দরবারে রাজ্যকে বিপণনের চেষ্টা করেন মুখ্যমন্ত্রী। শেষে শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মিনিট তিনেকের ধন্যবাদজ্ঞাপন। মাঝের বাকি সময়ের পুরোটাই শিল্প মহলের কথা।
ম্যানেজমেন্ট স্কুলে ব্যবসার কৌশল তুলে ধরার প্রথম পাঠেই থাকে ঘাটতির জায়গাগুলো মেনে নেওয়ার কথা। তার পাশেই থাকে সেই সব ঘাটতি মেটানোর জন্য সংস্থার কী শক্তি আছে তার ব্যাখ্যা। সেই পথে হেঁটেই মমতা এ দিন গোড়াতেই শিল্পপতিদের বোঝাতে চাইলেন লগ্নির দৌড়ে এত দিনের ব্রাত্য পশ্চিমবঙ্গ কেন তাঁদের বিনিয়োগের গন্তব্য হবে। তাঁর বক্তব্য গুজরাত, রাজস্থান অথবা মহারাষ্ট্র বহু দিন ধরেই সযত্নে লালিত হয়েছে। এদের ভাবমূর্তি নিয়ে তাই শিল্প জগৎ একটা ধারণা গড়ে তুলেছে। কিন্তু তথ্য বলছে পশ্চিমবঙ্গ লগ্নির গন্তব্য হিসেবে এখন প্রস্তুত। এ রাজ্যে শ্রমদিবস নষ্টের সংখ্যা এখন শূন্য। বন্ধের জন্য যে রাজ্যের এত বদনাম ছিল, সেই রাজ্যে এখন আর বন্ধের জন্য কারখানার দরজা বন্ধ থাকে না।
তবে এই যুক্তি মমতার একার নয়। বস্তুত, ১৯৯৬ সাল থেকে এই একই যুক্তিতে শিল্প টানার চেষ্টা করে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ। বৈঠকে উপস্থিত এক অন্যতম ব্যাঙ্ক কর্তার কথায়, “রাজ্য প্রশাসনের এই যুক্তি নতুন নয়। এর মধ্যে অপ্রত্যাশিত কিছু পেলাম না।” তাঁর ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রশাসনের সক্রিয়তার প্রতিশ্রুতি যে ভাবে তাঁরা চেয়েছিলেন, তা পাননি। একান্ত আলাপচারিতায় সংশয়ের সুর শোনা গেল আরও কয়েক জন ব্যাঙ্ক-কর্তার গলাতেও।
পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাঁদের সংস্থার ঘনিষ্ঠ আর্থিক যোগাযোগের কথা এ দিনের বৈঠকে বলেছেন অনেকেই। সেলের চেয়ারম্যান সি এস বর্মা যেমন বললেন, তাঁর সংস্থার বিনিয়োগের তালিকায় বাংলার স্থান শীর্ষে। কিন্তু যেটা তিনি বললেন না, তা হল, এই বিনিয়োগের পুরোটাই বহু পুরনো। রাজ্যে নতুন বিনিয়োগের কথা কারও মুখেই শোনা গেল না। ভারত ফোর্জ বছর পাঁচেক আগে এ রাজ্যে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল। তা এখনও দিনের আলো দেখেনি। অমিত কল্যাণী নিজে বৈঠকে ছিলেন। তিনিও সেই লগ্নি নিয়ে কথা বলেননি।

আপনাদের বিকল্প জমি নীতির কথা ভাবা উচিত।

গোদরেজ গোষ্ঠীর কর্ণধার

সাংবাদিক বৈঠকে স্বাভাবিক ভাবেই দু’টো প্রশ্ন উঠে আসে। এক, নতুন লগ্নির কোনও প্রতিশ্রুতি এল কি না? আর দুই, রাজ্যে শিল্প গড়ার অভিযানে ব্যাঙ্কিং শিল্পের উপর এতটা জোর দিলেন কেন? মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, রাজ্যে বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাঙ্কগুলি শিল্পের অক্সিজেন। তাদের টাকাতেই শিল্প গড়ে ওঠে। তাই শিল্প রাজধানীতে এসে ব্যাঙ্কিং শিল্পের সঙ্গেও বৈঠক হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
নতুন বিনিয়োগের উল্লেখ হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই বৈঠকেই কলকাতায় ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টার তৈরির প্রস্তাব এসেছে। শুধু তা-ই নয়। রাজ্যে ফিনান্সিয়াল হাবে বিনিয়োগের জন্যও বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক প্রস্তুত। অবশ্য ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টার সেই অর্থে শিল্প নয়। এখানে বিভিন্ন সংস্থার অফিস এবং বৈঠকের ব্যবস্থা হয়। মুখ্যমন্ত্রীর অবশ্য দাবি, এই বৈঠক লগ্নি টানতে জমি তৈরির। এখান থেকেই লগ্নি আসতে শুরু করবে।
এ দিন অর্ধ সমাপ্ত প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নানা ছাড়পত্রের গেরোয় আটকে থাকা শালবনিতে জিন্দলদের ইস্পাত প্রকল্প নিয়ে সজ্জন জিন্দলকে প্রশ্ন করেন মমতা। তবে এক বছর আগেও মমতা মঞ্চ থেকে শিল্পপতিদের বকুনি দিতেন। কিন্তু মুম্বইয়ের মঞ্চে মমতা অনেক সহনশীল এবং সমব্যথীও। তিনি বলেন, “লোহার অভাবে যদি প্রকল্প শুরু না করা যায়, তা হলে কি দশ বছর বসে থাকবেন? সে ক্ষেত্রে ওই জমিতে অন্য কিছু করার কথা ভাবুন। না হলে পরের বার মুম্বইয়ে এসে আপনার বাড়ি চলে যাব।”
এ দিনের শিল্প বৈঠকে মূল ভূমিকা ছিল কলকাতার শিল্পপতিদের। গাড়ি থেকে নামার পর সরকারি কর্তা নয়, প্যাটন কর্ণধার সঞ্জয় বুধিয়া শিল্পপতিদের ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টাওয়ার ওয়ানে দোতলায় যাওয়ার লিফ্টে তুলে দিচ্ছিলেন। দোতলায় অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ও শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভ্যর্থনা কমিটির অন্যতম সদস্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হর্ষ নেওটিয়া ও সঞ্জীব গোয়েন্কা।
দরজার ও-পারে নিজস্ব অননুকরণীয় ভঙ্গিতে শিল্পপতিদের মুগ্ধ করেছেন মমতা। কিন্তু সেই মুগ্ধতা লগ্নিতে রূপান্তরিত হবে কিনা, সেটাই কোটি টাকার প্রশ্ন। শিল্প মহল বলছে, বিনিয়োগে আবেগের কোনও স্থান নেই। পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পের গন্তব্য করে তুলতে হলে নীতি আর সুশাসন এই দুই ক্ষেত্রে আরও পথ হাঁটতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

পুরনো খবর:



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.