সারদাকে ছাড় দিতেই নতুন
বিল, অভিযোগ বিরোধীদের

বাম আমলের বিলটি সংশোধন না-করে ভুঁইফোঁড় অর্থলগ্নিকারী সংস্থাগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন বিল কেন আনা হচ্ছে, এ বার সেই প্রশ্নও উঠে গেল।
আইন ও পরিষদীয় বিষয়ে অভিজ্ঞদের মতে, ২০০৯-এ বিধানসভায় পাশ হওয়া বিলটি রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ফিরিয়ে এনে সংশোধন করলে তার আওতাতেই সুদীপ্তদের বিচার সম্ভব হত। কিন্তু তা প্রত্যাহার করে নতুন বিল আনা হলে সারদা-কাণ্ডে অভিযুক্তরা সেই আইনের আওতায় পড়বেন না। তৃণমূল সরকার নতুন বিল পেশ করারই পক্ষপাতী। সেই লক্ষ্যে আগামী ২৯ ও ৩০ এপ্রিল বিধানসভার জরুরি অধিবেশন ডাকা হয়েছে। ফলে নতুন বিল পেশ করে সরকার আসলে সারদা-কাণ্ডে অভিযুক্তদের কড়া শাস্তি থেকে আড়াল করতেই চাইছে, এমন অভিযোগ তোলার সুযোগ পেয়ে গিয়েছেন বিরোধীরা। শাসক-পক্ষ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করছে।
বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার হাসিম আব্দুল হালিম এ দিন বলেন, “বিলটি ২০০৯-এর ডিসেম্বরে বিধানসভায় পাশ হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন যখনই পাওয়া যাক না কেন, যে দিন বিধানসভায় বিলটি পাশ হয়েছে, সে দিন থেকেই তা কার্যকর করা সম্ভব।” পক্ষান্তরে, এখন যে বিলটি বিধানসভায় আনার কথা বলা হচ্ছে, তা যে দিন বিধানসভায় পাশ হবে, রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলে তা কার্যকর হবে সে দিন থেকে। কিন্তু সারদা-মামলা রুজু হয়েছে তার আগেই। ফলে নতুন বিল যত কড়াই হোক না কেন, তাতে সারদা-মামলায় অভিযুক্তদের কিছু এসে যাবে না।
তার উপরে ঘটনা হল, বাম আমলে পাশ হওয়া বিলের থেকে নতুন আইন তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে আলাদা হওয়ার কোনও খবর সরকারি সূত্রে এখনও পর্যন্ত মেলেনি। পরিষদীয়মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার যা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে কিছু খুঁটিনাটি (যাকে বিরোধীরা বলছেন প্রসাধনী মাত্র) রদবদল থাকবে নতুন বিলে। যেমন, আগের বিলে সম্পত্তি আটক (অ্যাটাচ) করার কথা ছিল। এখন বাজেয়াপ্ত (কনফিসকেট) করার সংস্থান রাখা হচ্ছে। ওই জাতীয় অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আদালতের কথাও বলা হচ্ছে।
শাসক পক্ষের অভিযোগ, ভুঁইফোঁড় অর্থলগ্নি সংস্থা টাকা অন্যত্র পাচার করে বেনামে সম্পত্তি কিনলে তা বাজেয়াপ্ত করার বিধান আগের বিলে ছিল না। যদিও বাম শিবিরের দাবি তাদের আমলের বিলের ১৩ ও ১৪ নম্বর ধারায় সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজের নামে ও বেনামে কেনা সমস্ত সম্পত্তি আটক করার ব্যবস্থা আছে। আছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো কড়া শাস্তির ব্যবস্থাও। ওই ধরনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ভারপ্রাপ্ত আদালতের (যেমন সিবিআই-এর আছে) ব্যবস্থাও রয়েছে ওই বিলে। রাজ্যের অর্থ দফতরের এক পুরনো অফিসারেরও বক্তব্য, নতুন বিলে এর চেয়ে কী কড়া ব্যবস্থা রাখা হবে, তা বোধগম্য হচ্ছে না! তাঁর যুক্তি, “পুরনো বিলে কোনও খামতি থাকলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পরেও বিধানসভায় সংশোধনী এনে তা দূর করা যায়। এর জন্য গোটা বিলটিকেই বাতিল করে ফের নতুন বিল আনার দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে কেন, তা বোঝা যাচ্ছে না।” স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেন, “একটি আইন থাকলে সে ক্ষেত্রে নতুন আইন না করে তাতে সংশোধনী আনা যেতেই পারে।”
এই পরিপ্রেক্ষিতেই বিরোধীদের প্রশ্ন, তা হলে কি সারদা গোষ্ঠীকে বাঁচাতেই খামতির দোহাই দিয়ে ফেরত আনা হচ্ছে আগের বিলটি? প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত এ দিনই বলেছেন, “এই ধরনের চিট ফান্ডকে অঙ্কুরে বিনাশ করার জন্যই ২০০৯ সালে বিল এনেছিলাম। ২০০৯ সালের ২২ ডিসেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাশ হয়েছিল। এখন যাঁরা শাসক, বিরোধী হিসেবে তাঁরাও বিলটি সমর্থন করেছিলেন। সেই বিলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা না-করে আবার নতুন করে গোটা প্রক্রিয়া কেন করা হচ্ছে, বোঝা মুশকিল!”
সিপিএম রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য গৌতম দেবও প্রশ্ন তুলেছেন, তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সে দিন বিল সমর্থন করার পর এখন একই বিলে তারা ত্রুটি খুঁজে পেল কেন? যার জবাবে শোভনদেববাবু বলেন, “বিলটি সমর্থনের পাশাপাশি তার ত্রুটির কথাও উল্লেখ করেছিলাম। গৌতমবাবুরা আমার সেই সময়ের (২০০৯) বক্তৃতার কতগুলি লাইন বাদ দিয়ে বলছেন। আমি স্পিকারকে চিঠি
দিয়ে বলেছি, আমার বক্তৃতার প্রতিলিপি পাঠানো হোক।” পার্থবাবুরও দাবি, তাঁরা ২০০৩ এবং ২০০৯ সালে ভুঁইফোঁড় অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে এবং আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষার জন্য আনা বিলকে সমর্থন করেও সেটি যে ত্রুটিপূর্ণ, তা উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর কথায়, “২০০৯-এর ১৩ জুলাই স্থায়ী কমিটির সুপারিশে বলা ছিল, ২০০৩ সালে পেশ করা বিলটি প্রত্যাহার না-করে নতুন বিল আনা আইনসঙ্গত হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০০৯-এর ২২ ডিসেম্বর বিধানসভায় বিলটি পাশ করানো হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির যে সমস্ত পর্যবেক্ষণ ছিল, তার সব ক’টি গ্রহণ না-করে বিলটি পাশ করানো হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রপতির কাছে তা পড়েই থাকল।” এই দাবি অবশ্য সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র থেকে শুরু করে প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অসীমবাবু।
সরকারি সূত্রের খবর, রাজ্য সরকারের আবেদনের ভিত্তিতে বাম আমলের বিলটি আজ, শুক্রবার রাজ্যপালের কাছে ফেরত আসার কথা। বিকালে নতুন বিলে রাজ্যপালের সম্মতির জন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার কথা অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের। আজ দুপুরেই বিধানসভায় সর্বদল বৈঠক ডেকেছেন স্পিকার। যেখানে বিল-বিতর্কই মাথাচাড়া দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বিল ফেরত আসার ব্যাপারে এ দিন সন্ধ্যায় মহাকরণ থেকে বেরনোর সময় মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “ওটা তো এলে রাজ্যপালের কাছে আসবে। আমার কাছে এ রকম কোনও খবর নেই।”

পুরনো খবর:



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.