ফোন মমতার, প্রেসিডেন্সিতে রাজ্যপালও
ক্রান্ত প্রেসিডেন্সির পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যপাল। ঘটনাচক্রে একই দিনে।
অসুস্থ মুখ্যমন্ত্রী এখনও হাসপাতালে। সেখান থেকেই শুক্রবার সকালে টেলিফোনে প্রেসিডেন্সির উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প। সেখানে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সব রকম ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস উপাচার্যকে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ঘটনাচক্রে এ দিন বিকেলেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হামলার ঘটনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছে ক্ষমা চাইলেন আচার্য তথা রাজ্যপাল এম কে নারায়ণন। তাঁর আশ্বাস, এমন নজিরবিহীন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তিনি দেখবেন। ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে না পারাকে তিনি যে নিজের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখেছেন, তা এ দিন অকপটে জানিয়ে দেন নারায়ণন।
প্রেসিডেন্সির ঘটনা থেকে দলের দূরত্ব বাড়িয়ে হামলাকারীদের প্রশ্রয় না-দেওয়ার বার্তা বৃহস্পতিবারই দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার তিনি তৃণমূলের মহাসচিব তথা শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে হাসপাতালে ডেকে পাঠিয়ে এ ব্যাপারে কথা বলেন। পার্থবাবু পরে বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশ, প্রেসিডেন্সিতে গোলমালের ঘটনায় যুক্ত অপরাধীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। এমনকী, পুলিশের বিরুদ্ধে যদি উপাচার্যের কোনও ক্ষোভ থাকে, সেটা যথাযথ ভাবে জানানো হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।”
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরোজিও হলে উপাচার্য
মালবিকা সরকারের সঙ্গে রাজ্যপাল। শুক্রবার। —নিজস্ব চিত্র
মুখ্যমন্ত্রী এবং আচার্যের জোড়া আশ্বাসে খানিকটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজ্যপালের উপস্থিতিতেই ডিরোজিও হলের সভায় উপাচার্য মালবিকা সরকার বলেন, “আচার্য আসায় আমরা আশ্বস্ত বোধ করছি। আজ সকালে মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকেও ফোন পাই। তিনি বলেছেন, প্রেসিডেন্সি তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প। এখানে হামলার ঘটনায় যত রকম ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা তিনি নেবেন। প্রেসিডেন্সিকে সম্পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।”
এ দিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ প্রেসিডেন্সিতে যান রাজ্যপাল। বুধবার বেকার ল্যাবরেটরির যেখানে ভাঙচুর হয়েছে, সেই জায়গাটি ঘুরে দেখেন তিনি। তার পরে যান ডিরোজিও হলের আলোচনাসভায়। কানায় কানায় ভরা হল-এ শুরুতেই ছাত্রছাত্রীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন রাজ্যপাল। বলেন, “যা হয়েছে, সে জন্য প্রথমেই আমি রাজ্যের সব ছাত্রছাত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি নিজে দেখব, এমনটা যেন আর কখনওই না হয়।” প্রেসিডেন্সিকে উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, এই ঘটনা সেই উদ্যোগে একটা দাগ বলে মন্তব্য করে ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এমন ঘটনা নজিরবিহীন। আপনারা একেবারে প্রথম সারির পড়ুয়া। পরশুর (বুধবার) ঘটনা ছিল নক্ষত্রের কাছাকাছি পৌঁছনোর দৌড়ে আপনাদের গতি রুদ্ধ করার চেষ্টা।”
এ ভাবে জবরদস্তি ক্যাম্পাসে ঢুকে হামলা চালানোর ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন বলে রাজ্যপাল জানান। পাশাপাশি, কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রছাত্রীদেরও রুখে দাঁড়াতে বলেন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে দেশের প্রাক্তন মুখ্য নিরাপত্তা উপদেষ্টা পুলিশের উপরেই ভরসা রাখার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, “পরিস্থিতি চরমে না-পৌঁছলে কর্তৃপক্ষ পুলিশ ডাকতে চান না। কিন্তু তত ক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়। গুন্ডারা এটা জানে। তারা সেই সুযোগটা নেয়।”
বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তিনি যে আরও বেশি সংখ্যায় পুলিশ মোতায়েনের পক্ষপাতী, তা-ও এ দিন জানিয়ে দেন রাজ্যপাল। পাশাপাশি এ-ও জানান, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দিলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে পুলিশ যাতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে, সে দিকটি নিয়েও তিনি পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
বুধবারের ভাঙচুর।—ফাইল চিত্র
প্রেসিডেন্সিতে হামলার ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দিকে। অন্য দিকে, তৃণমূলের অভিযোগ, বন্ধ ফটকের ও-পার থেকে ইট ছুড়ে প্ররোচনা দিয়েছিল প্রেসিডেন্সির ছাত্ররাই। পার্থবাবু এ দিনও উস্কানি দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “সে দিন প্রেসিডেন্সির ভিতর থেকে কারা ইট ছুড়ল, কারা ভিতরে ঢুকেছিল, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দরকার আছে।”
রাজ্যপাল অবশ্য এ দিন সেই দলাদলির আবর্তে জড়াতে না-চেয়ে বলেছেন, কোনও রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করতে নয়, প্রেসিডেন্সির প্রতি সহানুভূতি জানাতেই তিনি ক্যাম্পাসে এসেছেন। বিস্মিত রাজ্যপালের মন্তব্য, “বরাবর শুনে এসেছি, পশ্চিমবঙ্গ মেয়েদের জন্য সব থেকে নিরাপদ জায়গা। কিন্তু উপাচার্য আমাকে জানিয়েছেন, সে দিন ক্যাম্পাসে চড়াও হয়ে অনেকে ছাত্রীর সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছে। বাংলার সংস্কৃতির কী হল! এ সব কেন হল, কোন দল করেছে, আমি জানি না।”
শুধু নিজে বলা নয়, ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের জবাবও এ দিন দিয়েছেন রাজ্যপাল। ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে প্রশ্ন করেন: হামলার ঘটনায় টিএমসিপি-র জড়িত থাকার প্রমাণ মিললেও তৃণমূলের নেতারা কেন সে কথা অস্বীকার করছেন? হামলার সময় পুলিশ কেন নিষ্ক্রিয় ছিল? দিল্লিতে মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর উপরে হামলার বদলা নিতে কেন প্রেসিডেন্সিকে আক্রমণ করা হল? কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্রের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করল তৃণমূল? ধৈর্য ধরে এই রকম মোট ছ’টি প্রশ্নের উত্তর দেন নারায়ণন।

ইতিহাস-ভূগোল
তোমরা এক জন অসাধারণ উপাচার্য পেয়েছ। আমি ওঁকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করেছি। ওঁর যোগ্যতা, দায়িত্ববোধ সম্বন্ধে আমার ধারণা আছে। যাঁরা কিছু করেন না, তাঁরা ব্যক্তিকে আক্রমণ করেন। আমি নিজে প্রায় ৬০ বছর ‘পাবলিক ফিগার’ থেকেছি। তাই জানি, এই ধরনের পদে থেকে প্রশংসা পাওয়া যায় না, বরং আক্রান্ত হতে হয়। যাঁরা এটা করেন, তাঁরা আসলে ইতিহাসকেই ধ্বংস করেন।
রাজ্যপাল
ওঁর ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান দেখে নিন। উনি কী ছিলেন, খুঁজে দেখুন। উপাচার্য নিজে মিছিলে নেমে গেলেন, ছাত্রদের সঙ্গে বসে গেলেন, এই রেওয়াজ তো আগে কখনও দেখেনি।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়
কে মালবিকা
প্রেসিডেন্সির ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। তার পর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লেয়ার হলে। পরে সেখানে অতিথি অধ্যাপকও। ২০০৩ থেকে সেখানকার আজীবন সদস্য। অধ্যাপনা মূলত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ ইংরেজি বিভাগের প্রধান। ইউজিসি, নাক-সহ উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত বহু সংস্থার সদস্য ছিলেন। ব্রিটেন- আমেরিকায় অজস্র শিক্ষা-সফর। গবেষণাপত্র পড়েছেন বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। ‘সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন রোম্যান্টিক লিটারেচার’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। একাধিক বই লিখেছেন। সাম্প্রতিকতম বই ‘কসমস অ্যান্ড ক্যারেক্টার ইন প্যারাডাইস লস্ট’ প্রকাশিত গত বছর জুনে।
পুলিশ যাওয়ায় উত্তেজনা রাতে
শুক্রবার রাতে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দারোয়ানকে থানায় ডেকে আনতে গিয়ে ফের বিতর্কে জড়াল পুলিশ। রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ দুই পুলিশ অফিসার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সন্তোষ সিংহ ওরফে পাপ্পুকে তাঁদের সঙ্গে থানায় যেতে বলেন। রাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ দেখে উত্তেজনা ছড়ায়। খবর যায় রেজিস্ট্রার প্রবীর দাশগুপ্তের কাছে। পরে তিনি বলেন, “আমি পাপ্পুকে থানায় যেতে নিষেধ করি। পুলিশ অফিসারদেরও অনুরোধ করি ওঁকে থানায় না নিয়ে যাওয়ার জন্য।” শেষ পর্যন্ত পাপ্পুকে আর থানায় নিয়ে যায়নি পুলিশ।

পুরনো খবর:
 
 
 


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.