একটি অপরাধে যাহারা জড়িত, তাহাদের সকলের দায়িত্ব কি সমান? যাহারা অপরাধের মূল কারিগর, তাহাদের দায় যতখানি, যাহারা সেই কারিগরদের পরিকল্পনা অনুযায়ী দুষ্কর্ম সম্পাদন করে তাহাদের দায় কি ততখানি হইতে পারে? রাঘববোয়ালদের সহিত চুনোপুঁটির দর সমান হইবে কি? মুম্বই বিস্ফোরণের মামলার রায় জানাইতে গিয়া সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা মন্তব্য করিয়াছেন, যে অভিযুক্তরা কর্মহীন, সামাজিক সুযোগসুবিধা হইতে বঞ্চিত অবস্থায় জীবন কাটাইত, মূল ষড়যন্ত্রীরা যাহাদের আপন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহার করিয়াছে, তাহাদের পক্ষে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই বিধেয়। অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড তাহাদের ক্ষেত্রে বিধেয় নহে। এই বিশেষ মামলায় আদালতের এই বিশেষ বিধানের যাথার্থ্য লইয়া নিশ্চয়ই তর্ক চলিতে পারে। আজমল কসাবের ক্ষেত্রে যে দণ্ড নির্দিষ্ট হইয়াছিল, তাহার যৌক্তিকতা সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের ধোপে টিকিবে কি না, সেই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু অপরাধের দায়ভাগ সম্পর্কে আদালতের অভিমতটির গুরুত্ব এই বিশেষ মামলাটির পরিসরেই সীমিত নহে, এই অভিমতের সূত্রে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন ওঠে: অপরাধী মাত্রেই কি প্রকৃত অপরাধী? ইহা আইনের প্রশ্ন নহে, নীতির প্রশ্ন, দর্শনের প্রশ্ন।
প্রশ্নটি এই বৃহৎ অর্থে তুলিবামাত্র অনেকেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বলগ্নের সেই প্রসিদ্ধ কথোপকথনটি স্মরণ করিবেন। অর্জুনের অপরাধবোধজনিত ক্লৈব্য দূর করিবার জন্য শ্রীকৃষ্ণ অষ্টাদশ অধ্যায়ব্যাপী যুক্তি সংশ্লেষ করিয়া এবং অবশেষে বিশ্বরূপ দেখাইয়া যাহা বুঝাইয়াছিলেন তাহার একটি প্রধান মর্মকথা: যাহা ঘটিবার তাহা আমি আগে হইতেই স্থির করিয়া রাখিয়াছি, তুমি এবং বিশ্বচরাচরের বাকি জীবেরা নিমিত্তমাত্র। এই তত্ত্ব আক্ষরিক অর্থে স্বীকার করিলে কোনও অপরাধের দায়ই আর কোনও অপরাধীর উপর বর্তায় না নিমিত্তমাত্রের আবার দায় কীসের? অবশ্যই এই তত্ত্ব আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করিবার নয়, ইহার তাৎপর্য লইয়া বহু প্রাজ্ঞ বহু যুগ ধরিয়া তর্ক করিয়াছেন, আরও করিবেন। কিন্তু কর্মের দায় এবং দায়িত্ব লইয়া যে প্রশ্নটি এই তর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে, তাহাকে উড়াইয়া দেওয়ার কোনও উপায় নাই। পৃথিবীতে অহরহ অগণিত অন্যায় সংঘটিত হইয়া চলিয়াছে। তাহাদের কোনটির জন্য কে কতটা দায়ী, তাহার বিচার অত্যন্ত জটিল এবং বিবেচনাসাপেক্ষ।
এই জটিল প্রশ্নটিকে নানা দিক হইতে বিচার করা যায়। সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্যের সূত্র ধরিয়া একটি বিশেষ দিক বিবেচনাযোগ্য। এই বিশেষ মামলাটির কথা এখানে বলা হইতেছে না, সাধারণ ভাবে প্রশ্ন তোলা যায়: দরিদ্র, কর্মহীন, সুযোগবঞ্চিত কোনও ব্যক্তি যদি অপরাধের শরিক হয়, অপরাধের দায়ভাগ কতখানি সেই ব্যক্তির, কতখানি সমাজের? ইহার একটি প্রতিপ্রশ্ন অনিবার্য: সামাজিক সুযোগ না পাইয়াও বহু ব্যক্তি তো সৎ পথেই জীবন যাপন করেন, তাহা হইলে তুলনায় অনেক কমসংখ্যক অপরাধীর জন্য কেন সমাজের দোহাই পাড়া হইবে? ইহার উত্তর সন্ধান করা কঠিন নয়। অপরাধীর অপরাধকে লঘু করিবার কোনও প্রস্তাবনা এখানে করা হইতেছে না, কেবল তাহার দায়ভাগের কথা বলা হইতেছে। সত্য ইহাই যে, একটি ভাল সমাজ যত অপরাধীকে সৃষ্টি ও লালন করে, একটি মন্দ সমাজ আপেক্ষিক ভাবে তাহার তুলনায় অনেক বেশি অপরাধীকে ধারণ করিয়া থাকে। ব্যক্তি-অপরাধীর দায়িত্ব এতটুকু অস্বীকার না করিয়াও সমাজের দায়িত্বের কথা স্বীকার করা বিধেয়। সুপ্রিম কোর্টকে ধন্যবাদ। |