ব্যাগ গুছিয়ে...
রঙিন দ্বীপান্তর
পোর‌্টব্লেয়ারে এক বৃষ্টিভেজা ভোরে হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল দূরের ঝাপসা পাহাড়শ্রেণি। সারা রাত ধরে অল্পবিস্তর বৃষ্টি হয়েছে। খুব সকালে বেরিয়ে পড়েছি। যাব দক্ষিণ আন্দামান থেকে উত্তর আন্দামানের পথে। দক্ষিণ আন্দামানের সদর শহর পোর্টব্লেয়ার থেকে রঙ্গত, মায়াবন্দর হয়ে একেবারে আন্দামানের উত্তরতম প্রান্ত ডিগলিপুরে।
পাহাড়, সমুদ্র আর জঙ্গল এই তিনের মেলবন্ধনে সাজানো আন্দামানের রূপ, রস, বৈচিত্র মাতোয়ারা করে দিচ্ছে এখানকার মাটিতে পা দেওয়া থেকেই। নির্জন মসৃণ রাস্তায় গাড়ি তীব্র বেগে এগিয়ে চলেছে। পাশে দ্রুত সরে সরে যাচ্ছে পটভূমি। সিপ্পিঘাট, তুশনাবাদ পেরিয়ে জিরকাটাং চেকপোস্টে পৌঁছে গেলাম সওয়া ঘণ্টার মধ্যেই। এখান থেকেই শুরু ‘জারোয়া ট্রাইবাল রিজার্ভ’। তার বিস্তৃতি এর পর ১৫০ কিলোমিটার দূরবর্তী কদমতলা অবধি। অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে বেশ কিছু গাড়ির কনভয় একসঙ্গে যায় এ পথে। সঙ্গে থাকেন নিরাপত্তারক্ষী। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়েই গাড়ির এগিয়ে চলা। আদিম এই জঙ্গলের মধ্যে আবার আদিম মানবের বসবাস। তথাকথিত ‘মানবসভ্যতা’র বাইরে থাকা অনাবৃত শরীরের এই মানুষগুলো যে-সমাজ বা যে-সভ্যতার অংশীদার, তা আমাদের অচেনা, অজানা। তাই এই আদিম মানব-দর্শনে আমাদের মহাবিস্ময়। জারোয়ারা অবশ্য এখন আর আগের মতো হিংস্র নন। বাইরের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সংস্পর্শে তাঁরা এখন অল্প অল্প হিন্দি কথা বলেন, খাবারদাবারও চান। কিন্তু জারোয়াদের ছবি তোলা বা খাবার দেওয়া কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।
চলার পথে বেশ কিছু জারোয়া ছেলেমেয়ে চোখে পড়ল। সদ্য শিকার করা মরা শুয়োর-হাতে জারোয়াও দেখা গেল। চোখে পড়ল ছাউনির তলায় বসা রন্ধনরত জারোয়ার এক দল। আর দেখলাম এক জারোয়া পরিবার। স্বামী, স্ত্রী আর খুদে দুটো বাচ্চা।
‘রুকো’, রুকো’ বলে বাচ্চা দুটো দেখলাম দৌড়ে আসছে গাড়ির পেছন পেছন। বোধহয় খাবার বা লজেন্স চাইছে। কিন্তু দেওয়ার যে উপায় নেই। অনেকটা দৌড়েও তাই হতাশ বাচ্চাগুলো এক সময় দাঁড়িয়ে পড়ল।
যাত্রাপথ যেমন মনোরম, তেমনই বৈচিত্রে ভরা এখানে। কখনও মসৃণ রাস্তায় ঊর্ধ্বশ্বাসে গাড়ির দৌড়, কখনও পাহাড়ি রাস্তার মতো উঁচু-নিচু, কখনও রাস্তার শেষে ফেরিতে গাড়িসুদ্ধ পেরিয়ে জলের ওপরে নামা। কখনও ঘনঘোর জঙ্গল, কখনও বা ছোট গ্রামের পাশ দিয়ে পথ চলা। এ ভাবেই ফেরি পেরিয়ে এক সময়ে পৌঁছলাম বারাটাং জেটি। সেখান থেকে আবার স্পিডবোটে ১৫ মিনিটের রোমাঞ্চকর যাত্রায় লাইমস্টোন গুহা। স্ট্যালাগটাইট ও স্ট্যালাগমাইট-এর বিবিধ গঠনে অন্ধকার গুহায় অনন্তনাগ, গণেশ, শিব, পদ্মফুল এ ধরনের বিভিন্ন আকৃতি তৈরি হয়ে রয়েছে। ফেরার পথে নামল ঝেঁপে বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ভিজে একশা হয়েই (বোটে কোনও আচ্ছাদন নেই) ফিরলাম উল্কার গতিতে সেই স্পিডবোটে চেপে।
পথে ‘মাড ভলক্যানো’ দেখে পৌঁছে গেলাম রঙ্গতের একটু আগে আম্রকুঞ্জ সৈকতে। সবুজ ঘাসপালার ঠাসবুনোটে চারপাশের পাহাড়ের রংও সবুজাভ, সাগরের জলেও তাই সে রঙেরই আধিক্য। রঙ্গতের আর এক সৈকতও দেখে নিলাম অন্ধকার নামার আগেই। কাটবার্ট বে। প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে হাজারে হাজারে ‘অলিভ রিডলে’ কচ্ছপ এখানে ডিম পাড়তে আসে। তখন সে দৃশ্য দেখাটা বাস্তবিকই এক বিরল অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।
রঙ্গতের সরকারি হোটেলে রাত্রিবাস করে পর দিন খুব ভোরেই আবার বেরিয়ে পড়েছি অভীষ্ট গন্তব্যে। এক দিকে সবুজ পাহাড়, আর এক দিকে নীল সমুদ্র। রাস্তার পাশে দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট বাঙালি জনপদ, বাজার এলাকা।
পানিঘাটের লখনউ জংশনে ডিগলিপুরের সোজা রাস্তা ছেড়ে ডান দিকে ঢুকে পড়লাম মায়াবন্দরের পথে। খুব বড় জায়গা নয় মায়াবন্দর। পাহাড়ে ঘেরা, নারকেল গাছে মোড়া রামপুর সৈকত কিংবা সোনালি বালির দৃষ্টিনন্দন কারমাটাং সৈকত ভাল লাগবেই। কারমাটাং সৈকতকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে সৈকতের ধারে সুন্দর বসার জায়গা আর নিরিবিলি পরিবেশে সাজানো-গোছানো ইকো পার্ক। তবে মায়াবন্দরের হেলিপ্যাড (যার এক দিকে সমুদ্র, আর এক দিকে ব্যাক ওয়াটার) কিংবা পূর্ত দফতরের অতিথিশালার চত্বর থেকে দেখা চার পাশের নৈসর্গিক দৃশ্য মন ভরিয়ে দিল কানায় কানায়।
এগিয়ে চললাম ডিগলিপুরের পথে। পোর্টব্লেয়ার থেকে পুরো রাস্তাটাই হল ‘আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড’। সংক্ষেপে ‘এটিআর’। কালারা জংশন থেকে মূল রাস্তা ছেড়ে বেশ কিছুটা গিয়ে পৌঁছলাম রামনগর সৈকতে। এখানেও ডিসেম্বর থেকে মার্চ ডিম পাড়তে আসে কচ্ছপের দল। হ্যাচারিতে সেই ডিমগুলি বালির নীচে রেখে তার থেকে কচ্ছপ জন্মানো পর্যন্ত পুরো পদ্ধতিটাই সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করা হয় এই ‘টার্টল নেস্টিং সাইট’-এ। নিঝুম নিরালা সৈকতটি অনেকটাই অর্ধচন্দ্রাকৃতি। তীরে সুন্দর করে সাজানো ইকো পার্ক। সৈকতদর্শন শেষে ফেরার পথে দেখে নিলাম আন্দামানের একমাত্র নদী কালপং-এর উপর তৈরি হওয়া জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটিও।
পাহাড়ে ঘেরা ডিগলিপুরে ঢুকতেই চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। বাঙালি-অধ্যুষিত এই এলাকাটিতে প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু ও ধান উৎপন্ন হয়। রাস্তার ধারে সবুজ খেত আর তার পিছনেই পাহাড়। বাজার এলাকা ছাড়িয়ে কালীপুর সৈকতের পাশে সরকারি আবাসে রাত্রিবাসটাও হল বেশ আরামদায়ক।
সকালে বেশ একটা ঠান্ডার আমেজ নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। পাশেই কালীপুর সৈকত। এখানেও দেখলাম কচ্ছপের ডিম প্রতিপালনের হ্যাচারি। বড় বড় কালো পাথর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে জলের ওপর। সুন্দর সৈকত এবং ততোধিক সুন্দর এর নির্জনতা। সৈকত থেকে এর পর গাড়ি নিয়ে কিছু দূর গিয়ে গাড়ি ছেড়ে পদব্রজে কিলোমিটারখানেক মনোরম বনপথে হেঁটে পৌঁছলাম নানা রঙের নুড়ি-পাথরে ভর্তি ‘লামিয়া বে’ সৈকতে। যেন পাহাড় আর সমুদ্রের মধুর মিলন। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দূরে স্যাডল শৃঙ্গ (উচ্চতা ৭৩২ মিটার), যেটা আবার সমগ্র আন্দামানেরই ‘সর্বোচ্চ শৃঙ্গ’ বলে পরিচিত। এখান থেকে হাঁটাপথে স্যাডলের পাদদেশ বড়জোর চার কিলোমিটার। কিন্তু সে-পথে নয়, এ বারে যাব ডিগলিপুরের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ‘রস অ্যান্ড স্মিথ’ দ্বীপ দেখতে।
রথ এবং স্মিথ দুটি যমজ দ্বীপ বলা হলেও আসলে এরা একটাই দ্বীপ, বালির চর দিয়ে জোড়া। জোয়ারে সে চর ডুবে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দ্বীপের দু’টি অংশ বড়টি ‘স্মিথ’ ও ছোটটি ‘রথ’ নামে পরিচিত। ‘এরিয়াল বে’ জেটিতে বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে ভেসে পড়লাম স্পিডবোটে। কুড়ি মিনিটের মনমাতানো যাত্রাপথের শেষে বোট থেকে নামলাম যেখানে, সেখানে হাঁটুজল। স্বচ্ছ জলে রঙিন মাছ প্রায় পায়ের পাশ দিয়েই বেরিয়ে যাচ্ছে। এ-দিকের সবুজাভ শান্ত জলের (ব্যাকওয়াটার) শেষেই রুপোলি বালির উপর দিয়ে দু’পা হেঁটে যেই না খানিকটা এগিয়েছি, অমনি যেন ও-দিকের এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্যপটের ওপর থেকে পর্দা উঠে গেল। তরঙ্গায়িত সে বিস্তীর্ণ সমুদ্রের জল যে কত রকমের রঙে রঙিন, তা বলে বোঝানো কঠিন। হালকা নীল, তীব্র নীল, ফিরোজা, শ্যাওলা-নীল...চোখ যেন জুড়িয়ে যায় এই অনাবিল সৌন্দর্যের সামনে! পায়ে হেঁটে ঘুরে নিলাম প্রায় পুরো সৈকতটাই। দুর্দান্ত দেখতে সব ঝিনুক, শঙ্খ, প্রবাল মণিমাণিক্যের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কুমারী সৈকতে। জলের আলতো ছোঁয়ায় কখনও বা মৃদু কম্পন ধরে তাতে, কখনও বা জলই তাদের টেনে নিয়ে যায় গভীরে। সৈকতে গাছপালার ফাঁকে মাথার ওপর শেড দেওয়া মনোরম বসার জায়গাও আছে কয়েকটা। সেখানে বসেই তাকিয়ে রইলাম সামনের এই চোখধাঁধানো সুন্দরের দিকে। ভোলার নয় এই দৃশ্য, ভোলার নয় এই মুহূর্ত!

কী ভাবে যাবেন
সড়কপথে পোর্টব্লেয়ার থেকে রঙ্গত ১৭০ কিমি, মায়াবন্দর ২৪২ কিমি আর
উত্তর আন্দামানের সদর শহর ডিগলিপুর ৩২৫ কিমি। সড়কপথ ছাড়া
পোর্টব্লেয়ার থেকে জাহাজেও পৌঁছনো যায় এই সব জায়গায়।
কোথায় থাকবেন
ডিগলিপুর, মায়াবন্দর, রঙ্গত সব জায়গাতেই সরকারি-বেসরকারি
বিভিন্ন হোটেল আছে। তবে পোর্টব্লেয়ারের তুলনায় হোটেলের সংখ্যা অনেকটাই কম।

রঙিন দ্বীপান্তর




অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.