ব্যাগ গুছিয়ে...
রঙিন দ্বীপান্তর
‘উই আর অ্যাপ্রোচিং পোর্ট ব্লেয়ার’ বিমানের ককপিট থেকে মাইকে যেই ভেসে এল পাইলটের গলা, পাশের জানলা দিয়ে নীচের দিকে তাকালাম। দমদম থেকে ঘণ্টা দু’য়েকের উড়ানে এত ক্ষণ যেটা ছিল শুধুই কালচে নীল রঙের সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে চলা, এখন দেখছি কিছু কিছু দ্বীপ চোখে পড়ছে, অনেক নীচে। প্রবালের আধিক্যের জন্য তার কাছাকাছি জলের রংও গেছে পালটে। কোথাও উজ্জ্বল ফিরোজা, কোথাও সবুজ, কোথাও বা শ্যাওলা নীল। দেখতে দেখতে বিমানের চাকা মসৃণ ভাবে ছুঁয়ে ফেলল পোর্ট ব্লেয়ারের ‘বীর সাভারকর এয়ারপোর্ট’-এর মাটি।
প্রায় ৫৭২টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। টলেমি ও মার্কো পোলোর ভ্রমণবৃত্তান্তে যেমন এর উল্লেখ পাওয়া যায়, তেমনই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও এক উল্লেখযোগ্য ইতিহাস রচনা হয়েছে আন্দামানকে ঘিরে। তবে এই সব ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়াও, শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্রের বিচারেই আন্দামান অতুলনীয়। পাহাড় ও সমুদ্রের এক অসামান্য কোলাজ এখানে আছে। ভারতের একমাত্র জীবন্ত আগ্নেয়গিরি ব্যারেন আইল্যান্ড এখানেই অবস্থিত। বিস্ময় উদ্রেককারী জারোয়া, সম্পেন, ওঙ্গি, নিকোবরি প্রভৃতি আদিবাসীর বসবাসও এই দ্বীপপুঞ্জেই। পর্যটকের কাছে আন্দামানের আকর্ষণও তাই অপ্রতিরোধ্য।
হোটেলে মালপত্র রেখে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথম গন্তব্য ইতিহাসের টানে, সেলুলার জেল। স্বাধীনতা সংগ্রামের কত যে উজ্জ্বল, বর্ণময় চরিত্রকে ‘কালাপানি’ পেরিয়ে পাঠানো হয়েছিল এই জেলে তার ইয়ত্তা নেই, যাঁদের মধ্যে এক বড় অংশই ছিলেন বাঙালি বিপ্লবী। পা শিকল বা রডের সঙ্গে বেঁধে, নিয়মিত চাবুক মেরে, খেতে না দিয়ে, কী নৃশংস ভাবে বিপ্লবীদের ওপর অত্যাচার চালাত তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকেরা, বিভিন্ন মডেলের মাধ্যমে সে সব দেখানো আছে সেলুলার জেলের মিউজিয়ামে।
পাশেই ফাঁসিঘর। এক সঙ্গে তিন জন বিপ্লবীকে ফাঁসি দেওয়া হত এখানে।
তিন তলাবিশিষ্ট শেলের ছোট ছোট খুপরিতে কত যে বিপ্লবী জীবনের শেষ প্রহর গুনেছেন, সে দিকে তাকালেই চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে আসে। সন্ধের লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর মাধ্যমেও জেনে নেওয়া যায় ইতিহাসের সেই করুণ অধ্যায়।
সেলুলার জেলের কাছেই মেরিনা পার্ক ও রাজীব গাঁধী ওয়াটার স্পোর্টস কমপ্লেক্স।
সন্ধের সময় এ জায়গাটা বেশ মনোরম।
মৃদুমন্দ হাওয়া, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সমুদ্রে ভাসমান বোটের বা দূরের দ্বীপ থেকে আসা ক্ষীণ আলো সব মিলিয়ে সময়টা কাটবে চমৎকার।
কেন্দ্রশাসিত আন্দামানে এই পোর্ট ব্লেয়ার হল দক্ষিণ আন্দামানের সদর শহর। যত প্রশাসনিক দফতর সব এখানেই। সারা ভারতের লোকেরই দেখা মিলবে এখানে, তবে আধিক্য অবশ্যই বাঙালি ও দক্ষিণ ভারতীয়দের। আবেরদিন বাজার হল পোর্ট ব্লেয়ারের কেন্দ্রস্থলে। উঁচু ক্লক টাওয়ারটি যেন আবেরদিন বাজারের একটা চেনা ল্যান্ডমার্ক। প্রচুর দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, হোটেল সব মিলিয়ে দেশের আর পাঁচটা ঘিঞ্জি শহরের মতোই এই বাজার এলাকা। কিন্তু গাড়ি নিয়ে ১০-১৫ মিনিট দূরে গেলেই আবার নির্জনতা, আবার সমুদ্র, আবার মন কেমন করা। সমুদ্র আর নেই-সমুদ্রের এই যে লুকোচুরি, এটাই বেশ উপভোগ্য এখানে। মসৃণ রাস্তা কোথাও উঠে গেছে তো কোথাও ঢালু হয়ে নেমে গেছে। মনে হয় বোধহয় পাহাড়েই আছি।
পর দিন সকালেই বেরিয়ে পড়েছি জলিবয় দ্বীপের উদ্দেশে। বিখ্যাত প্রবাল দ্বীপ, পথে দেখে নিলাম সিপ্পিঘাট ফার্ম। নানা ধরনের ফুল, গাছ, অর্কিডের সমাহার এই ফার্মে। ফার্ম দেখে পোঁছলাম ওয়ান্ডুর জেটি (পোর্ট ব্লেয়ার থেকে দূরত্ব ২০ কিলোমিটার)। এখান থেকে বোটে চেপে সোজা জলিবয়। অসাধারণ রঙের খেলা জলিবয়ের জলে। কত যে তার বৈচিত্র বলে বোঝানো যাবে না। তার মধ্যেই চলছে হরেক মজার জলক্রীড়া। স্নরকেলিং, স্কুপ ডাইভিং, ওয়াটার স্কুটার সব মিলিয়ে সব পর্যটককেই দেখলাম আনন্দে উচ্ছ্বল। গ্লাস বটম বোটে চেপে দেখলাম সমুদ্রের তলার আশ্চর্য ও বিস্ময়কর জগৎ। রংবেরঙের মাছ ও বৈচিত্রময় প্রবালের বিপুল সমাহার এককথায় চমৎকার। বোটে ফেরার সময়ে সমুদ্রে উড়ুক্কু মাছের উড়ানের বিরল দৃশ্যও চোখে পড়ল। ঘোরার ফাঁকেই দেদার চলছে সুস্বাদু কিং কোকোনাট (বড় ও বিশেষ ধরনের ডাব, যেটা আন্দামানে পাওয়া যায়) ভক্ষণপর্ব।
ওয়ান্ডুর বিচে যাওয়ার বা ফেরার পথে হামফ্রেগঞ্জে দেখে নিতে পারেন গোপাল সাহার মঙ্গলুটন রবার প্লান্টেশন প্রকল্প ও মশলার বাগান। প্রতি দিন অসংখ্য পর্যটক এই রবার ও মশলার বাগান দেখতে আসেন। রবার চাষ থেকে শুরু করে গোটা প্রক্রিয়াকরণ পর্ব পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখান এখানকার নিজস্ব গাইড। বাগানে ১০ হাজার রবার গাছ, ১০ হাজারেরও বেশি সুপারি গাছ, ২০০ লবঙ্গ গাছ, দারচিনির গাছ হাজার তিনেক, হাজারখানেক গোলমরিচ গাছ, ৫০-৬০টি জায়ফল গাছ ছাড়াও রয়েছে তিন হাজার নারকেল গাছ এবং পাঁচশোরও বেশি কাজু গাছ। বাগানের কাউন্টার থেকে এই সব মশলাও বিক্রি হয়। গোপালবাবু বললেন, “প্রথমে আমার বাবা এই বাগান পত্তন করেন। তখন এটা জঙ্গল ছিল। কালক্রমে রবার গাছের পাশাপাশি নানা মশলার গাছও লাগানো হয়েছে।”
ওই বাগান ছাড়াও অ্যানথ্রোপলজিক্যাল মিউজিয়াম, অ্যাকোয়ারিয়াম দেখে দিনের সফর শেষ করলাম করবাইন্স কোভ সৈকতে। আন্দামানে সব সৈকত স্নানযোগ্য নয়। তবে এখানে দেখলাম বহু মানুষই জলে আনন্দ-অবগাহনে মত্ত।
পোর্ট ব্লেয়ারে শেষ দিনটা শুরু হল রস আইল্যান্ড দিয়ে। ব্রিটিশ বসতির ধ্বংসাবশেষ অনেকটা এলাকা জুড়ে। পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখতে হয়। ইতিউতি হরিণের আনাগোনা। মাঝে মাঝে তীব্র নীল রঙা সমুদ্রের দর্শন। পরের গন্তব্য ‘চাথাম স মিল’। ১২৫ বছরের প্রাচীন ব্রিটিশ আমলের এই কাঠচেরাই কারখানাটি সমগ্র এশিয়াতেই সব থেকে পুরনো। এখনও নিয়মিত চলে কাঠচেরাইয়ের কাজ। চাথাম থেকে গাড়ি চলে এল মাউন্ট হ্যারিয়েটের চূড়ায়। আন্দামানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এটাই। ঘন সবুজ গাছপালা সমৃদ্ধ পর্বতচূড়ার ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারধারের দৃশ্য মুগ্ধ করে দিল।
এই কারণেই বোধহয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে আন্দামান। তপন সিংহের ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’র পরে সে ভাবে আন্দামানের দিকে নজর না পড়লেও এখন বাংলা ছবির ক্যামেরার ঠিকানায় আবার উঠে আসছে আন্দামান।
পর্বতচূড়া থেকে এ বারে একদম সমুদ্র সৈকতে। মাউন্ট হ্যারিয়েট থেকে সটান চিড়িয়াটাপু। আন্দামানের মজা এটাই। যেটা আর কোথাও নেই। চিড়িয়াটাপুর কিছুটা আগে বর্মানালার কাছে বেদ্নাবাদে গড়ে উঠেছে ‘রোজভ্যালি রিসর্ট’। অনবদ্য পরিবেশ, বিলাসবহুল ঘর, আকর্ষণীয় মাল্টিকুইজিন রেস্তোরাঁ, আরামদায়ক স্পা সব মিলিয়ে এই রিসর্ট। নবদম্পতির মধুচন্দ্রিমা যাপনের জন্য তো বটেই, যে কোনও বয়সের মানুষের জন্যই পোর্ট ব্লেয়ারে এই রিসর্ট এক মধুর অভিজ্ঞতা হতে পারে। এদের ব্যবস্থাপনায় ঘুরে নেওয়া যেতে পারে সমগ্র আন্দামানও। এ ছাড়া, পর্যটক-স্বাচ্ছন্দ্যের আরামটুকু নেওয়ার জন্য থাকা যেতে পারে ‘হোটেল শ্রীশ’-এর মতো বেশ কয়েকটি জায়গাতেও।
চিড়িয়াটাপুতে যখন পৌঁছলাম দিবাকর তখন প্রায় অস্তগামী। সামনে অগাধ জলরাশিতে ডুবন্ত সূর্যের লাল আভা। আকাশের অস্তরাগে রক্তিম মেঘপুঞ্জের এই যে স্বপ্নিল ভেসে যাওয়া, তীরে দাঁড়ালে একাকী পর্যটকের মনও বুঝি সেই সঙ্গে ফেরারি হয়ে যায়। তবে ফেরারি মনের সৌন্দর্যপিপাসা কিন্তু এই পরিসরে পুরোপুরি মেটে না। তার জন্য বাকি থেকে যায় আন্দামানের অন্যান্য প্রান্তের আরও অনেক চোখধাঁধানো ছবি।

কী ভাবে যাবেন
বিমানে কলকাতা থেকে দু’ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন পোর্ট ব্লেয়ার।
জাহাজে যেতে গেলে সময় লাগবে চার রাত্রি পাঁচ দিন। তবে জাহাজ
চলাচলের অনিশ্চয়তার কারণে বিমানযাত্রাই এই পথে শ্রেয়।
কোথায় থাকবেন

পোর্ট ব্লেয়ারে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন হোটেল আছে বিভিন্ন দাম ও মানের।
মনে রাখতে হবে
নভেম্বর থেকে মে মাস অবধি খোলা থাকে প্রবাল দ্বীপ জলিবয়।
বছরের অন্য সময়ে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় অন্য এক প্রবালদ্বীপ রেডস্কিন্-এ।
বিমানে বা জাহাজে সামুদ্রিক প্রবাল নিয়ে আসা দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রিয়জনের জন্য আন্দামান-স্মারক কেনাকাটার জন্য যেতে পারেন সরকারি সাগরিকা এম্পোরিয়ামে।




অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.