ফার্মাসিস্ট নিয়ে ঢালাও দুর্নীতি, ভর্ৎসনা রাজ্যকে
শ্চিমবঙ্গের বহু বেসরকারি ওষুধের দোকানে ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ভাড়া খাটছে। কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল এই অভিযোগ এনেছে। রাজ্য ফার্মাসিস্ট কাউন্সিলও জানাচ্ছে, এমনটাই ঘটছে। কারণ, রাজ্যে ওষুধের দোকান লাখখানেক। আর নথিভুক্ত ফার্মাসিস্ট ১৩ হাজার! কাউন্সিলের কর্তাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য দফতরেরই অধিকাংশ ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ স্টোর চলছে ফার্মাসিস্ট ছাড়া। সরকারি হাসপাতালের ওষুধপত্র মজুত রাখার স্টোরেও কোনও ফার্মাসিস্ট নেই।
চাহিদা ও জোগানের এই বিপুল ফারাকের কথা সরকারের অজানা নয়। তবে একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর একাধিক দোকানে ভাড়া খাটার পিছনে অন্য কারণের কথা উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোল। তাদের অভিযোগ, লাভের অঙ্ক বাড়াতে রাজ্যে অধিকাংশ দোকান উপযুক্ত মাইনে দিয়ে ফার্মাসিস্ট রাখতে নারাজ। তারা দেড়-দু’ হাজার টাকার বিনিময়ে কোনও ফার্মাসিস্টের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ভাড়া নিয়ে রাখছে। যাতে পরিদর্শন হলে তারা ওই রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখিয়ে পার পেতে পারে। দোকানে আচমকা পরিদশর্র্নে আসা ড্রাগ ইনস্পেক্টরকে তারা বলছে, ফামার্সিস্ট সে দিন ছুটি নিয়েছেন বা একটু কাজে বেরিয়েছেন।
ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া জ্ঞানেন্দ্রনাথ সিংহ রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলকে ভর্ৎসনা করে বলেছেন, “গুজরাত, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক যা সাফল্যের সঙ্গে করতে পেরেছে পশ্চিমবঙ্গ তা পারেনি। আমরা রাজ্যকে হুঁশিয়ারি দিয়েছি। কথা না শুনলে এ বার ধরে-ধরে ওষুধের দোকানগুলো বন্ধ করা হবে।”
কিন্তু কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোলের এই হুঁশিয়ারি থেকেই শুরু বিতর্কের। রাজ্য ফার্মেসি কাউন্সিল, রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোল এবং ওষুধের দোকানের মালিকদের একাংশের প্রশ্ন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব বেসরকারি ওষুধের দোকানে ফার্মাসিস্ট নিয়োগের নিয়ম কতটা বাস্তবসম্মত? রাজ্য ফার্মেসি কাউন্সিলের খোলাখুলি মন্তব্য, “হ্যাঁ, অনেক ফার্মাসিস্ট একাধিক দোকানে রেজিস্ট্রেশন ভাড়া দিচ্ছেন। এ ছাড়া উপায় নেই। সরকার বছরের পর বছর চাকরি দিচ্ছে না। ওষুধের দোকানগুলিও তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী মাইনে দিতে অপারগ। তবু রেজিস্ট্রেশন ভাড়া দিয়ে দেড়-দু হাজার টাকা রোজগার হয়।”
রাজ্য ফার্মাসিস্ট কাউন্সিলের সাধারণ সচিব দীপক বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তাঁদের কাউন্সিলে বৈধ ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা রয়েছে এমন ১৩ হাজার ফার্মাসিস্টের নাম নথিভুক্ত। সেখানে রাজ্যে ওষুধের দোকান রয়েছে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ। এতেই তো সরকারের বোঝার উচিত যে প্রত্যেক দোকানে বৈধ ফার্মাসিস্ট রাখা হচ্ছে না। এই সূত্রে সরকারি হাসপাতাল ও ডিস্ট্রিক্ট রিজার্ভ স্টোরে ফার্মাসিস্ট না থাকার কথা মনে করিয়ে দেন তিনি।
প্রশ্ন উঠছে, এক বা একাধিক বৈধ ও নথিভুক্ত ফার্মাসিস্ট রয়েছেন বলে প্রমাণ দিতে পারলে তবেই কোনও ওষুধের দোকানকে লাইসেন্স দেয় ড্রাগ কন্ট্রোল। একই ফার্মাসিস্ট তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বর একাধিক দোকানে ব্যবহার করলে ড্রাগ কন্ট্রোলের কম্পিউটারে কেন ধরা পড়ে না? ঠিক যেমন রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে একই ঠিকানায় একাধিক কানেকশন থাকলে (তা সে আলাদা আলাদা সংস্থার হলেও) ধরা পড়ে যাচ্ছে। রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলই স্বীকার করছে, দোকানকে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি এখনও কম্পিউটারাইজড হয়নি! সব হয় কাগজপত্রে। এবং সেই সুযোগে নানা রকম ভাবে কারচুপি হয়। এক, পার পেয়ে যান অবৈধ ফার্মাসিস্টরা। দুই, বৈধ ফার্মাসিস্টরা অনেক দোকানে রেজিস্ট্রেশন নম্বর ভাড়া দেন। তিন, অজস্র দোকান রমরমিয়ে ব্যবসা করে যায় লাইসেন্স ছাড়াই। কার লাইসেন্স রিনিউ হল, কার হল না, সেটাও ভাল ভাবে বোঝার উপায় নেই।
রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোলার চিন্তামণি ঘোষের কথায়, “গুজরাতে কম্পিউটারে লাইসেন্স নথিভুক্ত করার প্রযুক্তি খুব আধুনিক। আমরা দ্রুত ওদের থেকে ওই প্রযুক্তি আনিয়ে চালু করব।” আর ফার্মেসি কাউন্সিলে মাত্র বছর দু’য়েক হল রেজিস্ট্রেশন নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া কম্পিউটারাইজড হয়েছে। এক মাত্র নতুনদের রেজিস্ট্রেশন তাতে তোলা হচ্ছে। ২ বছর আগে পর্যন্ত কার কবে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে তার হিসেব পাওয়াই ভার। ফলে, কারচুপির চার নম্বর পথটিও একেবারে অবাধ। এক জন একাধিক জায়গায় রেজিস্ট্রেশন করিয়ে রাখলেও ধরা অসম্ভব। ড্রাগ কন্ট্রোলের অফিসারদের একাংশ জানালেন দুর্নীতির পাঁচ নম্বর রাস্তাটি। তা হল, দীর্ঘদিন আগে মারা গিয়েছেন এমন ফার্মাসিস্টদের রেজিস্ট্রেশন নম্বরও অনেক দোকান ব্যবহার করে যাচ্ছে।
এই ঢালাও দুর্নীতি ধরার কোনও পরিকাঠামোই কি নেই? রাজ্যের ড্রাগ কন্ট্রোলার চিন্তামণি ঘোষের স্বীকারোক্তি, “এমনিতেই আমাদের ৫৯ ইনস্পেক্টরের পদ ফাঁকা। দোকানে অভিযানে যাওয়ার লোক নেই। যে ক’জন যান তাঁদের ওই রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখিয়ে বলা হয় ফার্মাসিস্ট খেতে গিয়েছেন বা ছুটিতে রয়েছেন। সব বুঝেও ইনস্পেক্টররা ফিরে আসেন। কী করে ধরব?” কিন্তু ওষুধ বিক্রেতাদের বৃহত্তম সংগঠন বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য, এক জন ডিগ্রি বা ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্টের যা মাইনে, ছোট দোকানের পক্ষে সেটা দেওয়া অসম্ভব। দিনে দু’শিফটে অন্তত ২ জন ফার্মাসিস্ট রাখতে হবে।
তবে কী ভাবে খুলতে পারে এই জট? ওষুধ বিক্রেতাদের সংগঠনের প্রস্তাব, যাঁদের ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা নেই, অথচ বহু বছর ওষুধের দোকানে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বৈধতা দেওয়া হোক। ঠিক যেমন গ্রামে চিকিৎসকের অভাব পূরণে হাতুড়ে চিকিৎসকদের সরকারি প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবি উঠছে দীর্ঘদিন ধরেই। কিন্তু এতে সায় নেই রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর বা কেন্দ্রীয় ড্রাগ কন্ট্রোলের। স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথীর বক্তব্য, “আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। দিলে ড্রাগ কন্ট্রোল দিক।’’ ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল জ্ঞানেন্দ্রনাথ সিংহের বক্তব্য, “ডিগ্রি বা ডিপ্লেমাধারী ছাড়া কাউকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সরকারি নিয়ম নেই।”
এই তরজার ফল: রাজ্যে আপাতত পরিবর্তন নেই ফার্মাসিস্ট নিয়ে ঢালাও দুর্নীতিতে। এবং চাপানউতোরে।

ফার্মাসিস্টে ফাঁকি
হাল
• দোকান লাখ খানেক, নথিভুক্ত ফার্মাসিস্ট ১৩ হাজার
• রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলে শূন্য ৫৯টি ইনস্পেক্টরের পদ
• দোকানের লাইসেন্স ব্যবস্থা কম্পিউটারাইজড নয়
• কম্পিউটারে নথিভুক্ত নন সিংহভাগ ফার্মাসিস্ট
হকিকৎ
• ফার্মাসিস্টের এক নম্বরে অনেক দোকান
• এক ফার্মাসিস্টের একাধিক নথিভুক্তি নম্বর
• বহু দোকান চলছে লাইসেন্স ছাড়াই
• দোকানের লাইসেন্সে মৃতের নম্বরও
• পার পাচ্ছেন অবৈধ ফার্মাসিস্ট
• অভিজ্ঞদের প্রশিক্ষণের রাস্তাও বন্ধ



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.