রবিবাসরীয় প্রবন্ধ
কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী
পগ্রহচিত্র দেখে মনে হয় বাইসেপস ফোলানো একটি বলিষ্ঠ বাহু। যেন বেশ কিছু টন ভর তোলার একটি নির্ভরযোগ্য সহায়। মানচিত্র দেখে মনে হয়, স্থলভূমি থেকে হঠাৎ করে একটা কোট ঝোলাবার হুক বেরিয়ে পড়ে সমুদ্রে ভাসছে। কেপ কড-এর কথা বলছি। উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে, আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে এই অন্তরীপটি ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের অন্তর্গত। ভেবে দেখলে, কেপ কডের বলিষ্ঠ বাহুটি সত্যিই যথেষ্ট শক্তিশালী, নইলে সে দিন, মানে সেই সুদূর ১৬২০ সালে ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে আসা ১০২ জন ধর্মপ্রাণ আগন্তুককে আশ্রয় দিতে পারত না। খ্রিস্টধর্মের পিউরিটান ধারার এই ‘ডিসেনটার’ অর্থাৎ প্রতিবাদীরা ছিলেন অ্যাংলিকান চার্চের বিরোধী। এই প্রতিবাদে তৎকালীন নৃপতি বিপদের লক্ষণ দেখে ভীত হন। অতএব ওঁরা ইংল্যান্ড ছাড়তে বাধ্য হলেন। ১৬২০ সালের অগস্ট মাসে ‘মেফ্লাওয়ার’ ও ‘স্পিডওয়েল’ নামের দু’টি জাহাজ বোঝাই মানুষ ইংল্যান্ডের সাউথহ্যাম্পটন থেকে পাড়ি দিলেন অজানা আমেরিকার উদ্দেশে। পরবর্তী ইতিহাস তাঁদের মনে রাখবে ‘পিলগ্রিম’ নামে।
সম্ভবত তাঁদের লক্ষ্য ছিল নিউ ইয়র্ক। কেননা, তাঁরা জানতেন এই নতুন পৃথিবীর ওই অঞ্চলে ইউরোপীয় বসতি ছিল। ‘স্পিডওয়েল’ জাহাজটি আটলান্টিক সমুদ্রে কিছু দূর যাওয়ার পর যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে আসে। কিন্তু ‘মেফ্লাওয়ার’ নানা বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আটলান্টিক অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। ৬৭টি প্রতিকূল দিন ও রাত্রি অতিক্রান্ত করে নভেম্বর মাসে উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছেছেন যখন, সমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড় উঠল, তার ওপর অসহনীয় শীত। উপায়ান্তর না দেখে কেপ কড অঞ্চলের প্রভিন্সটাউন-এ তরী ভেড়ালেন ওঁরা। সূচনা হল এক অনন্য ইতিহাসের, যে ইতিহাস ওই অতিথিদের মনে রাখবে ‘পিলগ্রিম’ নামে।
জাহাজ নোঙর করে আশপাশের এলাকাটিকে আবিষ্কার করতে করতে ওখানেই ঘাঁটি গাড়লেন। সেই প্রথম বসতির নাম হল প্লিমাথ। পরবর্তী যুগে সে শহর আমেরিকার ‘হোমটাউন’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। তো, স্থানীয় আদিবাসীরা সেই আগন্তুকদের স্বাগত জানালেন। ফলে, তাঁরা এই নতুন দেশে ধর্মীয় নির্যাতন মুক্ত হয়ে বসবাস করতে লাগলেন। কেপ কড অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে যে ইন্ডিয়ান আদিবাসীরা বসবাস করতেন, তাঁদের গোষ্ঠীর নাম ওয়ামপানোয়াগ। প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে তাঁরা চাষবাসে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরাই এই আগন্তুকদের ভুট্টা এবং কুমড়োর বীজ দান করে চাষবাস করতে সাহায্য করলেন। টার্কি প্রতিপালন করা, মাছ ধরা, বন্য জন্তু শিকার করা শেখালেন। বছরখানেক বাদে এই ইংরেজরা তাঁদের উৎপাদিত শস্য, প্রতিপালিত টার্কি, শিকার করা জন্তু এবং মাছ দিয়ে ওয়ামপানোয়াগ আদিবাসী কর্তাকে ধন্যবাদ জানালেন। তখন থেকেই সম্ভবত শুরু হল আমেরিকার ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’ উৎসবটি। নভেম্বর মাসের চতুর্থ বৃহস্পতিবারে এখনও পালিত হয়ে চলেছে এই উৎসবটি।
আটলান্টিক সমুদ্রের বুকে এই সত্তর মাইল বিস্তৃত স্থলভূমিটির এক পাশে কেপ কড উপসাগর, অন্য দিকে অকূল অতলান্তিক। আবহাওয়া চমৎকার। নিউ ইংল্যান্ড তথা উত্তর-পূর্ব আমেরিকার মানুষদের সপ্তাহান্ত বিনোদনের প্রিয় জায়গা। অনেকগুলো চমৎকার সৈকত আছে এ অঞ্চলে। আর আছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন লাইটহাউস ও মিউজিয়াম।
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহান্ত। সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে চরাচর। অথচ আমরা ঘরে বসে থাকব? ঘরের কাছে দিঘা, মন্দারমণি, শঙ্করপুর আছে না? হ্যাঁ, কেপ কডই এ অঞ্চলের মানুষদের দিঘা। খাবারদাবার নিয়ে কিংবা না নিয়ে চলে যাও যে কোনও একটা বিচে (অগণ্য বিচ এ অঞ্চলে)। বালির ওপরে গড়াগড়ি খাও সারাদিন। কিংবা অতলান্তিকের সঙ্গে খুনসুটি করো ইচ্ছেমত। তাই শনিবার সকাল সকাল তল্পিতল্পা গুছিয়ে গ্রেটার বস্টনের মার্লবরো থেকে আমরাও রওনা দিলাম কেপ কডের উদ্দেশে। দুটো দিন সেখানে থেকে আটলান্টিক ও কেপ কড বে সংলগ্ন সৈকতগুলোতে ঘোরাঘুরি করব এবং লাইটহাউসগুলো দেখব বলে। আর হ্যাঁ, ওয়েলফ্লিট ওয়্যারলেস স্টেশন এবং মারকনি বিচ দেখব যেখান থেকে গুগলিএলমো মারকনির চেষ্টায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্ট আটলান্টিকের অপর পারে প্রথম বেতার বার্তাটি পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
রুট ৪৯৫ নিয়ে সাগামোর অবধি এসে হাতের ডাইনে দেখা পেলাম কেপ কড ক্যানালটির। দূরে দেখা যাচ্ছে সাগামোর ব্রিজ। গাড়ি থেকে নেমে ক্যানালের ধারের বেঞ্চে বসে দেখতে লাগলাম জলযানগুলোর যাতায়াত।
কেপ কড ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের পূর্বপ্রান্তের একটা উপদ্বীপ। এটি জন্মলগ্নে ম্যাসাচুসেটস-এর মূল স্থলভূমিটির সঙ্গেই যুক্ত ছিল। কিন্তু ১৯১৪ সালে নিউ ইউর্ক থেকে বস্টনের বাণিজ্যিক জলপথটিকে হ্রস্ব করার জন্য এই ক্যানালটি কাটা হয়। ফলে এটি একটি বড়সড় দ্বীপে পরিণত হয়েছে এখন। খোদার ওপর খোদকারি তো করেই চলেছি আমরা।
সাগামোর ব্রিজ পেরিয়ে রুট ৬ নিয়ে নাক বরাবর এগোতে থাকি প্রভিন্সটাউনের দিকে। দু’পাশে ঘন জঙ্গল, মাঝে মাঝে কিছু বসতি। পেরিয়ে যাচ্ছে স্যান্ডউইচ, ইয়ারমাউথের মতো ছোট ছোট শহর। হাতের ডাইনে ম্যাশপি ও ফলমাউথের সাইনবোর্ড। মাঝে মাঝেই আসছে ক্র্যানবেরির খেত। এ অঞ্চলের জলাগুলোতে ক্র্যানবেরির চাষ হয়। তবে এখনও ফলগুলোতে তেমন রং ধরেনি। ক্র্যানবেরি হারভেস্টিং শুরু হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ। সে এক অপরূপ দৃশ্য। লাল টুকটুকে ফলগুলোকে বড় বড় জলাশয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। সেখানেই ঝাড়াইবাছাই হয়। মনে হয় যেন দিগন্তব্যাপী চৌবাচ্চায় হোলির লাল রং গুলে রেখেছে কেউ।
ঘণ্টা আড়াই লেগে গেল প্রভিন্সটাউনের রেস পয়েন্ট বিচে পৌঁছতে। রোদ ঝলমলে গ্রীষ্মের সকাল। এ দেশের লোকেরা সব ঘরছাড়া পাগল হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার মানুষে গিজগিজ করছে সৈকতটি। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন রসের বাটির কানায় এসে জমেছে মধুলোভী পিঁপড়ের দল। বাচ্চারা হুটোপুটি করছে জলে। কেউ বা স্যান্ড কাসল তৈরি করছে খেলনা বালতিতে জল তুলে এনে। কেউ ঝিনুক কুড়োচ্ছে। আমরাও ভিড়ে যাই সেই ভিড়ে।
বালির ওপরে পা ছড়িয়ে বসে সমুদ্রের ঢেউ ভাঙা দেখছি। এ অঞ্চলের সমুদ্র বেশ অশান্ত। রেস পয়েন্ট বিচটা কেপ কডের একেবারে ডগায় বলে দিগন্ত অবধি শুধু রাশি রাশি জল। ডাইনে, বাঁয়ে এবং সামনে। একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ ছুঁয়ে যায় আমাকে। কবি হেনরি ডেভিড থরো এসে ঢেউ তোলেন আমার মনে, ‘Where a man may stand and put all America behind him...’
রেস পয়েন্ট বিচটা থেকে বেরিয়ে একটু শহর পরিক্রমা করি আমরা। বিচের ধারে ধারে এবং শহরটা জুড়ে অসংখ্য সামার কটেজ আর ভিলা। টাউন হল, পিলগ্রিম মনুমেন্ট, পিলগ্রিম মিউজিয়ামে ঢুঁ মেরে প্রভিন্সটাউন হারবারের দিকে এগিয়ে যাই আমরা। এখানেই এসে নেমেছিলেন সেই ‘তীথর্র্যাত্রী’রা। হারবারটায় নোঙর করেছে নানা মাপের জলযান। জাহাজ, ইয়ট, মোটর বোট। বস্টন ও প্লিমাথ থেকে বহু পর্যটক জলপথে কেপ কডে আসেন ছুটি কাটানোর জন্য। হারবার লাগোয়া কমার্শিয়াল স্ট্রিটে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করি আমরা। আশেপাশের দোকানগুলো থেকে ঝিনুকের খোলের কিছু স্যুভেনির কিনি। আর তখনই লক্ষ করি বেশ কিছু সমকামী জুড়ি হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কখনও বা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে প্রকাশ্যে চুম্বন করছেন। প্রসঙ্গত জানাই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকেই সমকামকে আইনসিদ্ধ করার জন্য উত্তাল হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। লেসবিয়ান এবং গে যুগলরা একসঙ্গে বসবাস করার অনুমতিও পেয়েছিলেন নানা রাজ্যে। তবে ২০০৪ সালের ১৭ মে তারিখে ম্যাসাচুসেটস রাজ্যই প্রথম সমকামী বিবাহকে আইনসিদ্ধ করে। সম্ভবত সেই কারণেই কেপ কড সমকামীদের প্রিয় গন্তব্য।
হারবার লাগোয়া রেস্তোরাঁটায় ঢুকে জমিয়ে বসে পড়ি আমরা। অর্ডার করি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ফিশ অ্যান্ড চিপস’। আসলে আমেরিকার উত্তর-পূর্বের ম্যাসাচুসেটস, রোড আইল্যান্ড, কানেকটিকাট, নিউ হ্যাম্পশায়ার, ভারমন্ট, মেইন, এই ছ’টি রাজ্যকে একসঙ্গে নিউ ইংল্যান্ড বলা হয়। আমেরিকার এই অঞ্চলেই ব্রিটিশরা প্রথম বসতি গেড়েছিলেন। তাই
‘একটি বলিষ্ঠ বাহু’।
উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে
যেমন দেখায় কেপ কডকে।
এখানকার বাড়িঘরের স্থাপত্য, গির্জার গঠনশৈলী এবং সংস্কৃতিতে ইংরেজ সুবাস। সৈকত ছোঁওয়া শহরগুলোতে প্রচুর ইংলন্ডীয় খাবারদাবারও পাওয়া যায়।
পেট পুরে ফিশ অ্যান্ড চিপস খেয়ে বেরিয়ে পড়ি আমরা। কয়েকটা লাইটহাউস দেখে ওয়েলফ্লিটের মারকনি ওয়্যারলেস স্টেশনে যখন পৌঁছলাম, তখন শেষ দুপুর। একটি ছোট কাচের বাক্সের মধ্যে মডেলটি রাখা। ভেবে অবাক লাগে এমনই একটা অতি সাধারণ যন্ত্রের সাহায্যে প্রথম ট্রান্সআটলান্টিক রেডিয়ো মেসেজটি পাঠানো হয়েছিল! ১৯০৩ সালের ১৮ জানুয়ারিতে আমেরিকার তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি থিয়োডোর রুজভেল্ট আটলান্টিকের ওপর দিয়ে ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডকে প্রথম বেতার বার্তাটি পাঠালেন। কথাগুলো জেনে আমার মনটা কেমন চিনচিন করে উঠল। আমাদের আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুই কি এই খেতাবটা পেতে পারতেন না?
‘কেপ কড ন্যাশনাল সি শোর’কে বাঁ দিকে রেখে আমরা পৌঁছে যাই ইস্টহ্যামের নসেট লাইটহাউসটির সামনে। দিগন্তব্যাপী নীল সমুদ্র, পায়ের তলায় সবুজ গাছগাছড়ার ঝোপ, তারই মাঝে দাঁড়িয়ে আছে লাল-সাদায় রাঙানো টাওয়ারটি। যেন কোনও ফুটবল দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। বড় সুন্দর এই লাইটহাউসটি। আমেরিকাবাসীদের খুব চেনা তার অবয়ব। ‘কেপ কড চিপস’ নামের পটেটো চিপসের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার সে। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি প্যাকেটের গায়ে চিহ্নিত হয় তার ছবি।
অতঃপর থ্রি সিস্টারস। ঘন গাছপালায় ঘেরা বনভূমির মাঝে মাঝে মাঝারি উচ্চতার তিনটে অতি পুরনো বাতিঘর। কাঠের তৈরি। আমার ঘড়ি বলছে বেলা পড়ে এসেছে। এখনও আমাদের চ্যাটহ্যাম বিচ এবং লাইটহাউস দেখা বাকি। তবে গ্রীষ্মকালে এ দেশে রাত আটটা পর্যন্ত দিনের আলো ফুটফুট করে। সন্ধে নামে ন’টা নাগাদ। তাই চ্যাটহ্যামে বিচে গিয়েও অনেকটা সময় পেলাম আটলান্টিকের সঙ্গে চ্যাট করবার জন্য।
চ্যাটহ্যামের লাইটহাউসটিও ভারী সুন্দর। তবে একটু বেশি সাজানো-গোছানো মনে হল। আর চেহারাটাও আধুনিক। অন্য লাইটহাউসগুলোর মতো আদিম সুবাসটা যেন নেই। তবে এখানকার বিচটি চমৎকার। চ্যাটহ্যাম বিচের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে রয়েছে একটা প্রাকৃতিক বালির বাঁধ (sand bar)। ফলে অশান্ত আটলান্টিকের ঢেউগুলো সেই বালির বাঁধে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যায়। তাই স্যান্ড বারটির এ পারের জল অগভীর এবং শান্ত। ছোট বাচ্চাদের জন্যও খুব নিরাপদ এই চ্যাটহ্যাম বিচ।
আর একটি লাইটহাউসের কথাও না বললেই নয়। সেটা হল মনোময় পয়েন্ট লাইটহাউস। ১৮২৮ সাল থেকে ১৯২৩ পর্যন্ত এই বাতিঘরটি অনেক নাবিককে দিশা দেখিয়েছে। নামটা শুনে চমকে উঠেছিলাম আমি। এমন বাঙালিয়ানা মার্কিন দেশে! খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, মনোময় নাকি ওয়ামপানোয়াগ আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের শব্দ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এই শব্দটির তিনটি অর্থ হতে পারে। ঘোর কালো, জলের কলরব কিংবা পাঁক। সে যা-ই হোক, অর্থে কী এসে যায়? নামটা যে আমার ভারী মনোমত।
চ্যাটহ্যামের দক্ষিণে নানটাকেট সাউন্ড অঞ্চলে দুটো ছোট ছোট বসতিহীন দ্বীপ এই মনোময় আইল্যান্ড। নর্থ মনোময় আর সাউথ মনোময়। ভূগোল বলে, এই সরু, লম্বা বালির প্রাচীর দু’টি আগে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিংশ শতাব্দীর নানা সময়ে প্রচণ্ড সামুদ্রিক ঝড়ে এটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইতিহাস বলে, ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে ফরাসি ও ইংরেজ আবিষ্কারকরা যখন এই দ্বীপটি আবিষ্কার করেন, তখন এখানে আদিবাসী ওয়ামপানোয়াগরা বসবাস করতেন। পরবর্তী কালে মৎস্যব্যবসায়ীরা কিছুকাল বসবাস করেছিলেন এখানে। এ অঞ্চলে প্রচুর গলদা চিংড়ি, কড, ম্যাকারেল ইত্যাদি মাছের আড়ত ছিল। পরিত্যক্ত দ্বীপটি এখন পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র।
সূর্যাস্তের পর আমরা রওনা হলাম ব্রুস্টার-এর দিকে। ম্যাপে বলিষ্ঠ হাতটির কনুই যদি হয় চ্যাটহ্যাম, তো ব্রুস্টার হল ঊর্ধ্ববাহু। তবে এতক্ষণ আমরা ছিলাম আটলান্টিকমুখী কেপ কড ন্যাশনাল সি শোর-এ, আর এখন যেখানে যাচ্ছি সেটা কেপ কড বে-মুখী অঞ্চল। আটলান্টিকের মতো হিংস্রতা নেই সেখানে। সেখানকারই ‘ওশন এজ রিসর্ট’-এ আজ আমাদের রাত্রিবাস।
রিসর্টটির ঘর দেখে আমি তো থ! মস্ত ড্রয়িংরুম, ডাইনিংরুম, কিচেন, দুটো বেডরুম, বাথরুম, ব্যালকনি। বাথরুমের পাশে ওয়াশিং মেশিন, ড্রায়ার। কিচেনে ফ্রিজ, কুকিং রেঞ্জ, ডিশওয়াশার, মাইক্রোওয়েভ এবং অন্যান্য ঘরকন্নার সরঞ্জাম মায় প্লেট-গ্লাস-চামচ! অর্থাৎ লম্বা ছুটি কাটাও, রাঁধো-বাড়ো-খাও। কিন্তু ভেবে পাই না দিন প্রতি এতগুলো ডলার দিয়ে কারা ছুটি কাটায় এখানে? আমাদের তো এক রাতের ভাড়া দিতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। অথচ ৩৩৫টি ভিলার আর একটিও কিন্তু খালি নেই আজ!
অগস্ট ১৬২০। ‘মেফ্লাওয়ার’
পাড়ি দিল অতলান্তিকের ও পারে
নতুন পৃথিবীর দিকে।
সকালে ব্রেকফাস্ট খেয়ে হাঁটতে বেরিয়ে বুঝতে পারলাম কেন এই চাহিদা। চারশো একরের এই রিসর্টটি সমুদ্রের উপকূলবর্তী হলেও নানা রকমের গাছপালায় ভরা। সযত্নে লালিত ঘাসের জমি আর কেয়ারি করা ফুলের বাগানগুলো দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। রিসর্টটির ভেতরেই সাইকেল চালাবার জন্য একটা পিচ বাঁধানো পথ, যেটির দৈর্ঘ্য ২৬ মাইল। চমৎকার একটি ছড়ানো ছেটানো এইট্টিন হোলের গল্ফ কোর্স আছে, আছে বেশ কয়েকটি সুইমিং পুল ও টেনিস কোর্ট। আর আছে এঁদের একেবারে নিজস্ব সৈকত।
সকালটা কাটালাম সুইমিং পুল আর গল্ফ কোর্সের দিকটায় হাঁটাহাঁটি করে। ভিলাগুলোর এক একটা এক এক রকম। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায়। নানা রঙের থোকা থোকা হাইড্র্যানজিয়া ফুল ফুটে আছে চত্বরটা জুড়ে। চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ঘাসের জমি। মনে হচ্ছে পারিজাতময় অমরাবতীতে পৌঁছে গিয়েছি বুঝি।
দুপুর নাগাদ সকলেরই হালুমহুলুম অবস্থা। হাঁটাহাঁটি তো কম হয়নি। আগে থেকেই ভেবে রাখা ছিল স্থানীয় খাবার খাওয়া হবে আজ। রিসর্টটার উল্টো দিকেই পেয়ে গেলাম একটা লোকাল রেস্তোরা। খুব ভিড় সেখানে। কিউয়ে দাঁড়িয়ে খাবার কিনছেন মানুষজন। অর্থাৎ খাবার ভাল। আমরাও দাঁড়িয়ে পড়লাম সেখানে। কাঁকড়ার চপ (ফ্রায়েড ক্র্যাব কেক) আর ঝলসানো রাক্ষুসে গলদা চিংড়ি (গ্রিলড জায়ান্ট লবস্টার) নিয়ে বসে পড়ি আমরা। বাঙালিদের মতো চপ-কাটলেট-বড়া খেতে ভালবাসেন মার্কিনিরাও।
লাঞ্চের পর নিকারসন ফ্যামিলি ম্যানসন অ্যান্ড ক্যারেজ হাউসটা দেখতে যাওয়ার কথা আমাদের। কিন্তু তার আগে ব্রু স্টার শহরটায় একটু চক্কর কেটে আসি। অবাক হয়ে যাই স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়েগুলো দেখে। বেশির ভাগ বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়েতেই সিমেন্টের ওপরে ঝিনুকের খোল টুকরো করে গাঁথা। দেখে মনে হয় যেন মুক্তো বিছানো পথ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে আমেরিকার কিছু মানুষ অবিশ্বাস্য রকমের ধনী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদেরই অন্যতম এই নিকারসন পরিবার, যাঁরা এই ভূসম্পত্তিটির মালিক ছিলেন। এই চারশো একরের রিসর্টটির মালিকানা বর্তমান মালিকদের হলেও নিকারসনদের ছিল ১৮০০ একরের মালিকানা। এই ম্যানসনটি ছাড়াও ছিল একটি মস্ত ক্যারেজ হাউস, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিজস্ব উইন্ড মিল। ঘোড়াশালে ঘোড়া ছিল, পুকুর ভর্তি মাছ ছিল, খেত ভরা ফসল ছিল, জঙ্গল ভরা হরিণ ছিল...। রূপকথার গল্পগুলো ‘ঠাকুমার ঝুলি’ থেকে আমার চোখের সামনে এসে নেচে বেড়ায়।
নিকারসন ফ্যামিলি ম্যানসন এখন সম্পূর্ণ ভাবেই বাণিজ্যিক। ভেতরে দু’টি বড় বড় রেস্তোরাঁ ও বার আছে। আছে বলরুম, ব্যাঙ্কোয়েট রুম ইত্যাদি। উত্তর-পূর্ব আমেরিকার মানুষদের প্রিয় জায়গা বলে সারাটা গ্রীষ্মকাল এখানে কনফারেন্স, বিয়ের অনুষ্ঠান ইত্যাদি লেগেই থাকে।
সূর্যাস্ত হচ্ছে। আমার মন জুড়ে একটা অদ্ভুত বিষাদ। ম্যানসনের তিন তলার রেস্তোরাঁর টেরেস গার্ডেনে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি অশ্বক্ষুরাকৃতি উপসাগরটিকে। হাতের ডাইনে দূরে একটা অস্পষ্ট বাতিঘর। ওটাই কি প্রভিন্সটাউনের রেস পয়েন্ট লাইটহাউস? যেখানে তরী ভিড়িয়েছিলেন পিউরিটান ডিসেনটাররা? আর হাতের বাঁ দিকে যে স্থলভূমিটি দেখা যাচ্ছে সেখানেই কি প্লিমাথ কলোনি? যেখানে বসতি করেছিলেন তাঁরা? তাঁরা কি কল্পনাও করতে পেরেছিলেন যে, তাঁদের সেই নতুন পৃথিবী আজ বিশ্বের দরবারে এতখানি মাথা তুলে দাঁড়াবে?
আর, সেখানকার আদিবাসী ওয়ামপানোয়াগরাও কি ভাবতে পেরেছিলেন যে, তাঁরা এক দিন অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবেন?


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.