মনোরঞ্জন ১...
অনীক এলেন, জয় করলেন
হিন্দুস্থান রোড। ঝকঝকে পাড়া। চড়চড়ে রোদ। ঠিকানা সঙ্গে ছিল। তাও বাঙালি অভ্যেসে ঘাম-মাখা কিশোরটিকে ‘অনীক দত্তের বাড়ি কোনটা’ জিজ্ঞেস করতেই এক চিলতে হাসি দিয়ে দেখিয়ে দিল।
‘‘পাড়ার লোকজন এখন চিনছে বটে। ফ্ল্যাটের লোকজনের সঙ্গেও আগে খুব একটা কথাটথা হত না। এখন অনেকে দেখে উষ্ণ সৌজন্য জানাচ্ছেন। ছবির প্রিমিয়ারেও পাড়ার কয়েক জনের সঙ্গে দেখা। নিজে থেকে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেলেন। বেশ লেগেছে। এত বছর বিজ্ঞাপনের ছবি বানিয়ে এটা হয়নি। লোকে জানত এটা-ওটা ছবি বানাই। তবে ফিচারফিল্ম ব্যাপারটাই আলাদা, সেটা বুঝতে পারছি,” ঠোঁটের ফাঁকে মুচকি হেসে বলছেন যিনি তাঁর নামই অনীক দত্ত।
এই মুহূর্তে বাংলা ছবির প্রেক্ষাপটে তাঁর সম্পর্কে তিনটে বাক্যেই সবটা বুঝিয়ে দেওয়া যায়।
এলেন। দেখলেন। জয় করলেন। ছোট বাজেটের একটা অত্যাশ্চর্য ছবি বানিয়ে। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ।’ ভূত নিয়ে ছবি। কিন্তু ড্রাকুলাসুলভ রক্তারক্তি নেই। বিকট শব্দে ক্যাঁচ করে দরজা খুলে যাওয়া নেই। সাদা শাড়ি পরে অশরীরী মহিলার হেঁটে যাওয়া নেই। উল্টে প্রচুর পেটে খিল ধরিয়ে দেওয়া হাসি আছে। যে হাসিতে কাতুকুতু নেই। শো শেষে বাঙালির স্যাটায়ারে কী চূড়ান্ত দখল তার পরিতৃপ্তিমূলক পোস্টমর্টেম করতে করতে হল থেকে দর্শকের বেরনো আছে। আর বাংলা ছবির আকাশে যোগ্য পরিচালকের আবির্ভাবের স্বস্তি আছে।
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর দৃশ্য
“সত্যি এতটা আশা করিনি। ছবিটা বানাতে পারব কি না তাই জানতাম না। প্রত্যেক দিন শু্যটিংয়ের সময় মনে হত আগামী কাল শু্যটটা হবে তো?” ছবির প্রচার হয়নি সে রকম। রিলিজের দিনও মাল্টিপ্লেক্সে ছবি মুক্তি নিয়ে গোলমাল। তার পরেও গোটা ইন্ডাস্ট্রি বলছে এ রকম চিত্রনাট্য। সংলাপ। ভাবনা। চরিত্রসৃষ্টি--- সব মিলিয়ে এ ধরনের ছবি টালিগঞ্জে আগে হয়নি।
সিনেমা ব্যাপারটা তাঁর রক্তে বললে ক্লিশে শোনায়? শোনাক। যাঁর মা’র কাকা বিমল রায়। যাঁর দিদা (বিমল রায়ের স্ত্রী) ছবি নিয়ে এই ছেলের উৎসাহ দেখে তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে। সেই পরম্পরার মানুষকে ‘ফিল্মি’ না বলে উপায় নেই। সত্যজিতের মারাত্মক ভক্ত সেই আদ্যিকাল থেকে। স্টাডি রুমে তাঁর ছবির পাশে দাঁড়িয়েই ছবি তুললেন পত্রিকার জন্য। ভাল ভূতের আইডিয়াটাও কি সেই ভূতের রাজা থেকে? অনীক সিগারেটটা স্টাইলের সঙ্গে ধরাতে গিয়ে থমকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার অসুবিধে হবে না তো?” হবে না জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে নীল জিনস পরা লম্বা দু’টো পা আয়েসে ছড়িয়ে বসলেন। মাথার ওপর সাদা শার্ট পরা একটা হাত আড়াআড়ি ভাবে দিয়ে অন্য হাতে সিগারেটে টান। এই বসার ভঙ্গিটাও বড্ড চেনা যেন। “আরে আমার
অনীক দত্ত
বউ তো বলে বিশপ লেফ্রয় রোডের সামনে দিয়ে যত বার যাই অজান্তেই নাকি আমার হাতটা প্রায় উঠে যায়। নমস্কার করার ভঙ্গিতে।” তবে সেই বিশালকায় মানুষটার ছায়া মেপেই ভূত নিয়ে ‘ছায়া’ছবি নয়। নস্টালজিয়া। বিভিন্ন সময়কে এক ফ্রেমে ধরাএই ইচ্ছে থেকেই ভূতের মতো বিষয় মাথায় আসে তাঁর। “পুরনো কলকাতা হারিয়ে যাচ্ছে। এটা আমাকে বড্ড কষ্ট দেয়। সেই থেকে ভেবেছিলাম পুরনো বাড়ি একটা বিষয় হতে পারে। তা ছাড়া একটা স্পটে ছবিটাকে আটকানো গেলে খরচাটা কমবে। আর অন্য দিকে বিভিন্ন সময়ের অনেক মানুষকে ধরার যে ইচ্ছে সেটা ভূত নিয়ে ছবি না বানালে হত না।”
অর্থাৎ কস্ট কাটিং থেকে ভূতের ছবির আইডিয়া? হো হো করে হাসছেন অর্থনীতির স্নাতক।
সাউথ পয়েন্ট থেকে পাঠভবন। কলেজ জীবন সেন্ট জেভিয়ার্সে। বিজ্ঞাপনের ছবি বানিয়ে দেশের তাবড় বিজ্ঞাপন ছবি-করিয়েদের সঙ্গে টক্কর দিয়ে পুরস্কার নিয়ে আসা এই মানুষ সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখছেন গত আড়াই দশক ধরে। কিছুতেই হয়নি। “নাকের ডগায় এসে ফসকে গেছে বারেবারে। ৯০-এর দশকে এক প্রযোজক এক লাখ টাকা আগাম দিয়ে দিয়েছেন। কাজ শুরু করব করব। সব রেডি প্রায়। হঠাৎ কলকাতায় এক গুজরাতি প্রোমোটারের তৈরি বাড়ি ভেঙে পড়ল। নানা রকম ধরপাকড়, কড়াকড়ি শুরু হল। ব্যস, আমার প্রযোজক, যিনিও কিনা গুজরাতি-- ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন। আমারও ছবি বানানো হল না।” এ রকম একবার না। একাধিক বার হয়েছে অনীকের সঙ্গে। পৈতৃক ব্যবসা ছিল চায়ের বাগানের। গ্র্যাজুয়েশনের পর জোর করে সেইখানেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ছবি আঁকতে ভালবাসা, তত দিনে সত্যজিৎ, ঋত্বিকের প্রেমে পড়ে যাওয়া ছেলের মাথায় ব্যবসার নীরস হিসেব ঢুকবে কেন? সব ছেড়ে দিয়ে প্রায় পালিয়েই এসেছিলেন চা বাগান থেকে। “ত্যাজ্যপুত্র হতে হয়েছিল তার জন্য। কী আর করা যাবে? অগত্যা সেল্সে চাকরি শুরু। গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে।” এর পর এল তখনকার হিন্দুস্থান টমসন এখন যেটা জেডবলিউটি-- সেখানে এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজের সুযোগ। ছবি তৈরির প্রবল ইচ্ছে থাকলেও কোনও ট্রেনিং ছিল না। ছিল না পূর্ব অভিজ্ঞতাও। এই সুযোগটা কাজে লাগালেন। অন্যরা ছবি বানাতেন আর তদারকির নামে ছবি তৈরির খুঁটিনাটিগুলো শিখে নিতেন অনীক।
আর লেখালেখির হাত? এ রকম সংলাপ লিখলেন কী করে যে, বাঙালির পেটে খিল ধরে যাচ্ছে? ছবির সংলাপ ফিরছে মুখে মুখে? ব্যক্তিগত জীবনে নিজেও এতটাই রসিক?
অনীক সিরিয়াস হয়ে গিয়ে একটু ভাবলেন। আবার একটা সিগারেট ধরালেন। “আমার কথায় লোকজন হাসে দেখেছি। তবে তাতে আমি রসিক প্রমাণিত হয় কি না জানি না। ব্যক্তিগত ভাবে আমার ধারণা, আমার লেখার হাতটাই বেশি রসালো। কথা বলতে বলতে বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই যে, কথাটা অতটা গুছিয়ে বলতে পারি না।” তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া না গেলেও তাঁর হাতের গুণের জয়জয়কার নিয়ে অনেকেই নিঃসন্দেহ বহু দিন আগে থেকে। বাংলায় ম্যাগি ন্যুডলস এর সেই বিখ্যাত ক্যাচ লাইন
খাই খাই কর কেন এস বস আহারে
দু’মিনিট লাগে ঠিক ম্যাগি কয় যাহারে...

মনে আছে? লেখক অনীক দত্ত। এই যে এত ধন্য ধন্য প্রথম ছবিতে, পরের ছবির জন্য প্রযোজক পাওয়া সহজ হয়ে গেছে নিশ্চয়ই? “লোকজন উৎসাহ দেখাচ্ছে এটুকু বলতে পারি। বাকিটা দেখা যাক।” মোহহীন চোখের উত্তর তাঁর। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-এর স্বত্ব কিনে রেখেছেন। চিত্রনাট্যও তৈরি। তবে দু’নম্বর ছবি সেটা নয়। একটা থ্রিলার বানাবেন ঠিক করে ফেলেছেন। যার মধ্যেও থাকবে সামাজিক বিষয়আশয় নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গ আঁচড়।
প্রথম ছবির সাফল্য। অভাবনীয় প্রশংসা। উচ্ছ্বাস। পরের ছবির প্রস্তুতি। তাও বিজ্ঞাপনের ছবি বানানো বন্ধ করেননি এক মুহূর্তের জন্য। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ শেষ হওয়ার পরের দিন থেকেই বিজ্ঞাপনের কাজ শুরু করে দিয়েছেন ‘পেটের তাগিদে’।
বাজার কাঁপানো পরিচালকের এতটা বিনয়?
‘বাস্তব’। বলছেন অনীক। পরের ছবি বক্স অফিসে চলবে কি না। মানুষের ভাল লাগবে কি না-- এ সবের গ্যারান্টি কই?
চুলে রুপোলি পাক গাঢ় হওয়ার পর এসেছে প্রথম ছবি বানাবার সুযোগ। সে ছবি প্রায় কাল্ট হয়ে যাওয়ার পরেও তাই বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে থাকায় আপত্তি করার কারণ দেখছেন না অনীক দত্ত। জীবনের নানা কম্প্রোমাইজে আপত্তি নেই তাঁর।
শুধু সিনেমা বানানোর সময় কম্প্রোমাইজ করবেন না কখনও। “আমার ছবি যদি খরাজ মুখোপাধ্যায়কে চায় তা হলে অমিতাভ বচ্চন চিত্রনাট্য পড়ে রাজি হলেও, প্রযোজক টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও খরাজকেই নেব। না হলে ছবিটাই বানাব না।”
ভূত-ভবিষ্যৎ বাদ দিন।
বর্তমানে দাঁড়িয়ে এই লোকটাকে স্যালুট করতেই হচ্ছে!

ছবি: কৌশিক সরকার


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.