মুখের কথায় ইস্তফা নয়, দীনেশ-জট আরও জটিল
রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীর ইস্তফা নিয়ে ‘জটিলতা’ ক্রমশই বাড়ছে।
মমতার নির্দেশে শনিবার দীনেশকে ফোন করে ‘সম্মানের সঙ্গে’ রেলমন্ত্রিত্ব ছাড়তে বললেন তৃণমূলের লোকসভার মুখ্য সচেতক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। যার জবাবে দীনেশ জানিয়ে দিলেন, দলনেত্রী তাঁকে ‘লিখিত’ ভাবে ইস্তফা দিতে বললে তবেই তিনি পদত্যাগ করবেন। দীনেশের এই দাবি মানতে আবার তৃণমূল নারাজ। এ দিন মমতার সঙ্গে মহাকরণে বৈঠকের পর সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “লেখা কীসের? কোনও লেখা দেওয়া হবে না!”
বুধবার রেল বাজেট পেশ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে ফ্যাক্স বার্তা পাঠিয়ে দীনেশকে দরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন মমতা। একই সঙ্গে এ-ও জানিযে দিয়েছিলেন যে দল চায় দীনেশের জায়গায় মুকুল রায় রেলমন্ত্রী হোন। কিন্তু তৃণমূলের তরফে শনিবারের আগে পর্যন্ত দীনেশের কাছে কোনও ‘নির্দেশ’ পাঠানো হয়নি। মমতার দাবি মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিলেও দীনেশকে এখনও পর্যন্ত ইস্তফা দিতে বলেননি মনমোহন। তাঁর জায়গায় নতুন মন্ত্রী মনোনীত করার প্রক্রিয়াও শুরু করেনি কেন্দ্র। নিজের থেকে ইস্তফা দিতে নারাজ দীনেশ এ দিন জানিয়েছেন, আপাতত তিনি তাঁর ‘দায়িত্বপূর্ণ’ মন্ত্রকের কাজই করে যাবেন।
এই পটভূমিকায় ময়দানে নেমেছেন তৃণমূলের অন্য ‘বিতর্কিত’ সাংসদ কবীর সুমন। যিনি বিতর্ক উস্কে দিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী না-বললে দীনেশের মোটেই মন্ত্রিত্বে ইস্তফা দেওয়া উচিত নয়! দীনেশের পাশে দাঁড়িয়েছে রেলের পাঁচটি শ্রমিক সংগঠনও। ‘ভারতীয় রেলের রাজনীতিকরণ রুখতে’ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি করে চিঠিও দিয়েছে ওই পাঁচটি সংগঠন। এমনকী বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার করা হলে আন্দোলনে নামারও হুমকি দিয়েছে তারা।
এই পরিস্থিতিতে এ দিন দু’টি পদক্ষেপ করেছেন মমতা। প্রথমত, কল্যাণবাবুকে দিয়ে সরাসরি দীনেশকে ফোন করানো। দ্বিতীয়, মুকুলবাবু রাজ্যসভার মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর সর্বসমক্ষে বলা, “মুকুল রায় দলের বিশ্বস্ত সৈনিক। রাজ্যসভায় ছ’বছর ছিলেন। রেলমন্ত্রীর জন্য উনিই আমাদের প্রার্থী।” এই দু’টি পদক্ষেপই কেন্দ্রের উপর ‘চাপ’ বাড়ানোর কৌশল বলে মনে করছে তৃণমূলের একাংশ। অর্থাৎ, এক দিকে দলের তরফে দীনেশকে ‘আনুষ্ঠানিক’ ভাবে ইস্তফা দেওয়ার কথা বলা হল। অন্য দিকে, মুকুলবাবুর নাম পরবর্তী রেলমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণাও করে দেওয়া হল।
সোমবার রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার উপর বিতর্কে জবাবি ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। তার পরে ওই দিনই রেল বাজেটের উপর বিতর্ক শুরু হতে পারে। না হলে মঙ্গলবার থেকে ওই বিতর্ক শুরু হবে। সূত্রের খবর, তার আগেই রেলমন্ত্রী পদে মুকুলের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সেরে ফেলতে চায় তৃণমূল। কংগ্রেসের তরফেও এ ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গিয়েছে।
তবে দীনেশ এবং তৃণমূলের মধ্যে টানাপোড়েন অব্যাহত। রেলমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ মহলের একাংশের বক্তব্য, দীনেশ চান মমতা তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করুন। সে ক্ষেত্রে ‘স্বাধীন সাংসদ’ হিসেবে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারবেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী ফোন করে মমতাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁর দাবি মেনে মুকুলবাবুকেই রেলমন্ত্রীর পদে আনা হবে। বাজেট পাশ হওয়ার পরেই ওই ব্যাপারে পদক্ষেপ করা হবে। এই অবসরে কিছুটা সময়ও ‘কিনতে’ চেয়েছিলেন কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব। যার মধ্যে চেষ্টা হয়েছে মুলায়ম সিংহ যাদবের সমাজবাদী পার্টিকে সরকারে সামিল করার। সেই চেষ্টাও সফল হয়নি। বরং সমাজবাদী পার্টির বঙ্গজ নেতা কিরণময় নন্দ ঘরোয়া ভাবে যোগাযোগ রাখছেন মমতার সঙ্গেই।
এরই মধ্যে মুকুল রায়কে রেল প্রতিমন্ত্রীর ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দিয়ে ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আংশিক প্রত্যাহার করানোর প্রস্তাবও কংগ্রেস শিবির থেকে এসেছে। মমতা নিজে উচ্চশ্রেণির ভাড়াবৃদ্ধি নিয়ে ততটা ‘অনমনীয়’ নন। কিন্তু যে ব্যাপারে তিনি একান্তই ‘অনড়’, তা হল দীনেশকে সরিয়ে মুকুলকে রেলমন্ত্রী করা। মমতার কথায়, “আমার বিষয়টি নিয়ে যা বলার ছিল, বলে দিয়েছি। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। রেলমন্ত্রী পদে মুকুল রায় আমাদের প্রার্র্থী।”
এ দিন তৃণমূলের চার রাজ্যসভার সাংসদ পদপ্রার্থী বিধানসভায় মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় আচমকাই সেখানে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তত ক্ষণে কল্যাণ-দীনেশ ফোনে কথা হয়ে গিয়েছে। মমতাকে দীনেশের রেলমন্ত্রিত্ব-বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আমি কিছু বলব না। যা বলার, লোকসভায় আমাদের দলের মুখ্য সচেতক বলবেন।” কল্যাণবাবুকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি ওঁকে (দীনেশ) ফোন করে বলেছি, দল আপনাকে বরখাস্ত করার আগে আপনি নিজেই তো সম্মানজনক ভাবে রেলমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিতে পারেন! সেটা করছেন না কেন? উনি তাতে বললেন, দল বা দলের চেয়ারপার্সন (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) আমাকে ওই মর্মে নির্দেশ দিয়ে কোনও চিঠি পাঠাননি। আমি ওঁকে বলেছি, আপনি মন্ত্রী হওয়ার সময়েও তো দল বা দলের চেয়ারপার্সন আপনাকে লিখিত কোনও নির্দেশ দেননি। তা সত্ত্বেও তো আপনি মন্ত্রী হয়েছিলেন! তা হলে এখন আপনার পদত্যাগ করতে অসুবিধা কোথায়? দল যে আপনাকে চাইছে না, সেটা তো পরিষ্কার! দলের চেয়ারপার্সন তো প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন!”
কল্যাণবাবুর সঙ্গে কথোপকথন দীনেশ নিজেই দিল্লিতে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। পাশাপাশি, রীতিমতো ঘোষণা করে ১৬ লক্ষ রেলকর্মীর ‘দায়িত্ব’ কাঁধে নিয়ে রেল মন্ত্রকে গিয়ে জবাবি বক্তৃতার খসড়ার কাজও শুরু করেছেন অফিসারদের সঙ্গে। তাঁর কথায়, “সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তৃণমূল আমার পদত্যাগ দাবি করেনি। তৃণমূল নেত্রীও আমাকে সে রকম কিছু বলেননি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী কথা হয়েছে, তা-ও আমি জানি না। ফলে ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন আসছে কী ভাবে?” এর পরই রেলমন্ত্রী বলেন, “তৃণমূল নেত্রী আমায় পদত্যাগ করতে বলে একটা চিঠি দিন। তা হলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।”
কল্যাণবাবু দলকে বিষয়টি জানানোর পর এ দিন বিকেলে মহাকরণে মুকুলবাবু এবং সুদীপবাবুর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন মমতা। সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে দীনেশকে নিয়েও আলোচনা হয়। তৃণমূল সূত্রের খবর, দীনেশকে আপাতত কোনও লিখিত নির্দেশ না-দিয়ে কেন্দ্র তথা প্রধানমন্ত্রীর উপরেই নির্ভর করা হবে। তার পর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই পরিস্থিতিতে দীনেশ-কাণ্ডে ঢুকেছেন কবীর সুমন। বস্তুত, তৃণমূলের একাংশের মতে, দীনেশ এবং সুমন আপাতত একই মেরুতে দাঁড়িয়ে। দল চায়, দু’জনেই ইস্তফা দিন। প্রথম জন আপাতত মন্ত্রিত্বে। দ্বিতীয় জন সাংসদ পদে। কিন্তু দু’জনেই এখনও ‘অনড়’। দীনেশকে সুমন ইস্তফা না-দেওয়ারই পরামর্শ দিয়েছেন। সুমনের কথায়, “আমি ওঁকে ফোন করে বলেছি, প্রধানমন্ত্রী না-বললে আপনি রেলমন্ত্রীর পদ ছাড়বেন না।” সুমনের যুক্তি, দীনেশ ‘দেশবাসী’র রেলমন্ত্রী। ফলে তাঁর সেই দায়িত্ব ছাড়া উচিত নয়।
কল্যাণবাবুর অবশ্য বক্তব্য, “দীনেশ ত্রিবেদী তো সরাসরি ১২২ কোটি মানুষের ভোট জিতে মন্ত্রী হননি! দল তাঁকে প্রার্থী করেছিল। দলের নীতি-আদর্শ নিয়ে প্রচার করে তিনি জিতেছিলেন। দল দেশের কথা ভাবে না, উনি একাই ভাবেন এটা ওঁর একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা।”


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.