পিছন থেকেই বুঝি এ তো অন্য কেউ
সেই ষাট। দশকের কথা হচ্ছে দশকের। মারকাটারি এক খান পিরিয়ড ছিল সত্যি। ভেবে দেখুন, যা ইচ্ছে তাই হয়েছে। ঝাপটায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে তাবড় মহিরুহ, বিশ্ব চোখ কচলে দেখেছে এক রাশ শক্ত চোয়াল আর অভাবনীয় সব কোণ থেকে অবলীলায় উড়ে বেরিয়েছে রং-বেরঙের প্রজাপতি। সেই রং, একটু এ দিক লেপে একটু ও দিক লেপে, তৈরি হল আরও একটা নতুন তেল-ছবি। আর এই ছবিতেই দেখা গেল জ্যাকি কেনেডি, সাধনা, সুপ্রিয়া দেবী, ইউনিভার্সিটি বয়সের ছোট কাকি, সব্বাই, এক সঙ্গে মিলছে মিশছে, খিলখিলাচ্ছে, যেন কত দিনের চেনা বন্ধু।
জ্যাকি কেনেডি বা সুপ্রিয়া দেবীর মতো আমার মা-কাকিদের দেখতে, মোটেও বলছি না। কিন্তু তাও যে ওঁদের এক দেখতে লাগত। রহস্য? বুফো। রহস্য ফাঁস! এই যে ষাটের সময়টার কথা বলছি, তখন তো শুধুই এই ভাবেই মেয়েরা চুল বাঁধছে। লস এঞ্জেলেস টু ল্যান্সডাউন, এই এক স্টাইল। যেন অন্য কোনও প্যাঁচ চুলে পড়তেই পারে না। এমনিতে সারা বিশ্ব (আরও বেশি করে, বরযাত্রীর বাস নিয়ে অপেক্ষারত বর কত্তা) জানে যে মহিলারা তাঁদের চুল নিয়ে কতটা খুঁতখুঁতে।

‘শর্মিলি’ ছবিতে রাখি
আমার এক দাদার বৌভাতে, তো এমনও দেখেছি, যে বৌদি, প্রচুর সময় নিয়ে পার্লার থেকে চুল বেঁধে আসার পরও, আবার করে চুল নিয়ে এ প্যাঁচ ও প্যাঁচ করছে। তা এ হেন জাতির কাছে সচিন তেন্ডুলকরের মতো জনপ্রিয় হওয়া কি চাট্টিখানি কথা? বুফোঁ-র ফ্যাশন মাহাত্ম এইখানেই। বিদেশে চুল নিয়ে নানা সময়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে, কিন্তু আমাদের বাড়ির উঠোনে, সর্বদাই ঢলঢলে সন্ধ্যা রায়। হয় খোলা চুলে নয় পরিপাটি খোঁপায়। বুফোঁ সেখান থেকেই তুলসিতলার বাঙালিকে এক ঝটকায় নিয়ে গিয়ে ফেলল টুইস্ট নাচের আসরে। যেখানে বাঙালি সাবলীল, তাঁর পিঠ খোলা ব্লাউজ নিয়ে। আর মাথায় উঁচু হয়ে থাকা বুফোঁ নিয়ে। তার মানে চুলের একটা প্যাঁচ বাঙালি ঘরের মেয়েকে অন্যের চোখে আরও আরও আকর্ষক করে তুলল। এ বার খেয়াল করুন, এই আকর্ষণ কিন্তু আসছে,
এক জনকে পিছন থেকে দেখেই। পিছন মানে পিঠের তিল হতে পারে, হতেই পারে, আর হ্যাঁ অবশ্যই, সেই বুফো। মা-কাকিদের পিঠের তিল নিয়ে আলোচনায় আমরা অভ্যস্ত নই, তা বলে ওরা বাদ যাবে? কার সাধ্য!
বুফোঁ’র খবর যেই হাওয়ায় উড়ল, অমনি সব্বাই তুলে নিল এর টুক-টাক টিপ্স। তার পর তো কোনও মতে চুল শুকিয়েই, ব্যাক কম্ব্ করে চুলের ওপর চুল, চুলের ওপর চুল, ব্যস তৈরি, বুফো। সে যতই রকবাজ’রা ‘বাঁধাকপি’ টোন কাটুক। কোথায় যাবেন, বন্ধুর বাড়ি? অচেনা কয়েক জনও সেখানে থাকবে? অপূর্ব! বুফোঁ পাক্কা চলবে। কারও জন্মদিনে নেমন্তন্ন? বুফোঁ সহায়।
সামনে বিয়েবাড়ি? তা হলে তো কোনও কথাই নেই। অবশ্যই বুফো। তবে এ বার নিজে নিজেই না করে একটু খরচ চলতে পারে। OK, চলো পার্লার। আর বেশ কিছু সময় পার করে মিনু পিসি (এখন পিসি) যখন বাইরে পা দিত, তখন যেন পাড়ায় সাক্ষাৎ মধুবালা। এ আমার না, সেই সময়কার পাড়ার খবর রে ভাই।
এত গল্পের একটাই উদ্দেশ্য, রণে বনে জলে জঙ্গলে বুফোঁ-র কেমন মারকাটারি কাটতি ছিল, সেটাই বোঝানো। একটা অল-আবহাওয়া প্যাকেজ। পাড়ায়ও চলতি, রাজভবনেও। চুলের পেছনে হাজারো ঘন্টা না বিলিয়ে, চটজলদি অথচ চটকদার একটা উত্তরের নামই, বুফো।
এই ধাঁচের চুলের স্টাইল আরও গ্ল্যামার পেল, যখন বম্বে ফিল্ম জগতের সব মহাতারকা’রা বুফোঁ বেঁধে নায়কদের চোখ টানতে লাগলেন। অ্যন ইভিনিং ইন প্যারিস-এ যখন বুফোঁ খোঁপাওলা শর্মিলা, শম্মি কপূরকে ঘায়েল করলেন, তখন কিন্তু আহতের সংখ্যা ছিল বহু। হলে বসা পুরুষদের কথা তো বলছিই, একই সঙ্গে শয়ে শয়ে মহিলাও মনে মনে এই খোঁপা বেঁধে ফেলেছিলেন। নির্ঘাত। আপনারা যাঁরা বড়, একটু মনে করুন তো, মাথায় বুফোঁ, আর কানের পাশ দিয়ে এক-দু’গাছা চুল খেলে বেড়াচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখেননি? আর মোহিত হয়ে ভুলে যাননি, আপনি আসলে ওষুধ কিনতে বেরিয়েছিলেন?
ফ্যাশন ইতিহাস বলছে আমেরিকায় বুফোঁ স্টাইলে আগেও নিশ্চয়ই চুল বাঁধা হয়েছিল, কিন্তু প্রথম তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন জ্যাকি কেনেডি। জন.এফ.কেনেডি’র স্ত্রী। ফার্স্ট লেডি। জ্যাকি কেনেডি’র বুফোঁ ছিল নিজের চুল দিয়ে তৈরি, কিন্তু এমন অনেকেই ছিলেন, যাঁরা বুফোঁ খাড়া করতে সাহায্য নিতেন ফল্স চুলের। সে কিস্সা থাক আজ। আমার কয়েক গাছা নিয়েই টানাটানি পড়ে যাবে।


‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’ ছবিতে
শর্মিলা ঠাকুর।
অবশ্য কেই বা আর তেড়ে আসবে? চুল, কেতা, আকর্ষণ সবই তো কমল, বাড়ল শুধু চোখের পাওয়ার আর স্মৃতির বোঝা।



First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.