আমার কাছে
সবচেয়ে বড় স্বার্থের নাম ক্রিকেট

প্রিয় ক্রিকেট অনুরাগী,

আমার বিভিন্ন পদের সঙ্গে যে দায়িত্বগুলো জড়িয়ে আছে, সেগুলো পালন করা নিয়ে গত কয়েক দিনে নানা অভিযোগ উঠেছে আমার বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলো মোটামুটি দু’টো ভাগে ভাগ করা যায়। এক, বিভিন্ন পদে কাজ করার জন্য আমি নিজে কতটা যোগ্য। দুই, এই দায়িত্বগুলো পালন করতে গিয়ে আমার কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে কি না। আমাদের রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু দলের টি-টোয়েন্টি অভিযানের মধ্যে এ সব নিয়ে পাল্টা জবাব দিতে চাইনি। তার থেকেও বড় কথা, যে প্রসঙ্গগুলো তোলা হয়েছে সেগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা আর আলোচনা দরকার ছিল। এখন মনে হচ্ছে, দু’ধরনের অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।
আমি কোনও দিনও ক্ষমতার লোভে কোনও পদে বসিনি। তবে হ্যাঁ, পরিবর্তন ঘটানোর চ্যালেঞ্জ আর দায়িত্ব নিতে কখনও ভয় পাইনি। সত্যি বলতে কী, নিজের ব্যবসাটা বাদ দিলে অন্য সব ক’টা পদেই দায়িত্ব নিয়েছি ক্রিকেটের শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষদের পীড়াপীড়িতে। এই মুহূর্তে আমি যে ক’টা পদে আছি, প্রত্যেকটাতেই চলতি ব্যবস্থায় উন্নতি ঘটিয়ে পরিবর্তন আনার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে আমার সামনে।
জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি বা এনসিএ-র চেয়ারম্যান হিসাবে আমার মূল দায়িত্ব ভারতীয় ক্রিকেটকে ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা রোড ম্যাপ গড়ে দেওয়া। যার নকশা প্রায় তৈরি। আমি নিশ্চিত সন্দীপ পাটিলের নেতৃত্বে এনসিএ-র টিম সেটা সামনে রেখে দারুণ কাজ করবে। এনসিএ-তে প্রথম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কোচ, ফিজিও, ট্রেনার বা বিশ্লেষকদের মতো সাপোর্ট স্টাফ তৈরি করায়। এতদিন আন্তর্জাচিক ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে আমার অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগছে।
স্বাভাবিক কারণেই কর্নাটক ক্রিকেটের জন্য আমার মনে একটা আলাদা জায়গা রয়েছে। কর্নাটক ক্রিকেটের উন্নতির জন্য কী কী জরুরি তা নিয়ে আমার চিন্তাভাবনার সঙ্গে জাভাগল শ্রীনাথ, বেঙ্কটেশ প্রসাদ, বিজয় ভরদ্বাজ এবং রাহুল দ্রাবিড়ের চিন্তাভাবনার মিল ছিল। হাত গুটিয়ে বসে থেকে শুধু সমালোচনা করার বদলে আমরা ঠিক করি, কিছু করে দেখাতে হবে। সে জন্যই কর্নাটক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে লড়েছিলাম আমরা।
চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের পরিকাঠামোর খুবই দুর্দশা হয়েছিল। আগের ব্যবস্থায় শুধু দু’এক জনের কথায় সব চলত। সব ধরনের কাজেই স্বচ্ছতার অভাব ছিল। আমাদের কমিটি দায়িত্বে আসার পর শ্রীনাথ আর আমি দায়িত্ব ভাগ করে নিই। সচিব হিসাবে শ্রী নির্বাচন থেকে শুরু করে ক্রিকেটীয় সমস্ত ব্যাপারগুলো দেখবে। প্রেসিডেন্ট হিসাবে আমি দেখব পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকটা।
পরিবর্তনটা কয়েক মাসেই বোঝা যাচ্ছে। ড্রেসিংরুমগুলো বিশ্বমানের হয়েছে, টিভি ও রেডিও কমেন্ট্রি বক্সগুলোর তারিফ হচ্ছে, কয়েক জন সাংবাদিকের পছন্দ না হলেও আগের তুলনায় প্রেসবক্সটাও অনেক ভাল হয়েছে। স্টেডিয়ামের প্রাথমিক সুযোগসুবিধার উন্নতি, মাঠের উন্নতি, নিকাশির আধুনিক ব্যবস্থা, ক্লাবহাউস সংস্কারের মতো কাজে হাত পড়েছে। খেলাটাকে কর্নাটকের প্রতিটা জেলায় ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন জেলার ১৮টা জায়গায় নতুন পরিকাঠামো গড়া এবং পুরনো পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই করা হয়েছে।
এই কাজের জন্য পরিকাঠামো ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কয়েকটা কমিটি গড়া হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞদের প্রায় প্রত্যেকেই নিজের পেশায় সফল এবং কেএসসসিএ-র থেকে টাকা না নিয়ে সাম্মানিক ভূমিকায় কাজগুলো করে দিচ্ছেন। আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশে যাতে স্বচ্ছতা থাকে সে জন্য আমরা ইআরপি প্যাকেজ এনেছি। যখন কেএসসিএ-র প্রেসিডেন্ট হই, তখন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক ছিলাম, এবং আরও বছর দুই খেলার ক্ষমতা আমার ছিল। কিন্তু বুঝি কেএসসিএ-র পিছনে যে সময়টা দিতে হবে, তাতে পেশাদার হিসাবে ক্রিকেট অনুশীলনে যথেষ্ট সময় দিতে পারব না। তাই আরসিবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নিলাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে চিফ মেন্টর-এর ভূমিকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কেএসিএ-তে আমার টিমের অন্য সদস্যরাও কর্নাটক ক্রিকেটের স্বার্থে নিজেদের জীবনে এ রকম কয়েকটা বদল এনেছে।
আমার স্পোর্টস কোম্পানির গোড়াপত্তন ১৯৯৯ সালে। পনেরো বছরের উপর আমি স্পোর্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছি। এমন পেশা খুঁজে নিতে হয়েছিল যার সম্পর্কে আমার যথেষ্ট জ্ঞান আছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পরে বসন্ত ভরদ্বাজ (প্রাক্তন আন্তর্জাতিক টেবিল টেনিস খেলোয়াড় এবং কর্পোরেট পেশাদার) আর দীনেশ কুম্বলের (স্পোর্টস অ্যানালিটিক্স পেশাদার) সঙ্গে এই কাজটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু করি। কোম্পানির নাম হয় ‘টেনভিক’। আমাদের তিন জনের মাথায় একটা দুর্দান্ত ভাবনা ছিল। সঙ্গে ছিল শুধু ক্রিকেট নয়, সব খেলাধুলোর চেহারা পাল্টে দেওয়ার আবেগ।
‘টেনভিক’ কিন্তু ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি নয়। আমারা শুধু তরুণ প্রতিভাদের পেশাদার ক্রীড়াবিদে পরিণত করার চেষ্টা করি। ক্রীড়াবিদদের জন্য তৈরি বিশেষ ‘সাইকোমেট্রিক অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট’ এর সাহায্যে তাদের সমস্যার জায়গাগুলো দেখে নিয়ে উঠতি খেলোয়াড়দের পড়াশোনার সুযোগ থেকে ব্যক্তিত্ব গঠন, আর্থিক পরামর্শ থেকে ইমেজ ম্যানেজমেন্ট সব কিছুর দায়িত্ব আমরা নিই। খেলাধুলোয় এখন আর শুধু ধনীদের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। ‘স্পোর্টসপার্সন মেন্টরিং প্রোগ্রাম’-এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতের রগড়ানির জন্য ক্রীড়াবিদদের তৈরি করা। ক্রীড়াবিদদের আর্থিক দিকটা দেখার জন্য কোনও সংস্থা আগ্রহী থাকলে এগিয়ে আসতেই পারে। ঘটনা হল, এই চেষ্টাটার পিছনে আমাদের সংস্থারই প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। এই প্রোগ্রাম থেকে কিন্তু আমরা কোনও টাকা উপার্জন করিনি।
বলা হচ্ছে, ‘টেনভিক’-এর সঙ্গে যুক্ত ক্রিকেটাররা নাকি জাতীয় দলে জায়গা পাচ্ছে। এটা অত্যন্ত অপমানজনকই শুধু নয়, একেবারে অবিশ্বাস্য অভিযোগ। প্রথমত, এতে জাতীয় নির্বাচন কমিটির কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয়ত, যারা জাতীয় দলে জায়গা পাচ্ছে, তাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সব শেষে আমার সততা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে।
শেষ ব্যাপারটা নিয়েই শুধু কথা বলব। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ক্রিকেটারদের নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছি বা কোনও দিন ফেলব, এটা জোর দিয়ে অস্বীকার করছি। তবে যদি কাউকে দেখে মনে হয়, তার মধ্যে ভারতের হয়ে খেলার প্রতিভা আছে, তার জন্য চেষ্টা করব। সেই ক্রিকেটারের দায়িত্বে কোন স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট সংস্থা আছে, সেটা না ভেবেই। কারণ আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের স্বার্থ।
কেএসসিএ এবং এনসিএ-তে আমার পদ সাম্মানিক। আমি জানি, পরিবর্তন আনতে গেলে সমালোচনা হবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, বদল খুবই জরুরি। ক্রিকেটজীবনেও আমি সব সময় জাতীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর রেখেছি। অবসরের পরেও সেটাই করে যাচ্ছি। যে দিন মনে হবে আমার এতগুলো ভূমিকার যে কোনও একটাতেও আমার দায়িত্ব পালন করতে পারছি না, সে দিন আমি সরে দাঁড়াব। ঠিক যেমন করেছিলাম ভারত অধিনায়ক থাকার সময়, জনৈক মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে।
আমার কোম্পানিকে ঘিরে যে স্বার্থ-বিরোধিতার প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে গত ক’দিন ধরে সহকর্মী, সাংবাদিক এবং অনেক পেশাদার ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। সব পেশাতেই স্বার্থ-বিরোধিতা ব্যাপারটা থাকে। গুরুত্বপূর্ণ হল, আপনি কী ভাবে সেটাকে দেখছেন। আমার মতে কোনও পেশায় স্বার্থ-বিরোধিতা থাকলে সেটা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়া উচিত। ‘টেনভিক’-এ আমার স্বার্থ যেমন সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও বৈঠকে হয়তো এমন কিছু আলোচনা হয়েছে যেগুলো নিয়ে আমার স্বার্থ-বিরোধিতা রয়েছে। সে সব বৈঠক থেকে আমি সরে এসেছি। যে সব সংস্থায় আমার সাম্মানিক পদ রয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসা করলেই বোঝা যাবে আমি সত্যি বলছি কি না।
সারা জীবন নৈতিকতা আর পেশাদারি আদর্শ মেনে চলেছি। এখন আমি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে এমন আদর্শ মেনে চলতে হবে যা শুধু আমাকেই সন্তুষ্ট করবে না। যারা আমাকে সম্মানের চোখে দেখে, তাদেরও সন্তুষ্ট করবে।
সব শেষে বলি, মহাত্মা গাঁধীকে নিয়ে আমি যা বলেছি সেটাকে বিকৃত করা হয়েছে। আমি বলেছিলাম, মহাত্মা গাঁধীর মতো সরল, মৌলিক জীবনযাপন আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

শুভেচ্ছা-সহ,
অনিল কুম্বলে




First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.