প্রতি মিনিটে ক্ষতি আড়াই লক্ষ টাকা, দিনে ৯ কোটি। ১৩ দিন সংসদ অচল থাকায় ‘জলে গেল’ করদাতাদের থেকে আদায় করা ১১৭ কোটি টাকা। সংসদের বাদল অধিবেশনের অচলাবস্থার জন্য বিজেপি-কে কাঠগড়ায় তুলে আজ এ ভাবেই ক্ষতির অঙ্ক কষল সরকার। ঠিক যে ভাবে কয়লা ব্লক বণ্টনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতির অঙ্ক কষেছে কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটরস জেনারেল (সিএজি)। প্রবল অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বললেন, “সংসদীয় গণতন্ত্রকে হাস্যকর করে তুলেছে বিজেপি।” তাঁর কথায়, “এই ধরনের অচলাবস্থা একটি নিষ্ক্রিয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে দেশকে।”
কয়লা কেলেঙ্কারির জেরে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের ইস্তফার দাবিতে বিজেপি টানা ১৩ দিন সংসদ অচল করে রাখার পর আজ বাদল অধিবেশনের নিয়মমাফিক মুলতুবি হল। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির পাশাপাশি করদাতাদের অর্থ অপচয়ের জন্য প্রধান বিরোধী দলকে আজ তুলোধোনা করেন সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী পবন বনশল। তাঁর কথায়, “গোটা বছরে কমবেশি ৮০ দিন সংসদের অধিবেশন চলে। সংসদ পরিচালনার জন্য দিনে ৯ কোটি টাকা খরচ হয়। অচলাবস্থার জন্য প্রতি মিনিট ক্ষতি হয় আড়াই লক্ষ টাকা। সংসদ ঠিক মতো চললে করদাতাদের থেকে আদায় করা এই অর্থের সদ্ব্যবহার হত।” তবে বিজেপি-ও নাছোড়। সুষমা স্বরাজের পাল্টা বক্তব্য, “সংসদ অচল থাকলে করদাতাদের অর্থের অপচয় হয় ঠিকই। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিজেপি সংসদ অচল করার ফলেই শেষ পর্যন্ত সব টুজি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এ বার নতুন করে টুজি স্পেকট্রাম নিলাম করে যা আয় হবে, সংসদে অচলাবস্থার জন্য ক্ষতি সে তুলনায় নগণ্য।” বিজেপি এ বার তাই আন্দোলনে নামবে কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে।
সংসদের অধিবেশন চলাকালীন সাংসদরা দু’হাজার টাকা করে ভাতা পান। সেই সঙ্গে পান দিল্লি আসা-যাওয়ার খরচও। সংসদের অচলাবস্থা কাটাতে বিজেপি-কে চাপে রাখার জন্য এর আগে একটি অধিবেশনে কংগ্রেস সাংসদরা সেই ভাতা নেওয়া বন্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু তাতেও বিরোধী নেতৃত্বের হেলদোল হয়নি। ফলে কংগ্রেসও এ বার আর সেই পথে হাঁটেনি। তবে সংসদের অচলাবস্থার জন্য সর্বভারতীয় স্তরে যাতে বিজেপি-র ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, সেই লক্ষ্যেই আজ ক্ষতির অঙ্ক নিয়ে সরব হন পবনরা।
ইউপিএ-২ সরকারের আমলে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার সংসদের গোটা অধিবেশনে কার্যত কোনও কাজই হল না। এর আগে ২০১০-এ স্পেকট্রাম তদন্তে যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবিতে পুরো শীতকালীন অধিবেশন অচল করে রেখেছিলেন বিরোধীরা। এ বারও ১৯ দিনের অধিবেশনে ১৩ দিনই অচল ছিল সংসদ। তা ছাড়া বিলাসরাও দেশমুখের মৃত্যুর জন্য আরও দেড় দিন মুলতুবি ছিল সংসদ। প্রথম থেকেই কয়লা ব্লক বণ্টনে দুর্নীতির অভিযোগে সংসদে হট্টগোল চালিয়েছে বিজেপি। পরে সরকারি কর্মীদের পদোন্নতিতে তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের জন্য সরংক্ষণ চালুর জন্য বিল পেশ করা নিয়ে কদর্য চেহারা নেয় সাংসদদের বাগ্বিতণ্ডা।
রাজ্যসভায় হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির দুই সাংসদ। এই সব হই-হট্টগোল ও ডামাডোলের মধ্যে লোকসভায় মাত্র ৬টি ও রাজ্যসভায় ৪টি বিল পাশ করতে পেরেছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী এ দিন থেকেই সব মন্ত্রীকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাদল অধিবেশন আজ শেষ হলেও আগামী দিনে কয়লা কেলেঙ্কারির প্রশ্নে সরকারের বিরুদ্ধে যে তারা আক্রমণ শানিয়ে যাবে, সেই হুঁশিয়ারিও আজ দিয়ে রেখেছে বিজেপি। সুষমা বলেন, “সংসদ শেষ হওয়ার পরে এ বার কংগ্রেসের একাধিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে অন্দোলন করবে বিজেপি। শহর থেকে গ্রাম-গোটা দেশেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা হবে। ১৩ সেপ্টেম্বর কোর কমিটির বৈঠকে এই আন্দোলনের রূপরেখা ঠিক হবে।”
গত কয়েক দিন ধরেই কংগ্রেস অভিযোগ করছে, বিজেপি-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সুপারিশে একাধিক কয়লা ব্লক বণ্টন করা হয়েছে। কিন্তু আজ সেই অভিযোগের জবাবেও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছে বিজেপি। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা অরুণ জেটলি বলেন, মুখ্যমন্ত্রীরা সুপারিশ করলেও প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায় এড়াতে পারেন না। ব্লক বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকী বিজেপি-র রাজ্যসভা সাংসদ অজয় সনচেতির নাম কয়লা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে জেটলি বলেন, “আমরা সেই কারণেই নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন চাইছি। যারা ওই ঘটনায় দোষী, তাদের উপযুক্ত শাস্তি হোক সেটাই চায় দল।”
|