পুস্তক পরিচয় ১...
মাতৃত্বের রূপকল্পই প্রাধান্য পেয়েছে
রিমেম্বারিং রেভল্যুশন/ জেন্ডার, ভায়োলেন্স, অ্যান্ড সাবজেক্টিভিটি ইন ইন্ডিয়াজ নকশালবাড়ি মুভমেন্ট,
শ্রীলা রায়। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ৭২৫.০০
কশাল আন্দোলনকে ঘিরে স্মৃতির প্রায় অতলে তলিয়ে যাওয়া শৈশব-কৈশোরের গল্পজগত্‌কে আরেক বার ফিরে দেখার সুযোগ করে দিল শ্রীলা রায়ের রিমেম্বারিং রেভল্যুশন। এই সঙ্গে একটা অস্পষ্ট দৃশ্যপটও পরিস্ফুট হল। নকশালবাড়ি আন্দোলনকে ঘিরে বিদ্রোহীর যে রোম্যান্টিক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে তা মূলত পুরুষকেন্দ্রিক, মেয়েদের উপর পুলিশি অত্যাচারের বাইরে তাদের স্বাধীন ভূমিকা বা স্বকীয়তা প্রায় কখনওই আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি লেখিকার এই দাবি যথার্থ। বিপ্লবের ভাষ্যের এই অসম্পূর্ণতা মেটানোই শ্রীলার গবেষণার স্বঘোষিত উদ্দেশ্য।
‘স্মৃতিপটে’ নকশালবাড়ি আন্দোলন সংক্রান্ত গবেষণার ‘ফিল্ড রিসার্চ’ শ্রীলা করেছেন ২০০৩-’০৪-এ, বিলেত থেকে কলকাতায় এসে। প্রাক্তন নকশাল মহিলা এবং পুরুষদের সাক্ষাত্‌কার ও লিখিত স্মৃতিচারণ বিশ্লেষণ করে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই আন্দোলনের স্মৃতির ভেতর ‘জেন্ডার’ (অসম ক্ষমতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষের দ্বিবিধ সামাজিক রূপায়ণ), হিংসা এবং মেয়েদের আত্মগত মনোভাবের কী পরিচয় মেলে। ভূমিকায় শ্রীলা মনে করান, সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতা অবচেতন আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ইত্যাদি-- ব্যতিরেকে বিশুদ্ধ স্মৃতি বলে কিছু হয় না। আবার, পীড়াদায়ক অতীতকে কাটিয়ে উঠে বর্তমানে সুস্থিত হতে হলে ‘ভুলে’ যাওয়া বা নানা রকম ‘অস্বীকার’-ও অনেক ক্ষেত্রে জরুরি। স্মৃতি-বিস্মৃতি বা স্বীকার-অস্বীকারের জটিল জাল ভেদ করে শ্রীলা দেখানোর চেষ্টা করেছেন নকশাল আন্দোলনে জড়িত মেয়েরা কী ভাবে তাঁদের স্বতন্ত্র সত্তার রূপায়ণ করেন।
সাধারণ ভাবে ভারতের বামপন্থী আন্দোলনের মতাদর্শে শ্রেণিচেতনার প্রাধান্যের ফলে ‘জেন্ডার’-এর প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি লেখিকার এই বক্তব্যে নতুনত্ব নেই। তা ছাড়া, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের প্রভাবে নারীত্ব সংজ্ঞায়িত হয়েছে শুদ্ধতা, স্বার্থত্যাগ, মাতৃত্ব ইত্যাদি প্রথাগত ‘নারীসুলভ’ প্রতীকের নিরিখে। নকশালবাড়ির মতো চরমপন্থী রাজনীতিও মেয়েদের কিছু ক্ষমতা এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বকীয়তার স্বীকৃতি দিলেও, নিরন্তর চেষ্টা করে গেছে পিতৃতন্ত্রের পথে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে। শ্রীলার মতে, সংশ্লিষ্ট গল্প-উপন্যাসে বা চলচ্চিত্রে মেয়েদের ‘মাতৃত্বে’র রূপকল্পই প্রাধান্য পেয়েছে। মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা উপন্যাসে অথবা সত্যজিত্‌ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে দু’ধরনের মহিলা চরিত্র দেখা যায় এক দিকে ‘বস্তুসর্বস্ব’, ‘লিবারেটেড’ মহিলা যারা বুর্জোয়া অবক্ষয়ের প্রতীক এবং অন্য দিকে বিপ্লবের যথার্থ সহকারী ‘মাতৃমূর্তি’ ত্যাগ ও সেবার প্রতীক।
শ্রীলার অন্যতম আলোচ্য, আন্দোলনের ভাষ্যে হিংসা এবং তার বর্গায়ণ। সে-ই প্রকৃত বিপ্লবী, যে শোষকের ধ্বংসলীলায় মাতবে এবং তার ‘শুভ’ হিংসা দিয়ে পরাজিত করবে রাষ্ট্রীয় ‘অশুভ’ হিংসাকে। লেখিকার বিশ্লেষণে নকশাল মতাদর্শে নারীত্বের ধারণা ব্যবহৃত হয় হিংসাকে বৈধতা দেওয়া এবং এই হিংসাযজ্ঞে পুরুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। চারু মজুমদার ডাক দেন অর্থনৈতিক সংগ্রামকে ইজ্জতের লড়াইতে উন্নীত করার জন্য; আর যেহেতু ইজ্জতের প্রশ্নটি প্রথাগত ভাবে নারী-শরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেহেতু তাকে রক্ষা করাই হয়ে ওঠে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ন্যায্যতা।
‘শুভ’ এবং ‘অশুভ’ হিংসার দুই মেরুর মধ্যে লেখিকা চিহ্নিত করেছেন এক তৃতীয় হিংসার ক্ষেত্র। তা হল, দলের অভ্যন্তরীণ হিংসা, যা আলোচনা বা স্বীকৃতিযোগ্য ছিল না। শ্রীলা বলেন যে, তত্ত্বগত ভাবে হিংসাকে দেখা হয় আটপৌরে জীবনের ছন্দপতন বা ‘অ-সাধারণ’ হিসেবে। কিন্তু দৈনন্দিনতার মধ্যে যে নানা হিংসা চলতে থাকে তা যেহেতু কাঠামোগত, তাই সাধারণত দৃশ্যমান নয়। প্রায় অনিবার্য ভাবে নারীরাই এমন হিংসার স্মৃতির ধারক। তাঁদের কথনে উঠে এসেছে গোপন আশ্রয়ে (কৃষক, শ্রমিক বা মধ্যবিত্ত সমর্থক পরিবারে) থাকাকালীন এমন বহু অভিজ্ঞতার কথা। শুধু চিহ্নিত শত্রু নয়, এখানে ভীতির উত্‌স কখনও পার্টির সহকর্মী, কখনও আশ্রয়দাতাই। যে মেয়েরা জেলে যাননি, তাঁদের কাছে এই গোপন আশ্রয়ে বিভিন্ন যৌন বা মানসিক নিগ্রহের স্মৃতিই ক্ষতচিহ্ন হয়ে থেকে গেছে। দলে এমন নিগ্রহ সম্পর্কে মনোভঙ্গি ছিল জটিল। যদি নিগ্রহকারী শ্রমিক বা কৃষক হত, তা হলে দল চাইত অভিযোগ ধর্তব্যের মধ্যে না আনতে। বরং অভিযোগকারিণীকেই দেখা হত মধ্যবিত্ত চেতনার ধারক হিসেবে। তবে মধ্যবিত্ত কমরেডের ক্ষেত্রে শাস্তিবিধান করতে দল তত্‌পর হত। এমন অভিযোগের ঘটনা বিরল, কারণ, তা গণ্য হত দলীয় একতার পরিপন্থী হিসেবে।
অস্ত্রধারী নির্মলা বা শহিদ অহল্যা জাতীয় ‘যোদ্ধা নারী’র রূপকল্প এ সময়ের কবিতায় ফিরে ফিরে এলেও ব্যক্তি নারীর স্বার্থত্যাগী, সেবিকা রূপই ছিল বিপ্লবীদের কাছে স্বস্তিদায়ক (আজও তাই)। মেয়েদের জবানি থেকেই লেখিকা জেনেছেন যে, তাদের জন্য সাধারণ ভাবে নির্ধারিত থাকত গৌণ কাজের দায়িত্ব কোনও জিনিস এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া এবং মূলত গৃহস্থালির ‘একঘেয়ে’ কাজ। নারীমুক্তির প্রশ্নটি বিপ্লবী মতাদর্শে গুরুত্ব পায়নি কারণ ধরেই নেওয়া হত এই আন্দোলন অনেক কিছুর মতো পিতৃতন্ত্রকেও নির্মূল করবে। তবে, নারী-পুরুষের প্রথাগত রূপায়ণকে সাধারণ ভাবে চ্যালেঞ্জ না করলেও, বিপ্লব প্রচলিত বিয়ের ধারণা অনেকটাই বদলে দিয়েছিল। বিয়ে না করে ‘সহবাস’ যথেষ্ট প্রচলিত ছিল। যদিও যারা একসঙ্গে থাকত, তাদের বিবাহিত হিসেবেই ধরে নেওয়া হত। এমনকি দলও একেক সময় বলে দিত কাদের একসঙ্গে থাকা উচিত। হিন্দু বিয়ের জায়গায় প্রচলন ঘটে ‘রেড বুক’ বিয়ের। এ রকম অনেক বিয়েই পরে টেকেনি এবং মহিলাদের স্মৃতিচারণে তাঁদের বিপ্লবী স্বামীদের সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গের, হতাশার কথারও কোনও অভাব নেই।
লেখিকার মতে, দু’টি ক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতি বিশেষ ভাবে অনুভূত হয়। এক, কবিতায়, এবং দুই, পুলিশি অত্যাচারের প্রসঙ্গে। বিপ্লবকে ‘রোম্যান্স’ হিসেবে দেখার ফলে এ সময়ের কবিতায় নারী ফিরে ফিরে আসে। কিন্তু তার রূপকল্প সেই অনুগামিনীর, পুরুষের মুখাপেক্ষীর। (অথচ, মেয়েদের লেখা কোনও কবিতার উল্লেখ বা অনুল্লেখের কারণ শ্রীলার আলোচনায় নেই।) তবে পুলিশি অত্যাচারের প্রসঙ্গেই নারীর উপস্থিতি সব থেকে প্রকট। যেমন, সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইন দি ওয়েক অব নকশালবাড়ি বইয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আলোচনাতেই প্রথম নারীর অংশ নেওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। কারণ, লেখিকার মতে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতর্কে সব থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে ধর্ষিতা মধ্যবিত্ত নারীর চিত্রকল্প। অর্থাত্‌, নারীর কর্তৃত্ব নয়, তার ‘পীড়নের’ কাহিনিই হয়ে থেকেছে এই আন্দোলনের আখ্যানের অন্যতম উপজীব্য। কিন্তু মেয়েরা যখন লিখছেন (শ্রীলা তিনটি জেলের স্মৃতিকথার উল্লেখ করেছেন), তখন মেয়েদের প্রতিরোধের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পুলিশি হেফাজতের ভয়াবহতার বিপ্রতীপে উঠে আসছে জেলের জীবনে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব আর সহমর্মিতার আখ্যান। কিন্তু সাক্ষাত্‌কারের ভিত্তিতে লেখিকার মনে হয়েছে পুলিশি অত্যাচার অনেকের মনে এবং শরীরে এমনই ক্ষত রেখে গেছে যে, সে স্মৃতি থেকে মুক্তি প্রায় অসম্ভব। কেউ যেমন এই অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে যেতে চান, কেউ বা শান্তি খোঁজেন আজও আন্দোলনে যুক্ত থেকে।
অত্যন্ত জরুরি ছিল শ্রীলা রায়ের এই গবেষণা। নকশালবাড়ি আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে এ যাবত্‌ এত বিশদ আলোচনা হয়নি। অনেক কথা হয়তো জানা ছিল, কিন্তু তার ঘোষিত স্বীকৃতি এই প্রথম পাওয়া গেল। কিন্তু এ সত্ত্বেও ব্যাখ্যা এবং উপস্থাপনা, দুই সম্পর্কেই অনেক অস্বস্তি থেকে যায়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তাত্ত্বিক বিষয়ের অবতারণার বাহুল্য, পুনরাবৃত্তি, অস্বচ্ছতা এবং অন্তর্টীকার ফলে বইটি পড়ে ওঠা প্রায় দুঃসাধ্য। লেখিকা বলেছেন তিনি ১৬ জন পুরুষের সাক্ষাত্‌কার নিয়েছেন, কিন্তু এক জন ছাড়া আর কারও সাক্ষাত্‌কার আলোচিত নয় কেন? কাজ বিতরণের ক্ষেত্রে সব অসমতাই কি পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচায়ক? আর মেয়েদের স্বাতন্ত্র্য যেখানে চর্চার বিষয়, সেখানে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁদের তাত্ত্বিক ভাবনা বা বৌদ্ধিক স্বকীয়তার কোনও সন্ধান করা হয়নি। ব্যাখ্যার অভাবে মনে হতেই পারে, লেখিকা এ ধরনের মননশীলতা মেয়েদের কাছ থেকে আশাই করেননি। তাঁর সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এটি সঙ্গতিহীন।


First Page| Calcutta| State| Uttarbanga| Dakshinbanga| Bardhaman| Purulia | Murshidabad| Medinipur
National | Foreign| Business | Sports | Health| Environment | Editorial| Today
Crossword| Comics | Feedback | Archives | About Us | Advertisement Rates | Font Problem

অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনও অংশ লেখা বা ছবি নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি
No part or content of this website may be copied or reproduced without permission.