সরকারের উচ্চ স্তরে দুর্নীতি রোধের জন্য আদালতের ‘সমান্তরাল’ একটি স্বতন্ত্র বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন বা যৌক্তিকতা আছে কি না, তাহা লইয়া বিতর্ক থাকিয়াই যাইবে। প্রশ্ন থাকিবেই, কেন দেশের প্রচলিত আইনে এবং প্রচলিত বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যেই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আধিকারিকদের দুর্নীতির তদন্ত করা যাইবে না? কিন্তু আপাতত সেই বিতর্ক সরাইয়া রাখিয়া লোকপাল নামক নূতন প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব স্বীকার করাই বিধেয়। গুরুত্ব দুইটি কারণে। এক, এই প্রতিষ্ঠান সরকারি আধিকারিকদের দুর্নীতিকে রাজনীতি ও প্রশাসনের পরিসরে চড়া আলোর সামনে হাজির করিয়াছে। দুই, লোকপাল বিল পাশকে কেন্দ্র করিয়া একেবারে শেষ বেলায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে যে বিরল ঐকমত্য ও উদ্দেশ্যমুখিতা লক্ষ করা গেল, তাহা সংসদীয় রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে তাৎপর্যপূর্ণ।
মনে রাখা দরকার, ইতিপূর্বে অন্তত আট বার সংসদে এই বিল পাশ করার চেষ্টা হইয়াছে। কখনও কখনও সাংসদদের হট্টগোলে বিলটি পেশ পর্যন্ত করা যায় নাই। লোকসভায় বিল পাশের দিনেও সমাজবাদী পার্টির নেতা মুলায়ম সিংহ যাদবকে বিলের তীব্র বিরোধিতায় বলিতে শুনা গিয়াছে, এক জন সামান্য থানার দারোগা দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করিবে, ইহা কেমন করিয়া সাংসদরা মানিয়া লইতেছেন? কিন্তু এই ধরনের দুই-একটি বেসুরো কণ্ঠ ব্যতীত সংসদে লোকপাল প্রশ্নে যে বিরল ঐকমত্য দেখা গিয়াছে, বিশেষত দুই প্রধান দল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে যে ইতিবাচক সংসদীয় আচরণ দেখা গিয়াছে, তাহার গুরুত্ব কম নয়। এই বিরল ঘটনাকে সম্ভব করিয়াছে অণ্ণা হজারের নেতৃত্বে নাগরিক সমাজের দেশব্যাপী আন্দোলন এবং তাহার সুফলভোগী নবীন ‘আম আদমি পার্টি’র দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে চমকপ্রদ সাফল্য। এই সাফল্য উভয় প্রধান রাজনৈতিক দলকেই এতটাই স্তম্ভিত ও বিব্রত করিয়াছে যে, দুর্নীতির প্রশ্নে টালবাহানা করিলে নাগরিক জনসমাজের কাছ হইতে আরও কত প্রত্যাখ্যান মিলিবে, সেই শঙ্কায় দলীয় নেতৃত্ব বিচলিত হইয়া পড়িয়াছে। এই বিচলনেরই প্রত্যক্ষ পরিণাম যাবতীয় বিবাদ-বিসম্বাদ দূরে সরাইয়া রাখিয়া দ্রুত লোকপাল বিলে সায় দেওয়া। অণ্ণা হজারেও যে রালেগাঁও সিদ্ধিতে বিল পাশের দাবিতে তাঁহার নয় দিনের অনশন ভঙ্গ করিয়া সাফল্যের হাসি হাসিতে পারিয়াছেন, তাহার পিছনে তাঁহার কৃতিত্ব কিছু কম নয়।
সমগ্র পঞ্চদশ লোকসভার পূর্ণাঙ্গ কার্যকালব্যাপী সংসদে প্রায় কোনও কাজই হইতে পারে নাই। বহু জরুরি বিল লইয়া আলোচনা হয় নাই, বিল পেশ অবধি করা যায় নাই। ক্রমাগত ওয়াক-আউট, চিৎকার-চেঁচামেচিতে সভা ভণ্ডুল, প্রতিদিন কয়েক বার করিয়া অধিবেশন মুলতুবি ইত্যাদির ফলে জরুরি প্রশ্নোত্তর পর্বও যথাবিহিত সমাধা হইতে পারে নাই। ইদানীং সংসদে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা, অচলাবস্থা দস্তুর হইয়া পড়িয়াছে। জনস্বার্থ লইয়া সাংসদদের কোনও চিন্তা নাই, কেবল বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা করা এবং সাফল্যের কৃতিত্ব দাবি করার অশালীন প্রতিযোগিতায় সংসদের কাল সাঙ্গ হইতেছে। এই প্রেক্ষিতটি মাথায় রাখিলে লোকপাল বিলকে ঘিরিয়া দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সহযোগিতাকে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বলিয়াই মনে হয়। জনসাধারণ নিশ্চয় চাহিবেন, তাঁহাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় লইয়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এ ধরনের সদর্থক আচরণ করুন, সংসদ সচল রাখুন, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও বিতর্ক চালান। ভোট বড় বালাই। ষোড়শ লোকসভার নির্বাচনের লগ্ন আসন্ন হইতেছে বলিয়াই হয়তো রাজনৈতিক দলগুলি সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ দূরে ঠেলিয়া জনচক্ষে জনদরদি মসিহা হইয়া ওঠার বিভ্রম রচনা করিতে ব্যস্ত। বিভ্রমই সই, সংসদ যথার্থ জনপ্রতিনিধিসভা হইয়া উঠুক। |